ঢাকা ০২:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬

লোহিত সাগরের সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন চাপ: আফ্রিকা ঘুরে আসছে তেলের জাহাজ

ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার দরুন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার পর সৌদি আরব তাদের বিকল্প পথ হিসেবে পশ্চিম উপকূলের ‘ইয়ানবু’ বন্দর ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করেছিল। তবে লোহিত সাগর সংলগ্ন বহুল আলোচিত ‘বাব আল-মান্দাব’ প্রণালিতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সামুদ্রিক অবরোধ ও হামলার ঘোষণার ফলে সেই বিকল্প পথটিও এখন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ও অচল হয়ে পড়েছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজগুলোকে এখন আন্তর্জাতিক নিরাপদ রুট হিসেবে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ প্রদক্ষিণ করে চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আসতে হচ্ছে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি, এডেন উপসাগর ও শ্রীলঙ্কার পাশ দিয়ে একটি তেলবাহী জাহাজ সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাতে সময় লাগত মাত্র ১২ থেকে ১৩ দিন। তবে বর্তমানে পরিবর্তিত দীর্ঘ ঘুরপথে জাহাজগুলোকে সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর, জিব্রাল্টার প্রণালি, আটলান্টিক মহাসাগর এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে ভারত মহাসাগর হয়ে প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম উপকূলে আসতে হচ্ছে। ফলে পূর্বে যেখানে দুই সপ্তাহের কম সময় লাগত, এখন সেখানে জাহাজ পৌঁছাতে সময় লাগছে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ দিন।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক ও সংশ্লিষ্ট সমুদ্র পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বহনকারী ‘এমটি নিনেমিয়া’ বর্তমানে এই দীর্ঘ ও দূরহ বিকল্প পথ ব্যবহার করেই বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাহাজ মালিকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কেবল পরিবহন খরচ বা ফ্রেইট চার্জ বাবদ সাড়ে তিন মিলিয়ন থেকে সাড়ে চার মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা) পর্যন্ত বাড়তি মাশুল গুনতে হতে পারে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী সতর্ক করে জানান, পরিবহন ব্যবস্থার এই আকস্মিক বিপর্যয়ে প্রতি লিটার তেলের পেছনে অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় যুক্ত হতে পারে, যা পরবর্তীতে সামগ্রিক বিদ্যুৎ ও পরিবহন ভাড়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে চলতি বছরের শুরুতে ইরান যুদ্ধের জাঁতাকলে পড়ে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ সময় আটকে ছিল তেলের জাহাজ ‘এমটি নরডিক পোলাক্স’। মূল অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) অভাবে চট্টগ্রাম পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’-এর উৎপাদন সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধের মুখোমুখি হয়েছিল। পরবর্তীতে এমটি নিনেমিয়ার খালাসের মধ্য দিয়ে উৎপাদন আবার সচল করা হলেও, একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান জলপথ (হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব) একসঙ্গে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের একক ও একমাত্র তেল শোধনাগারের নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল জোগান এখন চরম শঙ্কার মুখে পড়েছে।

দৈনিক কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও বৈশ্বিক মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এই সরু বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কা, ব্রুনাই বা মালয়েশিয়ার মতো বিকল্প কোনো বাজার থেকে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের জোগান নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য সহজ সমাধান নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুই আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে, বর্ধিত সময় ও ক্রমবর্ধমান বিশ্ববাজারের জ্বালানি মূল্যের চড়া ধাক্কায় জাতীয় অর্থনীতিতে আমদানি ব্যয়ের বিশাল চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি জামায়াতের কঠোর হুঁশিয়ারি: দিনাজপুরে বিশাল গণমিছিল

লোহিত সাগরের সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন চাপ: আফ্রিকা ঘুরে আসছে তেলের জাহাজ

আপডেট সময় : ০১:২৭:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার দরুন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার পর সৌদি আরব তাদের বিকল্প পথ হিসেবে পশ্চিম উপকূলের ‘ইয়ানবু’ বন্দর ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করেছিল। তবে লোহিত সাগর সংলগ্ন বহুল আলোচিত ‘বাব আল-মান্দাব’ প্রণালিতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সামুদ্রিক অবরোধ ও হামলার ঘোষণার ফলে সেই বিকল্প পথটিও এখন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ও অচল হয়ে পড়েছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজগুলোকে এখন আন্তর্জাতিক নিরাপদ রুট হিসেবে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ প্রদক্ষিণ করে চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আসতে হচ্ছে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি, এডেন উপসাগর ও শ্রীলঙ্কার পাশ দিয়ে একটি তেলবাহী জাহাজ সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাতে সময় লাগত মাত্র ১২ থেকে ১৩ দিন। তবে বর্তমানে পরিবর্তিত দীর্ঘ ঘুরপথে জাহাজগুলোকে সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর, জিব্রাল্টার প্রণালি, আটলান্টিক মহাসাগর এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে ভারত মহাসাগর হয়ে প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম উপকূলে আসতে হচ্ছে। ফলে পূর্বে যেখানে দুই সপ্তাহের কম সময় লাগত, এখন সেখানে জাহাজ পৌঁছাতে সময় লাগছে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ দিন।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক ও সংশ্লিষ্ট সমুদ্র পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বহনকারী ‘এমটি নিনেমিয়া’ বর্তমানে এই দীর্ঘ ও দূরহ বিকল্প পথ ব্যবহার করেই বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাহাজ মালিকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কেবল পরিবহন খরচ বা ফ্রেইট চার্জ বাবদ সাড়ে তিন মিলিয়ন থেকে সাড়ে চার মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা) পর্যন্ত বাড়তি মাশুল গুনতে হতে পারে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী সতর্ক করে জানান, পরিবহন ব্যবস্থার এই আকস্মিক বিপর্যয়ে প্রতি লিটার তেলের পেছনে অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় যুক্ত হতে পারে, যা পরবর্তীতে সামগ্রিক বিদ্যুৎ ও পরিবহন ভাড়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে চলতি বছরের শুরুতে ইরান যুদ্ধের জাঁতাকলে পড়ে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ সময় আটকে ছিল তেলের জাহাজ ‘এমটি নরডিক পোলাক্স’। মূল অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) অভাবে চট্টগ্রাম পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’-এর উৎপাদন সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধের মুখোমুখি হয়েছিল। পরবর্তীতে এমটি নিনেমিয়ার খালাসের মধ্য দিয়ে উৎপাদন আবার সচল করা হলেও, একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান জলপথ (হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব) একসঙ্গে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের একক ও একমাত্র তেল শোধনাগারের নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল জোগান এখন চরম শঙ্কার মুখে পড়েছে।

দৈনিক কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও বৈশ্বিক মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এই সরু বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কা, ব্রুনাই বা মালয়েশিয়ার মতো বিকল্প কোনো বাজার থেকে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের জোগান নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য সহজ সমাধান নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুই আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে, বর্ধিত সময় ও ক্রমবর্ধমান বিশ্ববাজারের জ্বালানি মূল্যের চড়া ধাক্কায় জাতীয় অর্থনীতিতে আমদানি ব্যয়ের বিশাল চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।