মুসলিম ঐতিহ্যে হিজরি বর্ষের সূচনালগ্ন মহররম মাস এলেই এক চেনা দৃশ্যের অবতারণা হয়—রঙিন কাগজ, বাঁশ ও কাঠের কারুকাজে তৈরি হোসাইন (রা.)-এর সমাধির প্রতিকৃতি নিয়ে শোকের স্লোগান আর বুক চাপড়ে কান্নার রোল। এই দৃশ্যটিই তাজিয়া মিছিল নামে পরিচিত। তবে আজকের এই তাজিয়া মিছিল একদিনে এই রূপ লাভ করেনি; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস এবং দেশ-বিদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সংমিশ্রণ।
‘তাজিয়া’ শব্দের অর্থ হলো সমবেদনা বা শোক প্রকাশ। পরিভাষাগতভাবে, ৬১ হিজরিতে কারবালার প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হোসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শাহাদাতের মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণ করে শিয়া সম্প্রদায়ের আয়োজিত শোকানুষ্ঠানকেই তাজিয়া বলা হয়। এই মর্মস্পর্শী ঘটনার স্মৃতি ধারণ করেই তাজিয়া প্রথার সূচনা।
কারবালার ঘটনার পর থেকেই ইমাম হুসাইন (রা.)-এর স্মরণে শোক প্রকাশের বিভিন্ন রীতি গড়ে ওঠে। প্রাথমিক যুগে আহলে বাইতের অনুসারীরা কারবালায় গিয়ে তাঁর কবর জিয়ারত করতেন এবং বিশেষ করে ১০ মহররমে একত্র হয়ে তাঁর শাহাদতকে স্মরণ করতেন। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, মুখতার সাকাফি প্রথমদিকে কুফায় আশুরা উপলক্ষে শোকসভা আয়োজন করেন এবং হুসাইনের স্মরণে বিলাপের ব্যবস্থা করেন। শুরুতে এসব অনুষ্ঠান ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও সীমিত পরিসরের, যেখানে মানুষ কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া-দরুদ ও মর্সিয়া পাঠ করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব আয়োজন ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট রীতি ও আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়।
চতুর্থ হিজরি শতকে বুয়াইহি শাসনামলে ইরাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আশুরার শোকানুষ্ঠান পালন শুরু হয়। তখন বাজার বন্ধ রাখা, কালো পোশাক পরিধান, শোকমিছিল ও গণসমাবেশের ব্যাপকতা দেখা যায়। পরে সাফাভি যুগে ইরানে হুসাইন (রা.)-এর স্মরণে শোকানুষ্ঠান আরও বিস্তৃত রূপ লাভ করে এবং তাজিয়া ও কারবালাভিত্তিক নাট্যরূপের বিকাশ ঘটে।
মিসরের ফাতেমীয় শাসনামলেও আশুরা রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন হতো, যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বাজার বন্ধ রাখা, মিছিল, নওহা ও শোকগাথা পাঠ। একইভাবে আন্দালুস, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাহরাইন, ওমান, লেবানন এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে আশুরা পালনের ভিন্ন ভিন্ন রীতি গড়ে ওঠে, যা এই শোকের ঐতিহ্যকে বিশ্বব্যাপী এক অনন্য রূপ দিয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























