দেশজুড়ে ব্যাপক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও আশানুরূপভাবে কমছে না হামের সংক্রমণ। সরকারের দাবি, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রে এখনো প্রতিদিন শত শত শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে। এ পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন টিকাদানের প্রকৃত কভারেজ, রোগতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে দেশে হামের সংক্রমণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে। এরপর পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালায়। সরকারি হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে এত বড় কর্মসূচির পরও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। কোনো এলাকায় ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি শিশুর মধ্যে কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হলে সংক্রমণ সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কেবল কতজন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, সেটি নয়; বরং টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে কার্যকর সুরক্ষা তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে যে অনেক শিশু হয়তো টিকাদানের আওতার বাইরে থেকে গেছে অথবা কিছু এলাকায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রার কভারেজ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভাইরাসের সংক্রমণ চক্র পুরোপুরি ভাঙা যায়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের ঘাটতি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, আক্রান্ত শিশুদের বয়স, অবস্থান, পূর্বে টিকা গ্রহণের অবস্থা এবং জটিলতার ধরন নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা গেলে কোন অঞ্চল বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কোন বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে তা চিহ্নিত করা সহজ হতো।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু রোগী শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; রোগটির বিস্তারের ধরণ বুঝতে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ জরুরি। কারণ এর ওপর ভিত্তি করেই অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচি, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব।
হাম মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ের একটি চিকিৎসা নির্দেশিকা বা গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায়নি। চিকিৎসকরা মনে করছেন, এমন একটি গাইডলাইন থাকলে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে সমন্বিত পদ্ধতি অনুসরণ করা সম্ভব হতো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামকে অনেক সময় সাধারণ জ্বর বা চর্মরোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এটি মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখের সংক্রমণ, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। তাই দ্রুত শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য দাবি করছে, জুন মাসের শুরু থেকে সংক্রমণের হার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তাদের মতে, টিকাদান কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাব মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হচ্ছে এবং পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ হামের সংক্রমণ একবার ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। তাই নজরদারি কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে টিকাদানের প্রকৃত কভারেজ যাচাই, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা এবং দ্রুত জাতীয় চিকিৎসা গাইডলাইন অনুমোদনের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
তাদের মতে, শুধু টিকা দেওয়ার সংখ্যাকে সাফল্যের সূচক হিসেবে দেখলে হবে না। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং হামের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
রিপোর্টারের নাম 
























