ঢাকা ০২:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

মিরপুরের পথে বিউটি আপা: স্বাবলম্বী নারীর এক অনুপ্রেরণামূলক জীবনযুদ্ধ

সন্ধ্যা সাড়ে ৯টা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে তখন অফিসফেরত মানুষের ভিড়, যানজট আর অটোরিকশার দীর্ঘ সারি। বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু অটোরিকশার চালকদের চাহিদা যেন একটু বেশিই। ৩০ টাকার ভাড়ার জন্য তারা ৬০-৭০ টাকা দাবি করছিল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটি অটোরিকশা এসে আমার সামনে থামল। চালকের আসনে ছিলেন একজন নারী। মুখে মৃদু হাসি। তিনি বললেন, ‘চলেন আপা, ন্যায্য ভাড়াই নেব।’

কিছুটা কৌতূহল নিয়ে তার অটোরিকশায় উঠলাম। স্বীকার করতেই হবে, কৌতূহলের পাশাপাশি কিছুটা সংকোচ ও ভয়ও ছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব সংকোচ ও ভয় দূর হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, তিনি একজন দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী চালক। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্বাভাবিক হয়ে বসলাম। পথ চলতে চলতে স্বভাবসুলভভাবে গল্প জুড়ে দিলাম। সেই গল্পের বিষয়বস্তু ছিল চালকের আসনে বসা নারী—বিউটি আপার জীবন ও সংগ্রাম।

বিউটি আপার সংসারে সদস্যসংখ্যা ছয়জন—স্বামী, দুই সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং তিনি নিজে। এত দিন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তার স্বামী। সীমিত আয়ে কোনো রকমে চলছিল সংসার। কিন্তু প্রায় দেড় বছর আগে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। কবে আবার সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পারবেন, কিংবা আদৌ ফিরতে পারবেন কি না—তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।

পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো পরিবার কঠিন সংকটে পড়ে। বিপদের সময়ে কোনো আত্মীয়ের কাছ থেকেও সহযোগিতা মেলেনি। সংসারের আয়-রোজগারে কিছুটা সহায়তা করতে তার বয়স্ক শ্বশুর একটি স্কুলের সামনে বস্তা পেতে শাকসবজি বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু তাতে আর কতটুকুই বা আয় হয়, যখন পুরো সংসারের ভার কাঁধে?

এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মতো ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি বিউটি। সংসারের হাল ধরতে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। প্রথমে গার্মেন্টসে কাজ করেছেন, বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজও করেছেন। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে তাকে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নিয়েছেন এমন একটি পেশা, যেখানে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে তিনি নিজের সময়, শ্রম ও মর্যাদাকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। বিউটি আপা এখন একজন অটোরিকশাচালক। আত্মসম্মান বজায় রেখে জীবনযুদ্ধে সফলভাবে এগিয়ে চলা একজন স্বনির্ভর নারী। হিজাব পরিহিত বিউটি আপার নিজস্ব কিছু নীতি রয়েছে; তিনি তার পাশের আসনে কোনো পুরুষ যাত্রী বসতে দেন না, যা সম্মান ও নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে যাওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা: সত্য ও মিথ্যার এক অসম লড়াইয়ের ইতিহাস

মিরপুরের পথে বিউটি আপা: স্বাবলম্বী নারীর এক অনুপ্রেরণামূলক জীবনযুদ্ধ

আপডেট সময় : ০১:৪২:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

সন্ধ্যা সাড়ে ৯টা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে তখন অফিসফেরত মানুষের ভিড়, যানজট আর অটোরিকশার দীর্ঘ সারি। বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু অটোরিকশার চালকদের চাহিদা যেন একটু বেশিই। ৩০ টাকার ভাড়ার জন্য তারা ৬০-৭০ টাকা দাবি করছিল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটি অটোরিকশা এসে আমার সামনে থামল। চালকের আসনে ছিলেন একজন নারী। মুখে মৃদু হাসি। তিনি বললেন, ‘চলেন আপা, ন্যায্য ভাড়াই নেব।’

কিছুটা কৌতূহল নিয়ে তার অটোরিকশায় উঠলাম। স্বীকার করতেই হবে, কৌতূহলের পাশাপাশি কিছুটা সংকোচ ও ভয়ও ছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব সংকোচ ও ভয় দূর হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, তিনি একজন দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী চালক। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্বাভাবিক হয়ে বসলাম। পথ চলতে চলতে স্বভাবসুলভভাবে গল্প জুড়ে দিলাম। সেই গল্পের বিষয়বস্তু ছিল চালকের আসনে বসা নারী—বিউটি আপার জীবন ও সংগ্রাম।

বিউটি আপার সংসারে সদস্যসংখ্যা ছয়জন—স্বামী, দুই সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং তিনি নিজে। এত দিন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তার স্বামী। সীমিত আয়ে কোনো রকমে চলছিল সংসার। কিন্তু প্রায় দেড় বছর আগে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। কবে আবার সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পারবেন, কিংবা আদৌ ফিরতে পারবেন কি না—তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।

পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো পরিবার কঠিন সংকটে পড়ে। বিপদের সময়ে কোনো আত্মীয়ের কাছ থেকেও সহযোগিতা মেলেনি। সংসারের আয়-রোজগারে কিছুটা সহায়তা করতে তার বয়স্ক শ্বশুর একটি স্কুলের সামনে বস্তা পেতে শাকসবজি বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু তাতে আর কতটুকুই বা আয় হয়, যখন পুরো সংসারের ভার কাঁধে?

এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মতো ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি বিউটি। সংসারের হাল ধরতে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। প্রথমে গার্মেন্টসে কাজ করেছেন, বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজও করেছেন। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে তাকে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নিয়েছেন এমন একটি পেশা, যেখানে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে তিনি নিজের সময়, শ্রম ও মর্যাদাকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। বিউটি আপা এখন একজন অটোরিকশাচালক। আত্মসম্মান বজায় রেখে জীবনযুদ্ধে সফলভাবে এগিয়ে চলা একজন স্বনির্ভর নারী। হিজাব পরিহিত বিউটি আপার নিজস্ব কিছু নীতি রয়েছে; তিনি তার পাশের আসনে কোনো পুরুষ যাত্রী বসতে দেন না, যা সম্মান ও নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে যাওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।