ঢাকা ০১:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড: গ্যাস সংকটে থমকে গেছে পোশাক খাতের উৎপাদন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:১৭:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে দেশে চরম গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। আগে থেকেই চাহিদার তুলনায় কম গ্যাস সরবরাহ নিয়ে হেঁচকি তুলতে তুলতে চলা তৈরি পোশাক কারখানাগুলো গত এক সপ্তাহ ধরে এক অবর্ণনীয় ও নজিরবিহীন দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ একধাক্কায় কমে যাওয়ায় দেশের পোশাক ও বস্ত্র কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ চাহিদার ৪০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে বলে চরম ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন কারখানার মালিক ও উদ্যোক্তারা। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে পোশাক কারখানাগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতা কমে গিয়ে এখন গড়ে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে এসে ঠেকেছে।

দেশের টেক্সটাইল খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল শিল্প খাতের এই দুর্বিষহ পরিস্থিতি তুলে ধরে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, জাতীয় অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত শিল্পকারখানাগুলোতে এখন এক ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। যেকোনো মূল্যে এই শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জরুরি দায়িত্ব। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বের যেসকল দেশ শতভাগ গ্যাসের ওপর নির্ভর করে শিল্প পরিচালনা করে, যেমন থাইল্যান্ড, ইংল্যান্ড কিংবা ভিয়েতনাম—সেসব দেশে তো কখনোই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় তৈরি হয় না। ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ও সময়মতো বিপুল টাকা দিয়ে গ্যাস কেনা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বারবার কেন এই ধরনের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে পড়ে শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে, তা নিয়ে তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জোর দাবি জানান যে, কারখানাকে সচল রাখার স্বার্থে প্রয়োজন হলে দেশের অন্যান্য তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ডাইভার্ট করে শিল্পে সরবরাহ দেওয়া উচিত।

এদিকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা বা বিইপিজেডের অধীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলগুলোতে নিয়মিত ব্যবস্থাপনায় গ্যাসের সংকট কিছুটা কম অনুভূত হলেও, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় ইপিজেডের বাইরে অবস্থিত সাধারণ কারখানায় এর ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় প্রভাব পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকার মতো বন্দরসংলগ্ন স্থানে বিকল্প ব্যবস্থায় কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও, সবচেয়ে চরম ও মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ার মতো শিল্পপ্রধান এলাকার শত শত স্পিনিং, ডাইং ও গার্মেন্টস কারখানাগুলো।

গাজীপুরের ভবানীপুর এলাকায় অবস্থিত এভিটেক্স অ্যাপারেলসের কারখানা প্রাঙ্গণে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি জানান, গ্যাস সংকট দেশে কোনো নতুন বিষয় নয় এবং আগে থেকেই পূর্ণ চাহিদামতো গ্যাস কখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু মহেশখালীর দুর্ঘটনার পর সেই সংকট এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। কারখানাগুলোর প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি এখন নেমে এসেছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশে। অথচ বিদেশি বায়োদের নির্ধারিত লিড টাইম বা অর্ডারের মালামাল জাহাজীকরণের ডেডলাইন রক্ষা করার জন্য প্রতিদিন বাধ্য হয়ে কারখানার শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত ওভারটাইম করাতে হচ্ছে। যে উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ে ৮ ঘণ্টার শিফটে সম্ভব ছিল, প্রেসার না থাকায় এখন সেটি ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা লাগিয়ে করা হচ্ছে। ফলস্বরূপ অতিরিক্ত ওভারটাইম বিল পরিশোধ করতে গিয়ে কারখানার পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা মালিকদের চরম লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বিটিএমএ প্রধান শওকত আজিজ রাসেল আরও যোগ করেন, এই গ্যাস দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে দেশের প্রাথমিক বস্ত্র বা ফ্যাব্রিকস প্রস্তুতকারী খাত। নারায়ণগঞ্জ ও তার আশেপাশের অধিকাংশ স্পিনিং ও নিটিং কারখানায় বর্তমানে পাইপলাইনে প্রেসার এতটাই কম যে, চাহিদার বিপরীতে তারা মাত্র ৩৫ শতাংশ গ্যাস পাচ্ছে। পোশাক কারখানাগুলোতে নিয়মিত সুতা ও কাপড়ের জোগান দিতে না পারায় পুরো সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি জানান, গ্যাসের স্বাভাবিক প্রেসার না থাকায় কোনো কারখানাই তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী দৈনিক উৎপাদন সম্পন্ন করতে পারছে না। জরুরি ভিত্তিতে যদি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই জাতীয় সংকট কাটানো না যায়, তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সময় চেয়ে ‘লিড টাইম’ পিছিয়ে দিতে হবে। তাছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে ক্রেতার কাছে পণ্য না পৌঁছালে সমুদ্রপথে জাহাজীকরণের সুবিধা হারিয়ে চড়া মাশুলে এয়ার ফ্রেইটে (উড়োজাহাজে) বা বিমানে করে পোশাক পাঠাতে হবে, যার সমস্ত বিশাল বাড়তি খরচ বহন করতে হবে দেশীয় ব্যবসায়ীদের।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের বার্ষিক মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ বা মূল মেরুদণ্ডই আসে এই তৈরি পোশাক খাত থেকে। অথচ বিশ্ববাজারের বৈরী হাওয়া ও অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গেল ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এই পোশাক খাতটি ১.৬৪ শতাংশ ঋণাত্মক বা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখেছে। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই আবার নতুন করে এই বিধ্বংসী গ্যাস সংকট শুরু হওয়ায় সামগ্রিক জাতীয় রপ্তানি আয় ভেঙে পড়ার চরম শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ফয়সাল সামাদ জানান, গত কয়েক বছর ধরে পেট্রোবাংলার সরবরাহ নিয়মিত চাহিদার থেকে কম ছিল। দুর্ঘটনা সেই চলমান ক্ষতকে আরও বহুগুণ তীব্র ও প্রাণঘাতী করে তুলেছে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) আনুষ্ঠানিক তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, দেশে বর্তমানে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে জাতীয় গ্রিডে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছিল। সম্প্রতি মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের বয়লারে অগ্নিদুর্ঘটনার ফলে একটি ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই দৈনিক সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে এখন ২১৫ কোটি ঘনফুটেরও নিচে গিয়ে ঠেকেছে।

দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত মেরামত করে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল করার তাগিদ থাকলেও তা সময়সাপেক্ষ বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) রফিকুল ইসলাম জানান, দ্রুততম সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের অক্ষত বয়লারটি চালু করার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা। এরপর দ্বিতীয় ও ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটির সংস্কারকাজ ধরা হবে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে শুরুতে আংশিকভাবে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস বাড়ানো সম্ভব হলেও, দুর্ঘটনার আগের মতো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে অন্তত আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠকের পরেই তেহরানের কৌশলগত পরিবর্তন, উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড: গ্যাস সংকটে থমকে গেছে পোশাক খাতের উৎপাদন

আপডেট সময় : ১১:১৭:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে দেশে চরম গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। আগে থেকেই চাহিদার তুলনায় কম গ্যাস সরবরাহ নিয়ে হেঁচকি তুলতে তুলতে চলা তৈরি পোশাক কারখানাগুলো গত এক সপ্তাহ ধরে এক অবর্ণনীয় ও নজিরবিহীন দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ একধাক্কায় কমে যাওয়ায় দেশের পোশাক ও বস্ত্র কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ চাহিদার ৪০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে বলে চরম ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন কারখানার মালিক ও উদ্যোক্তারা। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে পোশাক কারখানাগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতা কমে গিয়ে এখন গড়ে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে এসে ঠেকেছে।

দেশের টেক্সটাইল খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল শিল্প খাতের এই দুর্বিষহ পরিস্থিতি তুলে ধরে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, জাতীয় অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত শিল্পকারখানাগুলোতে এখন এক ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। যেকোনো মূল্যে এই শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জরুরি দায়িত্ব। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বের যেসকল দেশ শতভাগ গ্যাসের ওপর নির্ভর করে শিল্প পরিচালনা করে, যেমন থাইল্যান্ড, ইংল্যান্ড কিংবা ভিয়েতনাম—সেসব দেশে তো কখনোই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় তৈরি হয় না। ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ও সময়মতো বিপুল টাকা দিয়ে গ্যাস কেনা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বারবার কেন এই ধরনের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে পড়ে শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে, তা নিয়ে তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জোর দাবি জানান যে, কারখানাকে সচল রাখার স্বার্থে প্রয়োজন হলে দেশের অন্যান্য তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ডাইভার্ট করে শিল্পে সরবরাহ দেওয়া উচিত।

এদিকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা বা বিইপিজেডের অধীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলগুলোতে নিয়মিত ব্যবস্থাপনায় গ্যাসের সংকট কিছুটা কম অনুভূত হলেও, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় ইপিজেডের বাইরে অবস্থিত সাধারণ কারখানায় এর ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় প্রভাব পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকার মতো বন্দরসংলগ্ন স্থানে বিকল্প ব্যবস্থায় কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও, সবচেয়ে চরম ও মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ার মতো শিল্পপ্রধান এলাকার শত শত স্পিনিং, ডাইং ও গার্মেন্টস কারখানাগুলো।

গাজীপুরের ভবানীপুর এলাকায় অবস্থিত এভিটেক্স অ্যাপারেলসের কারখানা প্রাঙ্গণে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি জানান, গ্যাস সংকট দেশে কোনো নতুন বিষয় নয় এবং আগে থেকেই পূর্ণ চাহিদামতো গ্যাস কখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু মহেশখালীর দুর্ঘটনার পর সেই সংকট এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। কারখানাগুলোর প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি এখন নেমে এসেছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশে। অথচ বিদেশি বায়োদের নির্ধারিত লিড টাইম বা অর্ডারের মালামাল জাহাজীকরণের ডেডলাইন রক্ষা করার জন্য প্রতিদিন বাধ্য হয়ে কারখানার শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত ওভারটাইম করাতে হচ্ছে। যে উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ে ৮ ঘণ্টার শিফটে সম্ভব ছিল, প্রেসার না থাকায় এখন সেটি ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা লাগিয়ে করা হচ্ছে। ফলস্বরূপ অতিরিক্ত ওভারটাইম বিল পরিশোধ করতে গিয়ে কারখানার পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা মালিকদের চরম লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বিটিএমএ প্রধান শওকত আজিজ রাসেল আরও যোগ করেন, এই গ্যাস দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে দেশের প্রাথমিক বস্ত্র বা ফ্যাব্রিকস প্রস্তুতকারী খাত। নারায়ণগঞ্জ ও তার আশেপাশের অধিকাংশ স্পিনিং ও নিটিং কারখানায় বর্তমানে পাইপলাইনে প্রেসার এতটাই কম যে, চাহিদার বিপরীতে তারা মাত্র ৩৫ শতাংশ গ্যাস পাচ্ছে। পোশাক কারখানাগুলোতে নিয়মিত সুতা ও কাপড়ের জোগান দিতে না পারায় পুরো সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি জানান, গ্যাসের স্বাভাবিক প্রেসার না থাকায় কোনো কারখানাই তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী দৈনিক উৎপাদন সম্পন্ন করতে পারছে না। জরুরি ভিত্তিতে যদি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই জাতীয় সংকট কাটানো না যায়, তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সময় চেয়ে ‘লিড টাইম’ পিছিয়ে দিতে হবে। তাছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে ক্রেতার কাছে পণ্য না পৌঁছালে সমুদ্রপথে জাহাজীকরণের সুবিধা হারিয়ে চড়া মাশুলে এয়ার ফ্রেইটে (উড়োজাহাজে) বা বিমানে করে পোশাক পাঠাতে হবে, যার সমস্ত বিশাল বাড়তি খরচ বহন করতে হবে দেশীয় ব্যবসায়ীদের।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের বার্ষিক মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ বা মূল মেরুদণ্ডই আসে এই তৈরি পোশাক খাত থেকে। অথচ বিশ্ববাজারের বৈরী হাওয়া ও অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গেল ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এই পোশাক খাতটি ১.৬৪ শতাংশ ঋণাত্মক বা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখেছে। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই আবার নতুন করে এই বিধ্বংসী গ্যাস সংকট শুরু হওয়ায় সামগ্রিক জাতীয় রপ্তানি আয় ভেঙে পড়ার চরম শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ফয়সাল সামাদ জানান, গত কয়েক বছর ধরে পেট্রোবাংলার সরবরাহ নিয়মিত চাহিদার থেকে কম ছিল। দুর্ঘটনা সেই চলমান ক্ষতকে আরও বহুগুণ তীব্র ও প্রাণঘাতী করে তুলেছে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) আনুষ্ঠানিক তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, দেশে বর্তমানে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে জাতীয় গ্রিডে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছিল। সম্প্রতি মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের বয়লারে অগ্নিদুর্ঘটনার ফলে একটি ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই দৈনিক সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে এখন ২১৫ কোটি ঘনফুটেরও নিচে গিয়ে ঠেকেছে।

দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত মেরামত করে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল করার তাগিদ থাকলেও তা সময়সাপেক্ষ বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) রফিকুল ইসলাম জানান, দ্রুততম সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের অক্ষত বয়লারটি চালু করার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা। এরপর দ্বিতীয় ও ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটির সংস্কারকাজ ধরা হবে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে শুরুতে আংশিকভাবে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস বাড়ানো সম্ভব হলেও, দুর্ঘটনার আগের মতো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে অন্তত আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।