চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুরের দুর্ভেদ্য পাহাড়ি অঞ্চলে যৌথবাহিনীর জন্য নতুন একটি ক্যাম্প বানানোর কাজ করছিলেন ২৭ জন নির্মাণ শ্রমিক। কিন্তু গভীর রাতে সেখানে আকস্মিক ও বর্বরোচিত হামলা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের ব্যাপক গোলাগুলির পর তাদের মনে এখন তীব্র মৃত্যুভয় দানা বেঁধেছে। চোখে-মুখে চরম আতঙ্ক নিয়ে মো. নীরব নামের একজন শ্রমিক সেই রাতের ভয়াবহতার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, হামলাকারীরা যদি তাদের দেখতে পেত, তবে নিশ্চিতভাবেই মেরে ফেলত। তারা সেখানে যৌথবাহিনীর ক্যাম্প নির্মাণের কাজ করার কারণেই মূলত সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর মারাত্মক ক্ষুব্ধ ছিল। জীবন বাঁচিয়ে ফিরে আসা এই শ্রমিক আতঙ্কিত কণ্ঠে জানান, সেই রাতে তারা যেন নিজের চোখে আজরাইল দেখেছেন এবং স্রেফ ভাগ্যের জোরেই মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছেন।
গত রোববার গভীর রাতে মূল সড়কের বিভিন্ন স্থান কেটে জঙ্গল ছলিমপুরের আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর নির্মাণাধীন ক্যাম্পে এই ত্রিমুখী হামলা চালায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় গোলাগুলির পাশাপাশি প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হওয়া নতুন ক্যাম্পটি তারা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে যায়। র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান এই নজিরবিহীন ও পরিকল্পিত হামলার ঘটনার জন্য জঙ্গল ছলিমপুরের দীর্ঘদিনের ‘অধরা নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত ইয়াছিন বাহিনীকে সরাসরি দায়ী করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি নতুন ক্যাম্প নির্মাণের কাজে নিয়োজিত ওই শ্রমিকরা এই ভয়াবহ হামলার প্রত্যক্ষদর্শী। সোমবার সকালে আলীনগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় কাজ চললেও শ্রমিকদের চোখে-মুখে চাপা আতঙ্ক এবং তারা এখন আর সেখানে নিজেদের নিরাপদ বোধ করছেন না。
মাকসুদুল আলম নামের এক নির্মাণ শ্রমিক জানান, গত ১ মে থেকে তারা এই নতুন ক্যাম্প নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। ঘটনার রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে রাত ১টার দিকে তারা যখন নির্মাণ শেডে ঘুমাতে যান, তখনই হঠাৎ তীব্র গুলির শব্দ শুনতে পান। ঘর থেকে বের হয়ে তিনি দেখেন, ক্যাম্পের সামনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা আলীনগর স্কুলের দিকে দৌঁড়ে যাচ্ছেন, কারণ সেদিক থেকেই গুলির শব্দ বেশি আসছিল। এর পরপরই তিনি পূর্ব দিক থেকে একটি ট্রাক আসতে দেখেন, যার পেছনে কয়েকশ লোক লাঠিসোঁটা ও দেশীয় এবং ভারী অস্ত্র নিয়ে চিৎকার করতে করতে ধেয়ে আসে এবং ক্যাম্পে তাণ্ডব শুরু করে। সন্ত্রাসী বাহিনী মূলত ট্রাকে করে একটি এক্সক্যাভেটর বা মাটি কাটার গাড়ি নিয়ে এসেছিল এবং তাদের পেছনে মোটরসাইকেলেও অনেক লোকজন আসে। এসেই তারা নির্মাণাধীন ক্যাম্পে ভারী ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গুলি ছুড়তে থাকে এবং পাথর ও গুলি মেরে লাইট পোস্টের আলোগুলো ভেঙে দিলে পুরো এলাকা মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে যায়, যার পরপরই শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি。
সন্ত্রাসীদের তান্ডব দেখে মাকসুদুলসহ তিন জন শ্রমিক ভয়ে পাশের একটি নালায় গিয়ে লুকান এবং আরও চার জন দৌঁড়ে গিয়ে নির্মাণাধীন ক্যাম্পের বিপরীত পাশের থাকার ঘরে আশ্রয় নেন। শাহীন আলম নামের আরেক শ্রমিক জানান, রাতে পশ্চিম দিক থেকে গুলির শব্দ শোনার পর তারা দেখেন পূর্ব দিক থেকে দুই-তিনশ সশস্ত্র লোক দৌঁড়ে আসছে, যাদের সামনে ছিল একটি ট্রাক এবং পেছনে মোটরসাইকেলের বহর। সবার হাতেই ছোট-বড় আগ্নেয়াস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও ধারালো রামদা ছিল। তারা ঘরে ঢুকে বাথরুমে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও সন্ত্রাসীরা ঘরের ভেতর ঢুকে শাহীন আলমকে পেয়ে বেদম মারধর করে এবং ঘরের ভেতর থাকা শ্রমিকদের কষ্টার্জিত টাকা-পয়সা ও মোবাইল ফোনসহ সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়。 শ্রমিকরা জানান, আসন্ন ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার জন্য রোববার বিকালেই তাদের বকেয়া মজুরির টাকা পরিশোধ করা হয়েছিল, যার একটি বড় অংশই ডাকাতদল লুটে নিয়েছে। তবে টাকা হারানোর চেয়েও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসাই তাদের কাছে এখন অলৌকিক মনে হচ্ছে。
নির্মাণ শ্রমিকদের দাবি, এই হামলার প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই চলছিল এবং তাদের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। গত শনিবার বিকালে আনুমানিক ২৫-২৬ বছর বয়সী এক অজ্ঞাত যুবক নির্মাণ শেডে গিয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও করতে করতে শ্রমিকদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। এছাড়া জঙ্গল ছলিমপুর এলাকার দোকানপাট সাধারণত রাত ১২টার দিকে বন্ধ হলেও, রোববার রাতে রহস্যজনকভাবে রাত ১০টার মধ্যেই সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়। রাতে দোকান বন্ধ থাকায় এক শ্রমিক যখন সিগারেট কিনতে অটো রিকশা স্ট্যান্ডে যান, তখন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন সন্দেহভাজন লোকের আচরণ তাদের মনে কুপ্রভাব ফেলেছিল। সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, আলীনগর এলাকায় নতুন যে সরকারি ক্যাম্পটি করা হচ্ছিল, সেটির প্রতি সন্ত্রাসীদের বিশেষ ক্ষোভ ও নজর ছিল এবং মূলত সেটি পুরোপুরি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই তারা এক্সক্যাভেটরসহ সমস্ত ভারী সরঞ্জাম নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এসেছিল。
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৯ মার্চ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৩ হাজার ১৮৩ জন সদস্যকে নিয়ে জঙ্গল ছলিমপুরে একটি বিশাল ও সমন্বিত অভিযান চালিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন, যেখানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি এবং হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। ওই অভিযানের পর আলীনগর স্কুলে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয় এবং এর অদূরেই নতুন এই স্থায়ী ক্যাম্পটি নির্মাণের কাজ চলছিল। সোমবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বায়েজিদ লিঙ্ক রোড থেকে জঙ্গল ছলিমপুরে প্রবেশের খেজুর তলা, পাথরি ঘোনা ও আলীনগর চৌরাস্তা মোড়সহ মোট চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এক্সক্যাভেটর দিয়ে রাস্তা গভীরভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। এই প্রতিবন্ধকতার কারণে যৌথবাহিনীর কোনো গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি এবং সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সদস্যদের কয়েক কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়েছে。
র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, আলীনগরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন গ্রুপের দুই-তিনশ সন্ত্রাসী এই নগ্ন হামলা চালিয়েছে। তারা দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি একে-৪৭ এবং চাইনিজ রাইফেলের মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক ও নিষিদ্ধ সামরিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে চড়াও হয়। দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় যুদ্ধের মতো প্রচুর পরিমাণে গোলাগুলি হলেও সৌভাগ্যবশত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা শ্রমিকদের কেউ আহত হননি। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা প্রথম দিকে টিয়ার শেল ও শটগানের বুলেট ব্যবহার করলেও, শেষ মুহূর্তে সন্ত্রাসীরা যখন একে-৪৭ দিয়ে সরাসরি ফায়ার করা শুরু করে, তখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও নিজেদের রাইফেল থেকে পাল্টা গুলি ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। সন্ত্রাসীরা এক্সক্যাভেটর দিয়ে স্কুলের পেছনের সীমানা প্রাচীর ভেঙে সেই পথ দিয়ে জঙ্গলের ভেতরে পালিয়ে যায়। যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে বেশ কিছু সন্দেহভাজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং হামলায় সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানানো হয়েছে。
দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগর এলাকাটি চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের একটি ‘দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য’ এবং অবৈধ ব্যবসার স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি র্যাবের একটি দল সেখানে অভিযানে গেলে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে সাধারণ মানুষকে উসকে দিয়ে র্যাব সদস্যদের ঘেরাও করে এবং তাদের পিটুনিতে র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নির্মমভাবে নিহত হন। এরপর মার্চের বড় অভিযানের পর প্রশাসন সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করলেও, দেড় মাসের মাথায় এই ভয়াবহ হামলা প্রমাণ করে যে মূল হোতারা এখনও কতটা শক্তিশালী। পুলিশ সুপার মাসুদ আলম স্বীকার করেন যে, দীর্ঘদিনের এই সন্ত্রাসী সাম্রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আগমনের ফলে তাদের কায়েমি স্বার্থে বড় ধাক্কা লেগেছে, তাই তারা কাউন্টার অ্যাটাক করার জন্য মুখিয়ে ছিল এবং এই সম্পূর্ণ এলাকা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
র্যাব-৭ এর অধিনায়ক হাফিজুর রহমান জানান, জঙ্গল ছলিমপুরে দুর্গম পাহাড়ের ভেতর দিয়ে এক্সক্যাভেটর এনে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে চর্তুদিক থেকে রাস্তা কেটে তারা এই ঝটিকা হামলা সম্পন্ন করেছে। মূলত ইয়াছিন গ্রুপ বিগত ১৮-২০ বছর ধরে এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি ‘রাষ্ট্র’ বা শাসনব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছিল, যেখান থেকে তাদের উৎখাত করায় তারা বর্তমান সরকারকে চরমভাবে বিব্রত করতে এবং নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এই হামলা চালিয়েছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, আমিন টেক্সটাইল মিলের সাধারণ শ্রমিক থেকে আলীনগরের একচ্ছত্র ‘রাজা’ হয়ে ওঠা ইয়াছিন এবং তার ভাই ওমর ফারুক ও ভাগ্নে আনোয়ারের সিন্ডিকেটই এই অঞ্চলের মূল চালিকাশক্তি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরো জঙ্গল ছলিমপুরের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ইয়াছিনের হাতে চলে যায়। বিশাল পাহাড়ি অঞ্চল এবং যোগাযোগের জন্য পাকা রাস্তা না থাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি দ্রুত পৌঁছাতে পারে না এবং এই ভৌগোলিক সুযোগ নিয়েই সন্ত্রাসীরা প্রতিবার হামলার পর অনায়াসে গভীর জঙ্গলে আত্মগোপন করে। প্রশাসন জানিয়েছে, বায়েজিদ লিংক রোড থেকে এই এলাকা পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ও পাকা রাস্তা নির্মাণ করা সম্ভব হলে সন্ত্রাসীদের আর এভাবে পালিয়ে থাকার কোনো সুযোগ থাকবে না।
রিপোর্টারের নাম 






















