আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন। কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল না হয়েও অল্প সময়ের মধ্যে লাখো তরুণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে প্ল্যাটফর্মটি। বেকারত্ব, রাজনৈতিক হতাশা, সামাজিক বৈষম্য এবং তরুণদের ক্ষোভকে রসাত্মক উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরায় সিজেপি এখন দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপকে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে এটি একটি মজার উদ্যোগ হিসেবে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
সংগঠনটির সদস্যপদের শর্তগুলোও ব্যতিক্রমী। তাদের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সদস্য হতে হলে বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে সক্রিয় এবং অভিযোগ বা ক্ষোভ প্রকাশে পারদর্শী হতে হবে। যদিও এসব শর্ত ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তবে এর মাধ্যমে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের বাস্তব চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আমিও ককরোচ’ হ্যাশট্যাগ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে যখন সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব ‘বিজেপি বনাম সিজেপি’ লিখে সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেন।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা এক কোটির বেশি ছাড়িয়ে যায়। ফলে অনুসারীর সংখ্যার বিচারে এটি ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টকেও ছাড়িয়ে যায়। তবে রাজনৈতিক শক্তি ও সাংগঠনিক সক্ষমতার দিক থেকে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো তুলনা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে ভারতের তরুণ সমাজের দীর্ঘদিনের হতাশা। কর্মসংস্থান সংকট, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতির কারণে অনেক তরুণ নিজেকে মূলধারার রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করছেন। সেই শূন্যতাকেই কাজে লাগিয়েছে সিজেপি।
সংগঠনটি নিজেদের ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের ভাষ্য, সমাজের নানা অসঙ্গতিতে হতাশ মানুষের জন্য এটি একটি প্রতীকী প্ল্যাটফর্ম।
‘ককরোচ’ বা তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে বিশেষ বার্তা। তেলাপোকা প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। সিজেপির সমর্থকদের মতে, বর্তমান সময়ের তরুণদের অবস্থার সঙ্গেও এই প্রতীকের মিল রয়েছে। নানা সংকটের মধ্যেও তারা টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে কিছু অসন্তুষ্ট তরুণকে ‘তেলাপোকার মতো ছড়িয়ে পড়া’ বলে মন্তব্য করেন। পরে তিনি ব্যাখ্যা দিলেও মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। অনেকের মতে, সিজেপির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে এই ঘটনাও ভূমিকা রেখেছে।
যদিও সংগঠনটির ভাষা ও উপস্থাপনা হাস্যরসাত্মক, তবু তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নির্বাচনী স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে নিয়ে আসছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি হয়তো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে না। তবে অন্যদের মতে, সিজেপি ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—ভারতের তরুণ প্রজন্ম নিজেদের কথা বলার জন্য নতুন ভাষা ও নতুন প্ল্যাটফর্ম খুঁজছে।
সিজেপির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যেই এটি ভারতের লাখো তরুণের হতাশা, ক্ষোভ ও প্রত্যাশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আর সে কারণেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এখন ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত নাম।
রিপোর্টারের নাম 




















