মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ১২:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬

হামের শিশুদের নতুন হুমকি এডিনো ভাইরাস

হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক নতুন ও জটিল বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে। রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা বেশ কিছু আশঙ্কাজনক শিশুর দেহে হামের পাশাপাশি এডিনো ভাইরাসের মারাত্মক উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন চিকিৎসকেরা। সাধারণ জ্বর, সর্দি ও কাশির কারণ হলেও হামের মতো সংক্রামক রোগের সাথে এডিনো ভাইরাসের এই সহ-সংক্রমণ শিশুর শরীরের সার্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলছে এবং রোগীর অবস্থাকে খুব দ্রুত জটিল করে তুলছে।

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, যেসব হামে আক্রান্ত শিশুর অবস্থা কোনো ওষুধেই ভালো হচ্ছিল না, তাদের জন্য বিশেষ ‘রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট’ শুরু করা হয়। এখন পর্যন্ত পরীক্ষা করা ৩৫ জন গুরুতর অসুস্থ শিশু রোগীর মধ্যে ১৬ জনের শরীরেই এডিনো ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলেছে। চিকিৎসকদের মতে, বিশেষ করে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুরা এই জোড়া সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তাদের ক্ষেত্রে ফুসফুসে তীব্র জটিলতা অর্থাৎ ‘সাদা ফুসফুস’ (White Lung) লক্ষণ দেখা দিচ্ছে—যার ফলে ফুসফুস স্বাভাবিকভাবে আর অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে না।

উদ্বেগজনক এই আবিষ্কারের বিষয়টি গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক নীতি-নির্ধারণী সভায় উত্থাপন করা হলেও স্বাস্থ্য বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা বাড়তি সতর্কতামূলক নজরদারি গ্রহণ করেনি। এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ এ জাতীয় সহ-সংক্রমণের খবর সম্পর্কে নিজের অনবগতির কথা স্বীকার করেছেন।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্লিপ্ততার বিপরীতে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছে মার্কিন সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। সিডিসি-আটলান্টার নির্দেশে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে শিশু হাসপাতাল পরিদর্শনের মাধ্যমে তথ্যাদি সংগ্রহ করেছেন এবং দ্রুতই তাদের একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে এসে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। বিশিষ্ট ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা দেশে চলমান স্বাস্থ্য সংকটের মুখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই উদাসীনতা ও নজরদারির অভাবকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন।

চলতি বছর মার্চ মাস থেকে দেশে ছড়াতে থাকা হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার মে মাস পর্যন্ত গণটিকা কার্যক্রম বা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করলেও রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে। জুন মাসের তথ্যানুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রার বাইরে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু টিকাদান হিসাবের বাইরে থেকে গিয়েছিল। রোববার একদিনেই সারা দেশে ১ হাজার ২২ জন শিশু নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছে চারজন। এ নিয়ে চলতি বছরে হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪৪ জনে, যার বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুগোষ্ঠী। চিকিৎসকদের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে অবিলম্বে এডিনো ভাইরাসের এই সহ-সংক্রমণকে মূল মূল্যায়নে রেখে জাতীয় স্বাস্থ্যকৌশল নতুন করে সাজানো উচিত।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

অভিবাসন নীতিতে ট্রাম্পের ওপর মার্কিন জনআস্থার বড় ধস

হামের শিশুদের নতুন হুমকি এডিনো ভাইরাস

আপডেট সময় : ০৯:৫৭:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক নতুন ও জটিল বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে। রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা বেশ কিছু আশঙ্কাজনক শিশুর দেহে হামের পাশাপাশি এডিনো ভাইরাসের মারাত্মক উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন চিকিৎসকেরা। সাধারণ জ্বর, সর্দি ও কাশির কারণ হলেও হামের মতো সংক্রামক রোগের সাথে এডিনো ভাইরাসের এই সহ-সংক্রমণ শিশুর শরীরের সার্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলছে এবং রোগীর অবস্থাকে খুব দ্রুত জটিল করে তুলছে।

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, যেসব হামে আক্রান্ত শিশুর অবস্থা কোনো ওষুধেই ভালো হচ্ছিল না, তাদের জন্য বিশেষ ‘রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট’ শুরু করা হয়। এখন পর্যন্ত পরীক্ষা করা ৩৫ জন গুরুতর অসুস্থ শিশু রোগীর মধ্যে ১৬ জনের শরীরেই এডিনো ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলেছে। চিকিৎসকদের মতে, বিশেষ করে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুরা এই জোড়া সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তাদের ক্ষেত্রে ফুসফুসে তীব্র জটিলতা অর্থাৎ ‘সাদা ফুসফুস’ (White Lung) লক্ষণ দেখা দিচ্ছে—যার ফলে ফুসফুস স্বাভাবিকভাবে আর অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে না।

উদ্বেগজনক এই আবিষ্কারের বিষয়টি গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক নীতি-নির্ধারণী সভায় উত্থাপন করা হলেও স্বাস্থ্য বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা বাড়তি সতর্কতামূলক নজরদারি গ্রহণ করেনি। এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ এ জাতীয় সহ-সংক্রমণের খবর সম্পর্কে নিজের অনবগতির কথা স্বীকার করেছেন।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্লিপ্ততার বিপরীতে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছে মার্কিন সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। সিডিসি-আটলান্টার নির্দেশে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে শিশু হাসপাতাল পরিদর্শনের মাধ্যমে তথ্যাদি সংগ্রহ করেছেন এবং দ্রুতই তাদের একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে এসে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। বিশিষ্ট ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা দেশে চলমান স্বাস্থ্য সংকটের মুখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই উদাসীনতা ও নজরদারির অভাবকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন।

চলতি বছর মার্চ মাস থেকে দেশে ছড়াতে থাকা হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার মে মাস পর্যন্ত গণটিকা কার্যক্রম বা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করলেও রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে। জুন মাসের তথ্যানুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রার বাইরে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু টিকাদান হিসাবের বাইরে থেকে গিয়েছিল। রোববার একদিনেই সারা দেশে ১ হাজার ২২ জন শিশু নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছে চারজন। এ নিয়ে চলতি বছরে হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪৪ জনে, যার বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুগোষ্ঠী। চিকিৎসকদের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে অবিলম্বে এডিনো ভাইরাসের এই সহ-সংক্রমণকে মূল মূল্যায়নে রেখে জাতীয় স্বাস্থ্যকৌশল নতুন করে সাজানো উচিত।