ভ্রমণপিপাসু মানুষের জীবনে কিছু জায়গা থাকে, যেখানে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ আর সবুজের আবেশে মোড়া এমন স্থানগুলোর মধ্যেই অন্যতম শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান, লাউয়াছড়া বন আর মাধবপুর লেকের পাশাপাশি এখানে আছে এক অপূর্ব স্বর্গভূমি—বাইক্কা লেক। পাখির রাজ্য নামে পরিচিত এই অসাধারণ বিলটি শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে, পৌঁছাতে লাগে প্রায় ৪০ মিনিট। তবে এই যাত্রাপথের রোমাঞ্চও আলাদা। ভোরের আলো পুরোপুরি উঠতে না উঠতেই যখন কুয়াশা চারপাশ ঢেকে রাখে, তখন লেকের পথে যেতে মনে হয় যেন প্রকৃতিই স্বাগত জানাচ্ছে। প্রধান সড়ক ছেড়ে সরু গ্রামের পথে ঢুকতেই চোখে পড়ে একের পর এক অস্পষ্ট গাছের সারি, আর কুয়াশার পর্দায় কয়েক গজ দূর পর্যন্তও দেখাই কঠিন হয়ে পড়ে। যেন প্রতিটি মুহূর্তে প্রকৃতি নতুন করে সাজিয়ে রাখছে আপনাকে মুগ্ধ করার জন্য।
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওড়ের পূর্ব দিকে প্রায় ১০০ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই জলাভূমি। ২০০৩ সালে এখানে মৎস্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। আইড়, কই, মেনি, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিরাপদে বংশবৃদ্ধি করলেও বাইক্কা বিলের মূল পরিচিতি পাখির আবাস হিসেবে। বিলের চারপাশে ফোটে শাপলা, পদ্ম আর নানা জলজ ফুল, আর পানির ওপরে সকাল-সন্ধ্যায় চলে রঙিন ফড়িংয়ের উৎসব। কখনো দেখা মেলে ভিন্ন ধরনের পোকামাকড়, প্রজাপতি কিংবা ছোট জলচর প্রাণী। তবে প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, এই বিলে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে নানারঙের পাখি। শীত এলেই এখানে পরিযায়ী পাখির আগমন যেন উৎসবের মতো। হাজার হাজার পাখি দূর উত্তরের ঠান্ডা অঞ্চল থেকে এসে আশ্রয় নেয় এই নিরাপদ জলাভূমিতে। গবেষণায় পাওয়া গেছে, ২০১১ সালেই এখানে ২০৩ প্রজাতির পাখি শনাক্ত হয়—যার মধ্যে ১৫৩টি পরিযায়ী এবং ৫০টি স্থানীয়। আপনি যদি পাখিপ্রেমী হন, তবে মনে হবে পানকৌড়ি, কানিবক, ধলাবক, রাঙাবক, দলপিপি, পাতি সরালী, রাজসরালী, ল্যাঙ্গাহাঁসসহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি পাখিই যেন আপনাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছে। বিলে পাখি দেখার জন্য রয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। উপরে উঠলেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ জলাভূমি, নিচে ফুটে থাকা শাপলা-পদ্ম আর আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়ানো পাখি। কারো ডানা রোদের আলোয় ঝলমল করছে, কারো ডানায় জমে আছে সকালে শিশির। পাখির ডাক আর শান্ত জলাভূমির আবেশ মুহূর্তেই মনকে টেনে নেয় প্রকৃতির গভীরে।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে ট্রেন বা বাসে শ্রীমঙ্গল পৌঁছাতে পারেন। উপবন, জয়ন্তিকা, পারাবত ও কালনি এক্সপ্রেসের ট্রেন ভাড়া ২৪০–৮০০ টাকা। হানিফ, এনা, শ্যামলী বা সিলেট এক্সপ্রেসের এসি ও নন-এসি বাসে ভাড়া ৫০০–৭০০ টাকা। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ইজিবাইক, অটোরিকশা বা মাইক্রো ভাড়া নিয়ে সহজেই বাইক্কা বিলে যাওয়া যায়।
থাকা-খাওয়া
বাইক্কা বিলে সাধারণত কেউ রাতের জন্য থাকে না। ভ্রমণ শেষ করে শ্রীমঙ্গল বা পরবর্তী গন্তব্যে থাকা সুবিধাজনক। শ্রীমঙ্গলে বিভিন্ন মানের হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। খাওয়ার জন্য জনপ্রিয় স্থানগুলো হলো গ্র্যান্ড তাজ, হাবিব হোটেল, কুটুম বাড়ি ও শ্রীমঙ্গল ইন। ভ্রমণের সময় শুকনো খাবার সঙ্গে রাখা ভালো।
রিপোর্টারের নাম 

























