ঢাকা ০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

আসাদের পতনের প্রথম বার্ষিকী উদযাপনে প্রস্তুত সিরিয়া

দামেস্কের উমাইয়া স্কোয়ারকে ঘিরে ইতিমধ্যে উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়েছে। গাড়ির জানালা দিয়ে শিশুরা নাড়ছে সবুজ-সাদা-কালো সিরীয় পতাকা, আকাশে উঠছে আতশবাজি। রাজধানীসহ পুরো দেশের ‘মুক্তি দিবস’ ৮ ডিসেম্বর সামনে রেখে কয়েক দিন আগেই স্কোয়ারে জড়ো হতে শুরু করেছে মানুষ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

উৎসবের মাঝেই এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আলেপ্পোর গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা ২৪ বছর বয়সী আবু তাজ। এক দশক আগে সরকারি বাহিনী ও আসাদবিরোধীদের লড়াইয়ে তার বাড়ি ধ্বংস হয়। এরপর দামেস্ক-বৈরুত হয়ে সৌদি আরবে বাবার কাছে আশ্রয় নেন তিনি। আট বছর সৌদি আরবে থাকা ও মিসরে দুই বছর পড়াশোনার পর তিনি দেশে ফেরেন মাত্র এক সপ্তাহ আগে। তখন সিরিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দামেস্কে আসছে সেই অভিযানের স্মরণে, যা রাজধানী দখল করে বাশার আল-আসাদকে ভোরের দিকে মস্কোতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল।

গত শুক্রবার উমাইয়া মসজিদে জুমার নামাজ শেষে তিনি আসেন স্কোয়ারে উৎসব দেখতে। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, দেশের সংস্কৃতি এখন ‘জনগণের হাতে’ এবং দেশের দিকনির্দেশনা তাকে আনন্দিত করছে।

এক বছর আগে আল-আসাদ শাসনের পতন ঘটে। এর সঙ্গে শেষ হয় কয়েক দশক ধরে চলা দমন-পীড়নের পুলিশি রাষ্ট্র, যার কেন্দ্রে ছিল নির্যাতন ও গুমের অভিযোগ। বহু সিরীয়ের কাছে শাসনের পতন ছিল বহু বছরের পর প্রথম স্বস্তির নিশ্বাস।

তবে মুক্তির পরের দিনগুলোতে ছিল আনন্দের সঙ্গে উদ্বেগও। ইরাক বা লিবিয়ার উদাহরণ টেনে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেন। কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল ক্ষীণ, বিশেষ করে যখন নতুন সরকার পরিচালনা করছেন আহমেদ আল-শারা, যাকে গ্রেফতারে একসময় যুক্তরাষ্ট্র পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

এ বছরের মার্চে সিরিয়ার উপকূলীয় এলাকায় এবং জুলাইয়ে সুয়েইদায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত হন। সরকারি বাহিনীর অনুগত হিসেবে পরিচিত শক্তিগুলো উত্তেজনা বাড়িয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হামলা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। গত মাসে হোমসেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল, যদিও সরকারের হস্তক্ষেপে তা শান্ত হয়।

তবু উমাইয়া স্কোয়ারে লাখো মানুষের আগমন সামনে রেখে এটা স্পষ্ট যে, কীভাবে আসাদের পতন সিরীয়দের জীবনকে স্পর্শ করেছে। শহরের সর্বত্র এখন সবুজ-সাদা-কালো পতাকা। উমাইয়া মসজিদ এলাকার শিশুদের গালে আঁকা পতাকার রং। মারঝেহ স্কোয়ারে লোকজন ব্যাগভর্তি পতাকা খুলে বিক্রি বা বিতরণ করছেন।

দেইর আজ জোরের তরুণ ওমরান মারঝেহ স্কোয়ারে বসে ছিলেন মা ও ছোট ভাই বহাউদ্দিনকে নিয়ে। লেবানন থেকে ফিরে তিনি নয় বছর পর মায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি বলেন, ৮ ডিসেম্বর মায়ের ও ভাইয়ের সঙ্গে উমাইয়া স্কোয়ারে গিয়ে উদযাপনে অংশ নেবেন।

উমাইয়া স্কোয়ারই হবে উৎসবের কেন্দ্র। শুক্রবার দুপুর থেকেই মিনিভ্যান আর স্কুটারে চড়ে তরুণ-তরুণীরা শহরের ঐতিহাসিক রাউন্ডঅ্যাবাউটে জড়ো হতে শুরু করেন। সেখানে এখনও দৃশ্যমান রয়েছে জুলাইয়ে ইসরায়েলি হামলায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ধ্বংসস্তূপ।

ইয়ারমুক শরণার্থী শিবিরের ২১ বছর বয়সী আবদুলআজিজ আল-ওমারি দুই বন্ধুকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রাউন্ডঅ্যাবাউটে। দীর্ঘ খুঁটির ওপর উড়ছিল সিরীয় ও ফিলিস্তিনি পতাকা। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, আমরা মুক্তির বার্ষিকী উদযাপন করতে এসেছি। আমরা দমিত ছিলাম, এখন সেই দুঃখ মুক্ত হয়েছে।

গাড়ির হর্ন আর আতশবাজির শব্দে উদযাপন চলে রাতভর। শনিবার দুপুরে দামেস্কে বৃষ্টি নামে, রবিবারও বৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। তবে সোমবার বার্ষিকীর দিনে আবহাওয়া রোদেলা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অনেক সিরীয় সেখানে উপস্থিত হবেন বছরের পর বছর কষ্টের স্মৃতি নিয়ে, আর মনে রাখবেন ভবিষ্যতের আশা। উমাইয়া স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে আইনজীবী রহমান আল-তাহা বলেন, মুক্তির শুরুর দিনগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা ছিল, কিন্তু গত এক বছরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলেছে। সবকিছু ভালো হচ্ছে, প্রতি মাসে নতুন কিছু দেখছি। এই অনুভূতি আসাদ আমলে কখনোই ছিল না। আশা আছে।

 

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব নাকচ, রিপাবলিকানদের জয়

আসাদের পতনের প্রথম বার্ষিকী উদযাপনে প্রস্তুত সিরিয়া

আপডেট সময় : ০৫:৪২:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫

দামেস্কের উমাইয়া স্কোয়ারকে ঘিরে ইতিমধ্যে উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়েছে। গাড়ির জানালা দিয়ে শিশুরা নাড়ছে সবুজ-সাদা-কালো সিরীয় পতাকা, আকাশে উঠছে আতশবাজি। রাজধানীসহ পুরো দেশের ‘মুক্তি দিবস’ ৮ ডিসেম্বর সামনে রেখে কয়েক দিন আগেই স্কোয়ারে জড়ো হতে শুরু করেছে মানুষ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

উৎসবের মাঝেই এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আলেপ্পোর গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা ২৪ বছর বয়সী আবু তাজ। এক দশক আগে সরকারি বাহিনী ও আসাদবিরোধীদের লড়াইয়ে তার বাড়ি ধ্বংস হয়। এরপর দামেস্ক-বৈরুত হয়ে সৌদি আরবে বাবার কাছে আশ্রয় নেন তিনি। আট বছর সৌদি আরবে থাকা ও মিসরে দুই বছর পড়াশোনার পর তিনি দেশে ফেরেন মাত্র এক সপ্তাহ আগে। তখন সিরিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দামেস্কে আসছে সেই অভিযানের স্মরণে, যা রাজধানী দখল করে বাশার আল-আসাদকে ভোরের দিকে মস্কোতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল।

গত শুক্রবার উমাইয়া মসজিদে জুমার নামাজ শেষে তিনি আসেন স্কোয়ারে উৎসব দেখতে। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, দেশের সংস্কৃতি এখন ‘জনগণের হাতে’ এবং দেশের দিকনির্দেশনা তাকে আনন্দিত করছে।

এক বছর আগে আল-আসাদ শাসনের পতন ঘটে। এর সঙ্গে শেষ হয় কয়েক দশক ধরে চলা দমন-পীড়নের পুলিশি রাষ্ট্র, যার কেন্দ্রে ছিল নির্যাতন ও গুমের অভিযোগ। বহু সিরীয়ের কাছে শাসনের পতন ছিল বহু বছরের পর প্রথম স্বস্তির নিশ্বাস।

তবে মুক্তির পরের দিনগুলোতে ছিল আনন্দের সঙ্গে উদ্বেগও। ইরাক বা লিবিয়ার উদাহরণ টেনে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেন। কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল ক্ষীণ, বিশেষ করে যখন নতুন সরকার পরিচালনা করছেন আহমেদ আল-শারা, যাকে গ্রেফতারে একসময় যুক্তরাষ্ট্র পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

এ বছরের মার্চে সিরিয়ার উপকূলীয় এলাকায় এবং জুলাইয়ে সুয়েইদায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত হন। সরকারি বাহিনীর অনুগত হিসেবে পরিচিত শক্তিগুলো উত্তেজনা বাড়িয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হামলা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। গত মাসে হোমসেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল, যদিও সরকারের হস্তক্ষেপে তা শান্ত হয়।

তবু উমাইয়া স্কোয়ারে লাখো মানুষের আগমন সামনে রেখে এটা স্পষ্ট যে, কীভাবে আসাদের পতন সিরীয়দের জীবনকে স্পর্শ করেছে। শহরের সর্বত্র এখন সবুজ-সাদা-কালো পতাকা। উমাইয়া মসজিদ এলাকার শিশুদের গালে আঁকা পতাকার রং। মারঝেহ স্কোয়ারে লোকজন ব্যাগভর্তি পতাকা খুলে বিক্রি বা বিতরণ করছেন।

দেইর আজ জোরের তরুণ ওমরান মারঝেহ স্কোয়ারে বসে ছিলেন মা ও ছোট ভাই বহাউদ্দিনকে নিয়ে। লেবানন থেকে ফিরে তিনি নয় বছর পর মায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি বলেন, ৮ ডিসেম্বর মায়ের ও ভাইয়ের সঙ্গে উমাইয়া স্কোয়ারে গিয়ে উদযাপনে অংশ নেবেন।

উমাইয়া স্কোয়ারই হবে উৎসবের কেন্দ্র। শুক্রবার দুপুর থেকেই মিনিভ্যান আর স্কুটারে চড়ে তরুণ-তরুণীরা শহরের ঐতিহাসিক রাউন্ডঅ্যাবাউটে জড়ো হতে শুরু করেন। সেখানে এখনও দৃশ্যমান রয়েছে জুলাইয়ে ইসরায়েলি হামলায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ধ্বংসস্তূপ।

ইয়ারমুক শরণার্থী শিবিরের ২১ বছর বয়সী আবদুলআজিজ আল-ওমারি দুই বন্ধুকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রাউন্ডঅ্যাবাউটে। দীর্ঘ খুঁটির ওপর উড়ছিল সিরীয় ও ফিলিস্তিনি পতাকা। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, আমরা মুক্তির বার্ষিকী উদযাপন করতে এসেছি। আমরা দমিত ছিলাম, এখন সেই দুঃখ মুক্ত হয়েছে।

গাড়ির হর্ন আর আতশবাজির শব্দে উদযাপন চলে রাতভর। শনিবার দুপুরে দামেস্কে বৃষ্টি নামে, রবিবারও বৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। তবে সোমবার বার্ষিকীর দিনে আবহাওয়া রোদেলা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অনেক সিরীয় সেখানে উপস্থিত হবেন বছরের পর বছর কষ্টের স্মৃতি নিয়ে, আর মনে রাখবেন ভবিষ্যতের আশা। উমাইয়া স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে আইনজীবী রহমান আল-তাহা বলেন, মুক্তির শুরুর দিনগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা ছিল, কিন্তু গত এক বছরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলেছে। সবকিছু ভালো হচ্ছে, প্রতি মাসে নতুন কিছু দেখছি। এই অনুভূতি আসাদ আমলে কখনোই ছিল না। আশা আছে।