ঢাকা ০৩:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

সাংহাইয়ের আদলে ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ

ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে পুরান ঢাকাকে উন্নত বিশ্বের আরবান রি জেনারেশন বা শহরের পরিকল্পিত পুনর্জীবন ধারণার আলোকে সাংহাই মডেলে পুনর্গঠনের ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইন্টিগ্রেটেড প্রজেক্ট ফর রিভাইটালাইজেশন অব ওল্ড ঢাকা শীর্ষক একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা পিডিপিপি নীতিগত অনুমোদনের জন্য ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার পর এই যুগান্তকারী উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে এবং বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত হলে পুরো এলাকার জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে সাংহাই মডেল বলতে মূলত চীনের সাংহাই শহরকেন্দ্রিক নগর উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের একটি সফল ও পরিকল্পিত মডেলকে বোঝায়। এই মডেলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শহরের জরাজীর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোকে পুনর্বিন্যাস করে সেখানে আধুনিক আবাসন এবং উন্নত সড়ক ও গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও উন্নত নাগরিক সুবিধা গড়ে তোলার পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো আব্দুল মতিন জানিয়েছেন যে পুরান ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং রাজউকের সর্বশেষ বিধিমালাতেও রি ডেভেলপমেন্ট ও রি জেনারেশন সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান যে মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বিধায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডিকে সম্ভাব্য বিদেশি অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের অনুরোধ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পের আওতায় প্রায় ছয় হাজার পাঁচশত একর এলাকা পুনর্গঠনের বিশাল পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বিস্তীর্ণ এলাকার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চব্বিশ থেকে একষট্টি নম্বর ওয়ার্ড এবং বাষট্টি নম্বর ওয়ার্ডের একটি বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার দুইশত আটান্ন কোটি চল্লিশ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রাথমিক সমীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য ছত্রিশ কোটি পঁচাশি লাখ টাকা এবং মূল বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য প্রায় পাঁচ হাজার দুইশত একুশ কোটি পঞ্চান্ন লাখ টাকা প্রয়োজন হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক এবং জাইকা ও এডিবিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছে অর্থায়নের প্রস্তাব পাঠানোর পাশাপাশি কোরিয়া ও চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এই নগর উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে।

নতুন নকশা ও পরিকল্পনায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে সোশ্যাল হাউজিং বা সামাজিক আবাসন মডেলে পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এলাকার মোট ভূমির প্রায় ষাট শতাংশ কেবল উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। সেখানে প্রশস্ত সড়ক এবং সবুজ এলাকার পাশাপাশি কমিউনিটি পার্কিং এবং জলাধার ও আর্ট মিউজিয়ামসহ ঐতিহ্যবাহী খাবারের কর্নার গড়ে তোলা হবে। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন দীর্ঘদিনের যানজট এবং অগ্নিঝুঁকি ও অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার কারণে পুরান ঢাকা যে সংকটে রয়েছে এই প্রকল্পের মাধ্যমে তার চিরস্থায়ী সমাধান সম্ভব। কোন স্থাপনা সংরক্ষিত হবে এবং কোনটি পুনর্গঠন করা হবে তা নির্ধারণ করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে মাস্টারপ্ল্যানেই সবকিছু চূড়ান্ত করা হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ফুলগাজীতে চেক জালিয়াতি: ৫১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩

সাংহাইয়ের আদলে ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ

আপডেট সময় : ০১:৩৭:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে পুরান ঢাকাকে উন্নত বিশ্বের আরবান রি জেনারেশন বা শহরের পরিকল্পিত পুনর্জীবন ধারণার আলোকে সাংহাই মডেলে পুনর্গঠনের ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইন্টিগ্রেটেড প্রজেক্ট ফর রিভাইটালাইজেশন অব ওল্ড ঢাকা শীর্ষক একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা পিডিপিপি নীতিগত অনুমোদনের জন্য ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার পর এই যুগান্তকারী উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে এবং বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত হলে পুরো এলাকার জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে সাংহাই মডেল বলতে মূলত চীনের সাংহাই শহরকেন্দ্রিক নগর উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের একটি সফল ও পরিকল্পিত মডেলকে বোঝায়। এই মডেলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শহরের জরাজীর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোকে পুনর্বিন্যাস করে সেখানে আধুনিক আবাসন এবং উন্নত সড়ক ও গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও উন্নত নাগরিক সুবিধা গড়ে তোলার পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো আব্দুল মতিন জানিয়েছেন যে পুরান ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং রাজউকের সর্বশেষ বিধিমালাতেও রি ডেভেলপমেন্ট ও রি জেনারেশন সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান যে মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বিধায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডিকে সম্ভাব্য বিদেশি অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের অনুরোধ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পের আওতায় প্রায় ছয় হাজার পাঁচশত একর এলাকা পুনর্গঠনের বিশাল পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বিস্তীর্ণ এলাকার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চব্বিশ থেকে একষট্টি নম্বর ওয়ার্ড এবং বাষট্টি নম্বর ওয়ার্ডের একটি বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার দুইশত আটান্ন কোটি চল্লিশ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রাথমিক সমীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য ছত্রিশ কোটি পঁচাশি লাখ টাকা এবং মূল বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য প্রায় পাঁচ হাজার দুইশত একুশ কোটি পঞ্চান্ন লাখ টাকা প্রয়োজন হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক এবং জাইকা ও এডিবিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছে অর্থায়নের প্রস্তাব পাঠানোর পাশাপাশি কোরিয়া ও চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এই নগর উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে।

নতুন নকশা ও পরিকল্পনায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে সোশ্যাল হাউজিং বা সামাজিক আবাসন মডেলে পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এলাকার মোট ভূমির প্রায় ষাট শতাংশ কেবল উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। সেখানে প্রশস্ত সড়ক এবং সবুজ এলাকার পাশাপাশি কমিউনিটি পার্কিং এবং জলাধার ও আর্ট মিউজিয়ামসহ ঐতিহ্যবাহী খাবারের কর্নার গড়ে তোলা হবে। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন দীর্ঘদিনের যানজট এবং অগ্নিঝুঁকি ও অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার কারণে পুরান ঢাকা যে সংকটে রয়েছে এই প্রকল্পের মাধ্যমে তার চিরস্থায়ী সমাধান সম্ভব। কোন স্থাপনা সংরক্ষিত হবে এবং কোনটি পুনর্গঠন করা হবে তা নির্ধারণ করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে মাস্টারপ্ল্যানেই সবকিছু চূড়ান্ত করা হবে।