মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ০৯:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

আজ আখেরি চাহার সোম্বা, কী ঘটেছিল এই দিনে?

আজ পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা। হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবার এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাস বলছে, এই দিনেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জীবনের শেষ সময়ে গুরুতর অসুস্থতা থেকে সাময়িক সুস্থতা লাভ করেছিলেন। এরপর রাসুল (সাঃ) এর সাময়িক এই সুস্থতায় খুশি হয়ে সাহাবীদের শুকরিয়া ও অকাতরে দানের সেই স্মৃতি স্মরণ করতে প্রতিবছর মুসলমানরা এই দিন ইবাদত ও দান খয়রাত করে থাকেন। 

কীভাবে হয়েছিলেন অসুস্থ?

১১ হিজরির সফর মাসের শেষ দিকে নবীজি (সা.) তীব্র জ্বর ও মাথাব্যথায় আক্রান্ত হন। অসুস্থতা এতটাই প্রকট ছিল যে তিনি মসজিদে গিয়ে নামাজের ইমামতি করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। সাহাবিরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আরেকটি বর্ণনায় জানা যায়, সফর মাসের ২৯ তারিখ রাতে নবীজি (সা.) মদিনার বিখ্যাত জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে যান এবং সেখানে সমাহিত সাহাবিদের জন্য মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে দীর্ঘ দোয়া করেন। সেখান থেকে ঘরে ফিরে আসার পরপরই তাঁর তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয়।

ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং সহিহ বুখারির হাদিস অনুযায়ী, নবীজি (সা.)-এর এই শেষ অসুস্থতার পেছনে খাইবার যুদ্ধের সময়কার একটি বিষক্রিয়ার পরোক্ষ প্রভাব ছিল। খাইবার বিজয়ের পর (হিজরি ৭ম সনে) জয়নব বিনতে আল-হারিস নামে এক ইহুদি নারী নবীজিকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছাগলের মাংসে তীব্র বিষ মিশিয়ে উপহার দিয়েছিল। নবীজি (সা.) মাংসের এক টুকরো মুখে নিয়ে চিবানোর পরই অলৌকিকভাবে বুঝতে পারেন যে এতে বিষ আছে এবং তিনি তা ফেলে দেন।

যদিও তিনি মাংসটি গিলে ফেলেননি, কিন্তু বিষের সামান্য অংশ তাঁর রক্তে প্রবেশ করেছিল। জীবনের শেষ অসুস্থতার সময় নবীজি (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-কে বলেছিলেন, “হে আয়েশা! খাইবারে খাওয়া সেই বিষাক্ত খাবারের কষ্ট আমি সবসময় অনুভব করেছি। আর এখন মনে হচ্ছে সেই বিষের প্রতিক্রিয়ায় আমার ধমনী বা হৃদপিণ্ড কেটে যাচ্ছে।”

যেভাবে হলেন সুস্থ

মাথাব্যথার পর তাঁর জ্বর এতটাই তীব্র রূপ নেয় যে সাধারণ মানুষের তুলনায় দ্বিগুণ তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছিল। সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, “আমি নবীজি (সা.)-এর অসুস্থ অবস্থায় তাঁর কাছে গেলাম, তখন জ্বরের ঘোরে তাঁর পবিত্র শরীর প্রচণ্ড কাঁপছিল।” তীব্র জ্বরের কারণে তিনি মাঝেমধ্যেই অচেতন হয়ে পড়তেন। এই তীব্র কষ্ট দূর করতে তিনি মদিনার সাতটি ভিন্ন ভিন্ন কূপের ঠান্ডা পানি তাঁর শরীরে ঢালতে বলেছিলেন, যা সাময়িক উপশম দিয়েছিল।

সফর মাসের শেষ বুধবার সকালে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। নবীজি (সা.) হঠাৎ সুস্থ বোধ করেন এবং জ্ঞান ফিরে পান। তিনি গোসল করেন এবং শেষবারের মতো মসজিদে নববীতে গিয়ে সাহাবিদের নিয়ে নামাজে ইমামতি করেন।

নবীজির সুস্থতার খবরে মদিনাজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সাহাবিরা দলে দলে তাঁর কাছে আসেন এবং আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। আবু বকর (রা.) ৫ হাজার, উমর (রা.) ৭ হাজার, ওসমান (রা.) ১০ হাজার দিরহাম দান করেন। আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) ১০০টি উট কোরবানি করেন। অনেকে দাস-দাসীকে মুক্ত করে দেন।

এই অসুস্থতা মোট ১৩ দিন স্থায়ী হয়েছিল। সফর মাসের শেষ বুধবার সাময়িক রোগমুক্তির পর তিনি শেষবারের মতো মসজিদে এসে নামাজ পড়ান এবং সাহাবিদের উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দেন। কিন্তু এরপরই রোগটি আবার মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং অবশেষে ১১ হিজরির ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার তিনি পবিত্র মদিনায় ওফাত লাভ করেন।

সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে বর্তমান যুগে বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মুসলমানরা এই দিনে নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, মিলাদ মাহফিল, তওবা-ইস্তেগফার এবং গরিব-দুঃখীদের মাঝে দান-খয়রাত ও তাবারক বিতরণের মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করেন। শরিয়তে এই দিনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক ইবাদত না থাকলেও, দিনটি মুসলমানদের হৃদয়ে নবীপ্রেম, শুকরিয়া জ্ঞাপন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপ লাভ করেছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা ও বিজেপির ভবিষ্যৎ: ভারতীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ

আজ আখেরি চাহার সোম্বা, কী ঘটেছিল এই দিনে?

আপডেট সময় : ০৮:৩২:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

আজ পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা। হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবার এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাস বলছে, এই দিনেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জীবনের শেষ সময়ে গুরুতর অসুস্থতা থেকে সাময়িক সুস্থতা লাভ করেছিলেন। এরপর রাসুল (সাঃ) এর সাময়িক এই সুস্থতায় খুশি হয়ে সাহাবীদের শুকরিয়া ও অকাতরে দানের সেই স্মৃতি স্মরণ করতে প্রতিবছর মুসলমানরা এই দিন ইবাদত ও দান খয়রাত করে থাকেন। 

কীভাবে হয়েছিলেন অসুস্থ?

১১ হিজরির সফর মাসের শেষ দিকে নবীজি (সা.) তীব্র জ্বর ও মাথাব্যথায় আক্রান্ত হন। অসুস্থতা এতটাই প্রকট ছিল যে তিনি মসজিদে গিয়ে নামাজের ইমামতি করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। সাহাবিরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আরেকটি বর্ণনায় জানা যায়, সফর মাসের ২৯ তারিখ রাতে নবীজি (সা.) মদিনার বিখ্যাত জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে যান এবং সেখানে সমাহিত সাহাবিদের জন্য মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে দীর্ঘ দোয়া করেন। সেখান থেকে ঘরে ফিরে আসার পরপরই তাঁর তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয়।

ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং সহিহ বুখারির হাদিস অনুযায়ী, নবীজি (সা.)-এর এই শেষ অসুস্থতার পেছনে খাইবার যুদ্ধের সময়কার একটি বিষক্রিয়ার পরোক্ষ প্রভাব ছিল। খাইবার বিজয়ের পর (হিজরি ৭ম সনে) জয়নব বিনতে আল-হারিস নামে এক ইহুদি নারী নবীজিকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছাগলের মাংসে তীব্র বিষ মিশিয়ে উপহার দিয়েছিল। নবীজি (সা.) মাংসের এক টুকরো মুখে নিয়ে চিবানোর পরই অলৌকিকভাবে বুঝতে পারেন যে এতে বিষ আছে এবং তিনি তা ফেলে দেন।

যদিও তিনি মাংসটি গিলে ফেলেননি, কিন্তু বিষের সামান্য অংশ তাঁর রক্তে প্রবেশ করেছিল। জীবনের শেষ অসুস্থতার সময় নবীজি (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-কে বলেছিলেন, “হে আয়েশা! খাইবারে খাওয়া সেই বিষাক্ত খাবারের কষ্ট আমি সবসময় অনুভব করেছি। আর এখন মনে হচ্ছে সেই বিষের প্রতিক্রিয়ায় আমার ধমনী বা হৃদপিণ্ড কেটে যাচ্ছে।”

যেভাবে হলেন সুস্থ

মাথাব্যথার পর তাঁর জ্বর এতটাই তীব্র রূপ নেয় যে সাধারণ মানুষের তুলনায় দ্বিগুণ তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছিল। সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, “আমি নবীজি (সা.)-এর অসুস্থ অবস্থায় তাঁর কাছে গেলাম, তখন জ্বরের ঘোরে তাঁর পবিত্র শরীর প্রচণ্ড কাঁপছিল।” তীব্র জ্বরের কারণে তিনি মাঝেমধ্যেই অচেতন হয়ে পড়তেন। এই তীব্র কষ্ট দূর করতে তিনি মদিনার সাতটি ভিন্ন ভিন্ন কূপের ঠান্ডা পানি তাঁর শরীরে ঢালতে বলেছিলেন, যা সাময়িক উপশম দিয়েছিল।

সফর মাসের শেষ বুধবার সকালে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। নবীজি (সা.) হঠাৎ সুস্থ বোধ করেন এবং জ্ঞান ফিরে পান। তিনি গোসল করেন এবং শেষবারের মতো মসজিদে নববীতে গিয়ে সাহাবিদের নিয়ে নামাজে ইমামতি করেন।

নবীজির সুস্থতার খবরে মদিনাজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সাহাবিরা দলে দলে তাঁর কাছে আসেন এবং আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। আবু বকর (রা.) ৫ হাজার, উমর (রা.) ৭ হাজার, ওসমান (রা.) ১০ হাজার দিরহাম দান করেন। আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) ১০০টি উট কোরবানি করেন। অনেকে দাস-দাসীকে মুক্ত করে দেন।

এই অসুস্থতা মোট ১৩ দিন স্থায়ী হয়েছিল। সফর মাসের শেষ বুধবার সাময়িক রোগমুক্তির পর তিনি শেষবারের মতো মসজিদে এসে নামাজ পড়ান এবং সাহাবিদের উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দেন। কিন্তু এরপরই রোগটি আবার মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং অবশেষে ১১ হিজরির ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার তিনি পবিত্র মদিনায় ওফাত লাভ করেন।

সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে বর্তমান যুগে বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মুসলমানরা এই দিনে নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, মিলাদ মাহফিল, তওবা-ইস্তেগফার এবং গরিব-দুঃখীদের মাঝে দান-খয়রাত ও তাবারক বিতরণের মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করেন। শরিয়তে এই দিনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক ইবাদত না থাকলেও, দিনটি মুসলমানদের হৃদয়ে নবীপ্রেম, শুকরিয়া জ্ঞাপন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপ লাভ করেছে।