রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকায় এক বৃদ্ধা মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মৃত্যুর কয়েকদিন পর তার মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় যেমন মানবিক প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি সামনে এসেছে সন্তানদের দায়িত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং প্রবীণদের অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক। ঘটনাটি অনেককে মনে করিয়ে দিয়েছে—সন্তান থাকা সত্ত্বেও কেন একজন মা বা বাবা জীবনের শেষ সময়ে এমন অসহায় অবস্থার মুখোমুখি হন? পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নুরজাহান বেগম নামে ওই বৃদ্ধা তার মেয়ের বাসাতেই থাকতেন। তবে তাকে আলাদা একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, কক্ষটির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও বসবাসের অনুপযোগী। এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ, সমালোচনা এবং নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রবীণদের সুরক্ষায় রয়েছে বিশেষ আইন
প্রবীণ মা-বাবার অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ প্রণয়ন করে। আইনটির মূল লক্ষ্য হলো সন্তানদের মাধ্যমে মা-বাবার আর্থিক, সামাজিক ও মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বার্ধক্যে তাদের অবহেলা বা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়া থেকে রক্ষা করা। সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন, একক পরিবার বৃদ্ধি, কর্মসূত্রে দূরে বসবাস এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি অবহেলার শিকার হচ্ছেন। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই আইনটি কার্যকর করা হয়।
সন্তানদের ওপর কী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে?
আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তান তার মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বাধ্য। ভরণপোষণ বলতে শুধু খাবার বা অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; এর মধ্যে নিরাপদ বাসস্থান, চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা এবং মানসিক সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত। আইনে আরও বলা হয়েছে, সম্ভব হলে সন্তানদের মা-বাবার সঙ্গে একই স্থানে বসবাস করতে হবে। কোনো কারণে একসঙ্গে থাকা সম্ভব না হলে নিয়মিত যোগাযোগ, খোঁজখবর এবং প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে সবাইকে সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে। এছাড়া মা-বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
দায়িত্ব পালন না করলে কী শাস্তি?
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী, কোনো সন্তান যদি যৌক্তিক কারণ ছাড়া মা-বাবার ভরণপোষণে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে আদালত দোষী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা, তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দিতে পারেন। জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী মা-বাবাকে দেওয়ার বিধানও রয়েছে। তবে বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ তুলনামূলক কম। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মা-বাবারা নিজেদের সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চান না। পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়, সামাজিক সংকোচ এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতা অনেককে অভিযোগ দায়ের থেকে বিরত রাখে।
শুধু অর্থ নয়, প্রয়োজন মানসিক সঙ্গও
প্রবীণদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, অনেক প্রবীণ মানুষ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হলেও মানসিকভাবে চরম নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। সন্তানরা দেশের বাইরে কিংবা কর্মব্যস্ত জীবনে থাকায় নিয়মিত যোগাযোগের অভাব দেখা দেয়। বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সভাপতি আলহাজ্ব মুহাম্মদ শামসুল হক বলেছেন, সন্তানদের মানুষ করে তোলা যেমন মা-বাবার দায়িত্ব, তেমনি বার্ধক্যে মা-বাবার যত্ন নেওয়া সন্তানদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রার ব্যস্ততা এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা যাচ্ছে।
বার্ধক্যে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সামাজিক সংযোগ
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রবীণ মানুষের জন্য অর্থের পাশাপাশি সামাজিক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত কথা বলা, খোঁজখবর নেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং নিরাপদ পরিবেশে রাখার মাধ্যমে তাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা যায়। অনেক সময় দেখা যায়, প্রবীণ ব্যক্তি আর্থিক সহায়তা পেলেও দীর্ঘ সময় একা থাকেন। ফলে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা মৃত্যুর মতো ঘটনাও দেরিতে জানা যায়। মিরপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ।
সন্তান না থাকলে কী হবে?
সরকার ২০২৩ সালে ভরণপোষণ আইনের আলোকে বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো প্রবীণের সন্তান জীবিত না থাকলে কিংবা দেখভালের মতো কেউ না থাকলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তাদের সহায়তা করা হবে। এ জন্য পিতা-মাতা ভরণপোষণ কমিটি এবং বিশেষ ভরণপোষণ তহবিল গঠনের বিধান রয়েছে। সরকারি অনুদান ও দেশি-বিদেশি সহায়তার মাধ্যমে এসব প্রবীণ নাগরিকের প্রয়োজনীয় সেবা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হবে।
মিরপুরের ঘটনা যে বার্তা দিল
মিরপুরের বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমাজের সামনে প্রবীণদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নও তুলে ধরেছে। আইন থাকলেও পরিবার ও সমাজের মানবিক দায়িত্ববোধ ছাড়া প্রবীণদের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধেরও অংশ। আর সেই মূল্যবোধের চর্চাই ভবিষ্যতে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 

























