দীর্ঘদিনের মন্দার কারণে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ এখনো লোকসানের ভার বহন করছেন। ধারাবাহিক দরপতনের ফলে অনেক কোম্পানির শেয়ারের মূল্য প্রকৃত অবস্থার তুলনায় কমে গেছে। একই সঙ্গে সামগ্রিক বাজারও অবমূল্যায়িত পর্যায়ে চলে এসেছে। বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই ৯-এর নিচে অবস্থান করছে, যা বাজারকে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত কোনো কোম্পানির পিই ১০ থেকে ১৫-এর মধ্যে থাকলে সেটিকে গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। আর পিই ১০-এর নিচে নেমে এলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারকে অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য অনুকূল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই বিবেচনায় দেশের বর্তমান শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে শেয়ারবাজারে কোনো বিনিয়োগই শতভাগ নিরাপদ নয়, কারণ এটি স্বভাবতই ঝুঁকিপূর্ণ একটি ক্ষেত্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সময়ে সঠিক কোম্পানি নির্বাচন করতে পারলে শেয়ারবাজার থেকে ভালো মুনাফা অর্জন সম্ভব। কিন্তু পর্যাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণ ছাড়া বিনিয়োগ করলে লোকসানের ঝুঁকিও থাকে। তাই বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার সম্ভাবনা এবং অতীত কার্যক্রম সম্পর্কে ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।
বর্তমানে খাতভিত্তিক পিই বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাত সবচেয়ে কম মূল্যায়িত অবস্থানে রয়েছে। এই খাতের পিই ৪ দশমিক ৮৬। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পিই ৫ দশমিক ৭৬, মিউচুয়াল তহবিল খাতের ৮ দশমিক ৯৩ এবং ওষুধ খাতের ৯ দশমিক ৮৯। এসব খাতের পিই বাজারের গড়ের চেয়েও কম, যা অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে কিছু খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সিরামিক খাতের পিই ৩৮৮-এর বেশি, যা অত্যন্ত উচ্চ হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া কাগজ ও মুদ্রণ, পাট, তথ্যপ্রযুক্তি, খাদ্য এবং ভ্রমণ খাতের পিইও তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে এসব খাতের কিছু কোম্পানির শেয়ারের মূল্য বাস্তব অবস্থার তুলনায় অতিমূল্যায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক Richard D Rosario মনে করেন, শুধু পিই দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। তার মতে, কোনো কোম্পানির নিট সম্পদ মূল্য, ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, করপোরেট সুশাসন, মালিকানার কাঠামো এবং পরিচালনা পর্ষদের সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বাজারের গড় পিই কম হওয়ায় বাজারকে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, কিন্তু সব কোম্পানি একইভাবে বিনিয়োগযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এখনো পর্যাপ্ত সংখ্যক শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির ঘাটতি রয়েছে। বড় দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পান না। ফলে বাজারের সামগ্রিক চিত্র দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে কোম্পানিভিত্তিক বিশ্লেষণ জরুরি।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য উপযোগী অবস্থানে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যেগুলোতে দ্রুত মুনাফার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি বড় ধরনের লোকসানের ঝুঁকিও রয়েছে। এসব শেয়ার সাধারণত স্বল্পমেয়াদি লেনদেনের জন্য উপযোগী হলেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য সবসময় উপযুক্ত নয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক Shakil Rizvi বলেন, পিই বিনিয়োগ ঝুঁকি মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটিই চূড়ান্ত নয়। কারণ কোম্পানির আয় কমে গেলে পিই বেড়ে যেতে পারে, আবার আয় বাড়লে পিই কমে যেতে পারে। তাই শুধু একটি সূচকের ওপর নির্ভর না করে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরিচালনা পর্ষদের দক্ষতা এবং লভ্যাংশ প্রদানের ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আবেগ নয়, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাজারে সুযোগ রয়েছে, তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে মৌলভিত্তি শক্তিশালী, নিয়মিত মুনাফাকারী এবং সুশাসনসম্পন্ন কোম্পানি বেছে নেওয়ার বিকল্প নেই। সঠিক বিশ্লেষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে বর্তমান অবমূল্যায়িত বাজার ভবিষ্যতে ভালো মুনাফার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 























