ঢাকা ০১:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাবাজার: বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রাণকেন্দ্রের বিবর্তন

পুরান ঢাকার জনারণ্য ভেদ করে বাংলাবাজারের গলিগুলোতে প্রবেশ করতেই এক ভিন্ন আমেজ অনুভব হয়। এটি কেবল কাগজের সুবাস নয়, বরং ইতিহাস, আবেগ আর অগণিত শব্দের এক জীবন্ত উপাখ্যান। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা এই বাংলাবাজার শুধু বইয়ের পাইকারি বাজার নয়, এটি বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের স্পন্দনশীল প্রাণকেন্দ্র।

আজকের আধুনিক বাংলাবাজার রাতারাতি এই রূপ লাভ করেনি। এর পেছনে রয়েছে দেশভাগ ও সময়ের নানা বাঁক। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পূর্বে ঢাকার প্রকাশনা ব্যবসা মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল। তখন হাতেগোনা কিছু সাহসী ব্যবসায়ী কলকাতা থেকে শিল্প-সাহিত্যের বই এনে এখানে বিক্রি করতেন। দেশভাগের পর থেকেই দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করে।

মাটির গন্ধ ও বাংলা ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসাকে পুঁজি করে জন্ম নেয় নওরোজ কিতাবিস্তান, খোশরোজ কিতাব মহল, স্টুডেন্ট লাইব্রেরি, গ্রেট ইস্ট ও পুঁথিপত্রের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো। সে সময়ের অনেক প্রকাশক কেবল ব্যবসায়ীই ছিলেন না, তাঁরা একাধারে লেখক ও পাঠকও ছিলেন। প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলীর মতো ব্যক্তিত্বের হাত ধরে এখানকার বইয়ের বাজারের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়।

সময়ের স্রোতে বাংলাবাজারের চেহারায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। ষাট ও সত্তরের দশকে টিনের একতলা ঘরে যে প্রকাশনাগুলো পরিচালিত হতো, সেখানে আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে মান্নান মার্কেট, ইসলামি টাওয়ার, গিয়াস গার্ডেন এবং বিশাল বুকস মার্কেটের মতো সুউচ্চ বাণিজ্যিক ভবন। প্যারিদাস রোড থেকে হেমেন্দ্র চন্দ্র দাশ রোড পর্যন্ত পুরো এলাকাটিই এখন এক বিশাল বইপাড়ায় পরিণত হয়েছে। আশির দশকে সময়, আগামী, অনন্যা বা অনুপমের মতো নতুন ধারার প্রকাশনীগুলোর আগমনে বাংলাবাজার এক অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগের সূচনা করে।

প্রকাশকদের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাবাজারের অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল টিনের তৈরি একতলা ঘর। কালের পরিক্রমায় সেই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। বর্তমানে এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও অত্যাধুনিক মার্কেট। এর মধ্যে মান্নান মার্কেট অন্যতম, যার নিচতলা থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত কেবল বইয়ের দোকান রয়েছে।

বর্তমানে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি বইয়ের দোকান এবং চার শতাধিক প্রকাশনী নিয়ে বাংলাবাজার সর্বদা মুখরিত থাকে। প্রতিদিন কোটি টাকার ওপর বিকিকিনি হয় এখানে, যা মুদ্রণ, বাঁধাই ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার উৎস হিসেবে কাজ করে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লোহিত সাগরের সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন চাপ: আফ্রিকা ঘুরে আসছে তেলের জাহাজ

বাংলাবাজার: বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রাণকেন্দ্রের বিবর্তন

আপডেট সময় : ১১:৪৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

পুরান ঢাকার জনারণ্য ভেদ করে বাংলাবাজারের গলিগুলোতে প্রবেশ করতেই এক ভিন্ন আমেজ অনুভব হয়। এটি কেবল কাগজের সুবাস নয়, বরং ইতিহাস, আবেগ আর অগণিত শব্দের এক জীবন্ত উপাখ্যান। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা এই বাংলাবাজার শুধু বইয়ের পাইকারি বাজার নয়, এটি বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের স্পন্দনশীল প্রাণকেন্দ্র।

আজকের আধুনিক বাংলাবাজার রাতারাতি এই রূপ লাভ করেনি। এর পেছনে রয়েছে দেশভাগ ও সময়ের নানা বাঁক। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পূর্বে ঢাকার প্রকাশনা ব্যবসা মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল। তখন হাতেগোনা কিছু সাহসী ব্যবসায়ী কলকাতা থেকে শিল্প-সাহিত্যের বই এনে এখানে বিক্রি করতেন। দেশভাগের পর থেকেই দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করে।

মাটির গন্ধ ও বাংলা ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসাকে পুঁজি করে জন্ম নেয় নওরোজ কিতাবিস্তান, খোশরোজ কিতাব মহল, স্টুডেন্ট লাইব্রেরি, গ্রেট ইস্ট ও পুঁথিপত্রের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো। সে সময়ের অনেক প্রকাশক কেবল ব্যবসায়ীই ছিলেন না, তাঁরা একাধারে লেখক ও পাঠকও ছিলেন। প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলীর মতো ব্যক্তিত্বের হাত ধরে এখানকার বইয়ের বাজারের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়।

সময়ের স্রোতে বাংলাবাজারের চেহারায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। ষাট ও সত্তরের দশকে টিনের একতলা ঘরে যে প্রকাশনাগুলো পরিচালিত হতো, সেখানে আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে মান্নান মার্কেট, ইসলামি টাওয়ার, গিয়াস গার্ডেন এবং বিশাল বুকস মার্কেটের মতো সুউচ্চ বাণিজ্যিক ভবন। প্যারিদাস রোড থেকে হেমেন্দ্র চন্দ্র দাশ রোড পর্যন্ত পুরো এলাকাটিই এখন এক বিশাল বইপাড়ায় পরিণত হয়েছে। আশির দশকে সময়, আগামী, অনন্যা বা অনুপমের মতো নতুন ধারার প্রকাশনীগুলোর আগমনে বাংলাবাজার এক অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগের সূচনা করে।

প্রকাশকদের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাবাজারের অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল টিনের তৈরি একতলা ঘর। কালের পরিক্রমায় সেই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। বর্তমানে এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও অত্যাধুনিক মার্কেট। এর মধ্যে মান্নান মার্কেট অন্যতম, যার নিচতলা থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত কেবল বইয়ের দোকান রয়েছে।

বর্তমানে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি বইয়ের দোকান এবং চার শতাধিক প্রকাশনী নিয়ে বাংলাবাজার সর্বদা মুখরিত থাকে। প্রতিদিন কোটি টাকার ওপর বিকিকিনি হয় এখানে, যা মুদ্রণ, বাঁধাই ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার উৎস হিসেবে কাজ করে।