ঢাকা ১০:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সরীসৃপতন্ত্র

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:০৩:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

***

টিলা থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে যাওয়ার পর আচমকা আলবাঁধানো পথটুকুও শেষ হয়ে যায়। সামনে জেগে ওঠে এক কিম্ভূতকিমাকার ব আকৃতির টুকরো জমি। দক্ষিণে তার বিশাল এক জলাশয়। বাকি তিন দিকে স্থল। সেই টুকরো জমিনে মানুষজন নানা কাজে ব্যস্ত। তুমি আবিষ্কার করো, ভিড়ের উজান ঠেলে তোমার পরিচিত কিছু মুখ একটা-দুটো করে ভেসে উঠছে। মুখগুলো তোমার পত্রিকা অফিসের সহকর্মীদের।

ওই যে বাতাবিলেবুর চারায় ঝাঁজরি দিয়ে পানি দিচ্ছে রফিক, পত্রিকা অফিসের জাঁদরেল দুজন স্টাফ রিপোর্টারের একজন। বাঁশের মাচায় লাউ চাষে ব্যস্ত অপর স্টাফ রিপোর্টার লুতফর। পেড়ে ফেলা লাউগুলোর একাংশ টুকরিতে তুলে রাখছে সে, অপেক্ষাকৃত কচিকাঁচাগুলোকে মাচার সঙ্গে জড়িয়ে ঝুলিয়ে দিচ্ছে যত্ন করে। একটু পরপর কাজ থামিয়ে দুজনেই নোটপ্যাডে নোট নিচ্ছে—খসখসাখসখস। আগামী দিনের রিপোর্ট হয়তো। সাল ১৯৮৭। বাতাবিলেবু আর লটকনের এ বছরে যে বাম্পার ফলন, তার ওপরে একটা রিপোর্ট তো এখন সময়ের দাবি। কিন্তু রিপোর্টটা ওদের দুজনের মধ্যে লিখবে কে? তোমার একবার ইচ্ছা হয় গলা উঁচিয়ে ওদের দুজনকে ডেকে সেটা জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু ওরা যে যার কাজে এত ব্যস্ত যে ডাক আর দিয়ে ওঠা হয় না তোমার। ওদের পাশ কাটিয়ে তুমি এগিয়ে যাও আরও সামনে।

খানিকটা দূরে, দক্ষিণ দিকে জলাশয়ের তীর ঘেঁষে দেখা মেলে আরেক এলাহি কারবারের। মাছ ধরার এক বিশাল জাল হাতে দাঁড়িয়ে সংস্কৃতি ও বিনোদন বিট কাভার করা সাইফুল। পানিতে জাল ফেলে যাকে আটকেছে সে, তাকে তো মৎস্যকন্যা ভিন্ন আর কিছু মনে হচ্ছে না। সাইফুলের দিকে তির্যক চোখে তাকিয়ে, অর্থপূর্ণ হাসি ছুড়ে দিয়ে সে মৎস্যকন্যা লেজ থপাস থপাস বাড়ি মারছে ডাঙায়। সঙ্গে সঙ্গে দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কোথা থেকে যেন ছুটে এসে সাদা রিফ্লেক্টর এনে ধরে মৎস্যকন্যার সামনে। সূর্যের আলো তাতে প্রতিবিম্বিত হয়ে মৎস্যকন্যার চেহারার চেকনাই বাড়িয়ে দেয়। সাইফুল হাতের জাল ছুড়ে ফেলে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে কন্যার কোমর, থুতনি, চিবুক স্পর্শ করে করে নানা আবেদনময়ী অঙ্গভঙ্গি শিখিয়ে দেয় একটু পরপর, আর কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরায় সে লাস্যময়ীর ছবি তোলে পটাস পটাস। সবকিছু দেখেশুনে তোমার ঠোঁটের কোণ চিরে হাসি ফুটে ওঠে। তুমি মাথা নাড়তে নাড়তে এগিয়ে চলো সামনে। অফিসে সাইফুলকে কেন সবাই বেশ হিংসার চোখে দেখে, তা তোমার কাছে আরও বোধগম্য হয়।

উত্তর পাশে দেখা মেলে বিজ্ঞাপন বিভাগের ছোটনের। ঘানিতে খুব পরিশ্রম করে শরিষা ভেঙে তেল বের করছে সে। রোদে ওর ঘর্মাক্ত চাঁদি চকচক করলেও তোমার খুব একটা মায়া হয় না। ঘানি ভাঙিয়ে বের করা তেলের প্রায় অর্ধেকটাই ও গোপনে বাসায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে প্রতিবার। ধরাও পড়ে যায় বসের চোখে মাঝেসাঝে। বসের ক্ষমাঘেন্নার জোরেই ছোটনের চাকরিটা বেঁচে আছে এখনো। বস বড়লোক ফ্যামিলির সন্তান, প্রতি মাসের শেষে একটা নির্দিষ্ট দিনে তার স্যালারি না গুনলেও চলে। কিন্তু পত্রিকা অফিসের যেসব কর্মচারীর মাসে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে বেতন হাতে পাওয়াটা খুবই জরুরি, তারা যারপরনাই খেপা ছোটনের ওপর। তবে ঘানিতে শরিষা ভেঙে তেল বের করার কাজে ওর কোনো জুড়ি নেই এবং কাজটা এতটা নিয়মিত, এতটা এফোর্ট দিয়ে করবার মতো আপাতত কেউ নেই বলে ছোটন যথারীতি বহাল রয়ে গেছে ওর পজিশনে। সবশেষে পিয়ন হাশেমেরও দেখা মেলে। শুধু শুধুই চক্রাকারে দৌড় পাড়ছে সে জায়গাটার পরিধি বরাবর।

বদ্বীপের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট মাঠ। বৃত্তাকার সে মাঠের মাঝবরাবর একটা কাঁঠালগাছ। গাছটার গুঁড়ি ঘেঁষে পাতা চেয়ার-টেবিলে বসা পত্রিকা অফিসের সম্পাদক, তোমার বস। তোমাকে দেখামাত্রই দূর থেকে হাত নাড়লেন তিনি। কাছে এগিয়ে গেলে হাতের ইশারায় বসতে বললেন তোমাকে উল্টো পাশে পেতে রাখা চেয়ারে।

‘ডিসিশন নিছি, তোমারে এর পর থেকে রিপোর্টিংয়ে পাঠাব।’

টেবিলের ওপর রাখা দিস্তা দিস্তা নিউজপ্রিন্ট কাগজ। তারই একটা দুহাতে ফরফর করে ছিঁড়তে ছিঁড়তে কথাটা বললেন তিনি। তার শীতল, অভিব্যক্তিহীন দৃষ্টি তোমার দিকে তাক করা। মানুষের নানা রকম মুদ্রাদোষ থাকে। একজনের মুদ্রাদোষের সঙ্গে অন্যজনেরটা সাধারণত মেলে না। তবে তোমার বসের মুদ্রাদোষটা একটু বেশিই ব্যতিক্রম। অফিসে যতক্ষণ তার ডেস্কে থাকেন, তার পুরোটা সময়ই তিনি ফরফরিয়ে কাগজ ছেঁড়েন। ছেঁড়ার মতো কাগজ হাতের কাছে না থাকলে অস্থির হয়ে পড়েন। তোমরা, অফিসের কর্মচারীরা সবাই মিলে একবার হিসাব করে বের করেছিলে, যে পরিমাণ কাগজ বস প্রতি মাসে ছিঁড়ে নষ্ট করেন, সে টাকায় একজন স্টাফ রিপোর্টারের এক মাসের বেতন হয়ে যায়। তবু তোমাদের বেতন নিয়মিত হয় না। এদিকে বসের টেবিলে ছিঁড়বার মতো পর্যাপ্ত কাগজের সাপ্লাই মাসজুড়ে মজুত থাকে।

টেবিলের ওপর মজুত কাগজের দিস্তা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘এখন অফিসে তোমার কী কাজ?’

‘মূলত প্রুফ দেখা, আর দরকার পড়লে টুকটাক ফিচার লেখা, বস।’

‘প্রুফট্রুফ বাদ দাও, তোমারে আমি প্রমোশন দিয়া ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট বানাব। তুমি মনে মনে নিজেরে রিপোর্টিংয়ের জন্য প্রস্তুত করো। প্রিপারেশন নিতে থাকো নিজের মতো কইরা।’ এই বলতে বলতে বস টেবিল থেকে কাগজের একটা দিস্তা তুলে একটানে ফরফর করে সেটা ছিঁড়ে দুটুকরো করে ফেলেন। তারপর দুই টুকরো থেকে চার টুকরো, চার টুকরো থেকে আট টুকরো, আট থেকে ষোলো—এরপর আরও কুটিকুটি করে ছিঁড়তে থাকেন।

‘সবাই জীবনে ইমপ্রুভমেন্ট চায়। তুমি চাও না?’

‘চাই, বস।’ তুমি তোমার সম্পাদকের তালে তাল মেলাও।

‘“ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম”—এই পুরা ফ্রেজটারে দুই ভাগে ভাগ করলে কী পাওয়া যায়?’

বসের প্রশ্ন শুনে তোমার মাথার এদিক-সেদিক চুলকানি আসে। তুমি মাথা চুলকাও। উত্তরটা তুমি তোমার মতো করে দিতে পারবে, তবে তুমি জানো যে বসের আসলে তোমার উত্তর শোনার আগ্রহ নেই। তিনি এ বিষয়ে তার নিজস্ব হাইপোথিসিস তোমাকে শোনাতে চান বলেই প্রশ্নটা করেছেন। কাজেই এ পরিস্থিতিতে তোমার যা করা নিরাপদ, তুমি তা-ই করো। চেহারা যথাসম্ভব ক্যাবলা ক্যাবলা বানিয়ে বসে থাকো।

‘প্রথম শব্দটা, অর্থাৎ “ইনভেস্টিগেটিভ”—এইটা হইল একটা অ্যাডজেকটিভ, বাংলায় যারে বলে বিশেষণ। আর দ্বিতীয় শব্দটা, যারে বিশেষায়িত করা হইসে, সেইটা হইল গিয়া একটা নাউন, অর্থাৎ বিশেষ্য “জার্নালিজম”। এখন জার্নালিজম, অর্থাৎ সাংবাদিকতা তো আমরা করিই। কতটুকু ঠিক হয় বা ভুল হয় বা আদৌ হয় কি না—সেইটা ভিন্ন আলাপ। কিন্তু পেশাগতভাবে আমরা সবাই সাংবাদিক। এখন এই যে আগের বিশেষণ বা অ্যাডজেকটিভ, এইটা একটা ডিফারেন্ট ক্যাটাগরি, সাংবাদিকতার একটা ভিন্ন শ্রেণি। জার্নালিজমের একটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। ফলো করতেছ আমার কথা?’

তুমি বসের প্রশ্নের উত্তরে জোরে জোরে মাথা নাড়ো। চেহারায়, হাবেভাবে দ্বিগুণ উৎসাহ ফুটিয়ে তোলো।

‘কথা হচ্ছে, সবাইরে দিয়া এই ইনভেস্টিগেশন ব্যাপারটা হয় না। একে তো এই কাজ একদম হাতে-কলমে শেখার জিনিস। আর এর তাড়নাটাও আসা লাগে একদম বুকের ভেতর থেকে,’ বস দুবার বুকের ওপর আঙুল ঠোকেন। ‘লাইক লিবিডো ইনস্টিঙ্কট। কোনো ফরমাল ট্রেইনআপ সম্ভব না। লাগানোর মতো ব্যাপার অনেকটা। যতই বন্ধুবান্ধবের কানকথা শুনো, চটি পড়ো কিংবা ভিডিও টিউটরিয়াল দেখো, নিজে থেইকা একটা মেয়ের গায়ে হাত রাখার আগপর্যন্ত তুমি কাজটা ঠিকঠাক করতে পারবা না।’

বস তার বুকপকেট থেকে পেটমোটা পাইলট জেল পেন বের করে টেবিলের ওপর রেখে ঘোরাতে থাকেন বনবন করে।

‘তবে তোমারে দিয়া হবে। দেখলেই বোঝা যায় যে তুমি ঘাগু মাল। ভেতরে ভেতরে পাইকা একদম ঝানু হইয়া আছ।’

বস টেবিলের এপাশ থেকে হাত বাড়িয়ে তোমার থুতনি ধরার চেষ্টা করে নাগাল পেতে ব্যর্থ হন। নিজের জায়গায়ই বসে থাকবে, না একটু ঝুঁকে গিয়ে থুতনি এগিয়ে দেবে—এ ব্যাপারে কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পেরে শেষমেশ তুমি সিটেই বসে থাকো চুপচাপ। তবে এই অভূতপূর্ব নতুন পরিচয় লাভে তুমি কিছুটা হকচকিতও বটে। আসলেই তুমি ঘাগু বান্দা, যেমনটা বললেন বস? ভেতরে-ভেতরে পেকে ঝানু হয়ে আছ? কবে থেকে? অবশ্য হতেও পারে, বস বলছেন যেহেতু। এই অফিসে বা দুনিয়ার সমস্ত অফিসে, বসেরা যা বলেন, সেটাই ঠিক।

‘গ্রামে মাছ ধরছ কখনো?’

বসের প্রশ্নে তোমার ডানে-বামে মাথা নাড়ানো লাগে। নিজের বাড়ি ছেড়ে গ্রামে যাওনি কখনো তুমি। মাছ ধরা তোমার কম্মও নয়।

‘ধুরু! মাছ ধরো নাই কখনো আর আসছ সাংবাদিকতা করতে।’ বসকে সত্যি সত্যি বিরক্ত লাগে। ‘গ্রামের পুকুরে বা খেতের আইলে মাছ ধরার চেয়ে আমাদের সাংবাদিকতার লাইনে মাছ ধরার কাজ খুব বেশি ভিন্ন না। তবে আমরা ট্যাঁটা, বড়শি দিয়া বা জাল পাইতা মাছ মারি না। আমাদের মাছ ধরতে হয় খালি হাতে, ছাই দিয়া।’ বস জিব বের করে সুড়ুত সুড়ুত করে লোল টানেন। ‘যারেই ধরবা, একদম ছাইচাপা দিয়া ক্যাঁক কইরা ধরবা। পার্টি তুড়ুক-বুরুক করবে, কিন্তু হাত ফসকায়া বাইরায়া যাইতে পারবে না। এইটা হইল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম ইন আ নাটশেল।’

ঠিক এমন সময় পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক সলিমুল্লাহ এসে দাঁড়ায় টেবিলের এক পাশে। বস টেবিলের ওপর কলম ঘোরাতে ঘোরাতেই প্রশ্ন করেন, ‘অ্যাসাইনমেন্ট যা দিছিলাম, শেষ করতে পারছ, সলিমুল্লা?’

সলিম উত্তর না দিয়ে বুকপকেট থেকে একটুকরো কাগজ বের করে রাখে সম্পাদকের টেবিলে। তারপর বলে, ‘বস, আমার নাম সলিম-উল্লাহ, সলিমুল্লা না। আলাদা আলাদা দুইটা সিলেবল। সলিম-উল্লাহ আলাদা আলাদা বলতে কষ্ট হলে খালি সলিম বললেও চলে।’

‘আই সি,’ বস ভ্রু কুঁচকে ফেলেন। ‘তো তোমার নামের যে শেষ সিলেবল, অর্থাৎ “উল্লাহ”, ওইটা কি আরবি হরফ “আইন” দিয়া, নাকি “হামজা” দিয়া, নাকি “আলিফ” দিয়া?’

‘জানি না বস।’ কিছুক্ষণ মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে থেকে সলিম-উল্লাহ জানায়।

জবাবে বস তার সামনে এনে রাখা কাগজ ঠেলে এগিয়ে দেন সলিমের দিকে। ‘ধরো। কী লিখছ, ছন্দ মেনটেইন কইরা জোরে জোরে আবৃত্তি কইরা শুনাও আমাদের। মোকামও আছে এইখানে। অয়ও শুনুক। মোকামরে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট বানানোর পরিকল্পনা আছে। তোমার কবিতা জাতের হইলে সাহিত্য পাতা থেকে প্রমোশন দিয়া তোমারে ক্রাইম রিপোর্টার বানাব।’

তুমি আবিষ্কার করো, সলিম শুকনো মুখে কাগজটা হাতে তুলে নিচ্ছে।

‘খুশি হইলা না লাগে?’ বস মুখ গম্ভীর করে বলেন। ‘সাহিত্য পাতায় থাইকা উপরি টুপাইস কামানোর সুযোগ আছে? সাহিত্য হইল অকম্মা ভাদাইম্মাদের কারবার। ক্রাইম রিপোর্টিংয়ে একবার ঢুকলে দেখবা, টুপাইস থেকে ফোর পাইস, ফোর পাইস থেকে সিক্সটিন পাইস—অ্যারিথমেটিক্যাল না, একদম জিওম্যাট্রিক প্রগ্রেশনে উন্নতি।’ বস সলিমের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ঘোষণা দিয়ে খোশমেজাজে ফেরত আসেন, ‘নাও, শুরু করো।’

সলিম দু-একবার গলাখাঁকারি দিয়ে শুরু করে আবৃত্তি:

‘ভোরের পাখিটির মতন

কে যেন আচানক ডাকিয়া ওঠে কুহু কুহু

সুদূরে যায় উড়ে মুদিয়া নয়ন

কাহার ছায়া ভাসে চৌক্ষে এমন

কাজলেরও রেখাটি যেমন

আবছা হলেও থেকে যায় চৌক্ষের পাতায়

স্মৃতির ঝাঁপি খুলি অপেক্ষায় থাকি তোমারি।

প্রভাতে-দিনান্তে-নিশিরাতে

মনের মাঝে আঁকা তোমার তসবির দেখি

প্রেমের তশতরিতে

ভাবি অবিরাম আমারে যে ব্যারাম দিয়াছ তুমি

ভালোবাসা-কুহেলিকা

তার হয় কি প্রতিদান?

তার চেয়ে ভালো এসো নিরজনে

কুঞ্জবনে গুঞ্জরনে

হাতে রাখি হাত, চলি আনমনে

যেতে যেতে বীথিকায় দেখি সহসা

তোমার আমার প্রেমের ফুল ফুটে আছে সাঁঝবেলায়

সে ফুল পরাব আমি তোমার কবরীতে

এই সে উপহার শুধু তোমারই জন্য।’

মনের গভীর থেকে উঠে আসা হাই চেপে বসে থাকতে তোমার যারপরনাই কষ্ট হচ্ছিল। এই পর্যন্ত পড়ে সলিম-উল্লাহ চুপ করলে তুমি মনে মনে খোদাকে আন্তরিক ধন্যবাদ দাও।

এদিকে বস এতক্ষণ কলম ঘোরানো বন্ধ রেখে, চোখ বুজে, মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে কবিতা শুনছিলেন। সলিমের কবিতা পাঠ বন্ধের প্রায় দশ সেকেন্ড পর তিনি মাথা তুলে বললেন, ‘তোমারে বলছিলাম প্রেমের কবিতা লিখতে। বলছিলাম, যাতে কবিতায় একটা রয়েল, রাজকীয় প্রেমের পিলিংস থাকে। পইড়া যেন মনে হয় উচ্চপদস্থ, সম্মানিত কোনো ব্যক্তির লেখা কবিতা। তুমি লিখা আনছ এই মেন্দামারা জিনিস। কি শব্দচয়নে, কি বাক্যগঠনে—এই ভুসিমালের মধ্যে কোনো রাজকীয় ভাব আছে? “কুঞ্জবনে গুঞ্জরনে, হাতে রাখি হাত, চলি আনমনে”—এইটা কি কবিতা না ছড়াগান? আবারও তুমি তোমার কবিতার মধ্যে কবরীরে টাইনা আনছ। কতবার বলছি তোমারে—জাস্ট লিভ হার। শি ইজ ওয়ে আউট অব ইয়োর লিগ। সব কবিতায় কবরীরে ঢুকাইয়ো না।’

‘কিন্তু বস,’ সলিম-উল্লাহ মিনমিন করে প্রতিবাদ জানায়, ‘কবিতাই তো গোপন ভালোবাসা প্রকাশের জায়গা।’

‘শাট আপ!’ বসের গর্জনে সলিম-উল্লাহ আর তুমি একসঙ্গে কেঁপে ওঠো। ‘কবিতার মা-বাপ ঠিক নাই, সে আসছে তার গোপন ভালোবাসার প্রকাশ নিয়া। কোনো ছন্দ নাই, অন্ত্যমিল নাই। স্বরবৃত্ত-মাত্রাবৃত্ত-অক্ষরবৃত্ত নাই। আরে, ছন্দ ছাড়া কবিতা হয়? বলো, মোকাম?’

বসের প্রশ্নের তীব্রতায় তুমি মাথা নাড়ানোর দিক গুবলেট করে ফেল। প্রথমে প্রবল বেগে ওপরে-নিচে এবং শীঘ্রই ভুল শুধরে নিয়ে ডানে-বামে মাথা নাড়তে থাকো।

‘আহা, কবিতা লিখতেন ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। পড়ো তো, মোকাম, ওনার মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা “পালকির গান” কবিতাটা।’

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা (বা ছড়াটা) আদৌ মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা কি না, এ নিয়ে তোমার কিছুটা কনফিউশন হয়। তুমি দেখো, বস তোমার অপেক্ষায় না থেকে নিজে নিজেই টেবিল চাপড়ে আবৃত্তি শুরু করে দিয়েছেন, ‘পালকি চলে পালকি চলে/ গগন তলে আগুন জ্বলে/ ঠিক দুপুরে ভরদুপুরে/ ছুটছে কারা পাগলপারা…’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

‘আহ, কী গভীর কবিতা, পড়লেই গায়ের লোম দাঁড়ায়ে যায়।’ বস স্বপ্নালু চোখে তাকিয়ে থাকেন দূরে।

এদিকে ক্রমাগত বসের ধ্যাতানি খেয়ে আর অপমান সহ্য করে সলিম-উল্লাহ মুষড়ে পড়েছে। তার হিক্কা উঠছে ক্রমাগত। এত জোরে যে কেউ হিক্কা দিতে পারে, তুমি আগে তা কখনো দেখোনি। সলিমের হিক্কার আওয়াজে শশব্যস্ত রফিক বাতাবিলেবুর গোড়ায় পানি ঢালা বন্ধ করে, লুতফর লাউ নিয়ে ছানাছানি বন্ধ করে, সাইফুল তার মৎস্যকন্যার সঙ্গে জলকেলি বাদ দেয়, ছোটন ঘানি ঘোরানো থামিয়ে সবাই একসঙ্গে ছুটে আসে তোমাদের টেবিলে। এসে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ক্রমাগত হেঁচকি তুলে চলা সলিম-উল্লাহর দিকে। ওর ততক্ষণে হেঁচকি তুলতে তুলতে খিঁচুনি ধরে যাওয়ার অবস্থা।

‘এই, থামো বলছি! স্টপ রাইট নাও!’ বস তার চারপাশে জমে যাওয়া সার্কাস দেখে অবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিতে চেষ্টা করেন। টেবিল চাপড়ে বাঘের মতো গর্জে ওঠেন সলিম-উল্লাহর দিকে তাকিয়ে। তার ধমকে কাজ হয়। চমকে উঠে সে হিক্কা তোলা থামিয়ে দেয় পুরোপুরি।

‘কবিতার নাম দিছ কী?’ একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বস প্রশ্ন করেন, আড়চোখে সলিমের দিকে তাকিয়ে।

‘ভোরেরো কইতর,’ প্রায় শোনা যায় না, এমন মিনমিনে কণ্ঠে উত্তর আসে।

নামটা শুনেই তোমার মনে হয়, এখন আরেক পশলা ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে যাবে সলিম-উল্লাহর ওপর দিয়ে। কিন্তু একদিনের বিবেচনায় অনেক বেশি ঝাড়াঝাড়ি অলরেডি হয়ে গিয়েছে—সম্ভবত এই বিবেচনায় বস আর গলা চড়ান না। বরং কিছুটা চিন্তাভাবনা করে বলেন, ‘প্রেমের কবিতার নাম “ভোরেরো কইতর” কেন হইতে যাবে? কী যে যন্ত্রণা তোমাদের নিয়া। এই পুনমারা কবিতা একজন রাষ্ট্রপতির নামে ছাপানো যায়? পত্রিকার লাইসেন্স বাতিল কইরা ছাড়বে শালা। আর কইতর মানে তো কবুতর পাখি। কবুতর কি কুহু কুহু কইরা ডাকে? কুহু কুহু কইরা ডাকে কোকিল, এইটাও জানো না? শালার কাদের নিয়া যে অফিস চালাই…’ বস বিরক্ত চেহারায় বনবন বনবন করে কলম ঘোরাতে থাকেন টেবিলের ওপর। একটু পর সলিম-উল্লাহকে কাঁঠালগাছের নিচেই ক্রস চিহ্ন দেওয়া একটা জায়গার দিকে ইশারা করে বললেন, ‘যাও, ওইখানে গিয়া দাঁড়াও।’

সলিম-উল্লাহ ঢোঁক গেলে কয়েকবার। তারপর মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়ায়, গুটি গুটি পায়ে হেঁটে গিয়ে চলে ওই ক্রস চিহ্ন আঁকা জায়গার দিকে। দাঁড়ানোমাত্র বস টেবিলের নিচে কোনো একটা সুইচে চাপ দেন। কে জানে, ধুপ করে একটা কাঁঠাল এসে পড়ে ভেঙে দুভাগ হয়ে যায় সলিম-উল্লাহর মাথায়। সে হাইমাই করে ডাক ছেড়ে কেঁদে ওঠে—‘ওরে কাকু…কাকু রে…’

তুমি দেখো যে উপর্যুপরি বিরক্তি প্রকাশের পরও বস ওর কবিতাটা ছিঁড়ে ফেলেননি অন্য সব কাগজের মতো, বরং ভাঁজ করে রেখে দিয়েছেন তার টেবিলের ড্রয়ারে। সম্ভবত এই কবিতাটা আগামীকাল তাদের পত্রিকার ফ্রন্ট পেজের ডান দিকে পুরো এক কলামজুড়ে ছাপা হবে মহাত্মনের নামে। এদিকে রফিক, লুতফর, সাইফুল, ছোটন এসে মাটিতে চিতপটাং হয়ে শুয়ে থাকা সলিম-উল্লাহকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যেতে আরম্ভ করলে সে তখনো চেঁচিয়ে কাঁদতে থাকে, ‘ওরে কাকু রে…আমারে ছাড়িয়া তুমি কই গেলা রে কাকু…তুমি থাকিলে আজ আমার এই দিন দেখা লাগে না রে কাকু…’

বস গলা চড়িয়ে প্রশ্ন করেন, ‘ও ওর কাকাকে ডাকছে কেন?’

ছোটন হাসি হাসি মুখে উত্তর দেয়, ‘বস, ওর কাকা মারা গেছে এই সেই দিন, মিছিলে। কাকার কাছে মানুষ হইছে তো ছোটবেলার থিকা, তাই লইতে পারে নাই এখনো খবরটা পুরাপুরি। সুযোগ পাইলেই কাকারে মনে কইরা চিক পাড়ে।’

‘ওহ,’ বস অস্ফুট একটা শব্দ করে টেবিলের ওপর ঘুরতে থাকা কলমটা তুলে নিয়ে পকেটে পুরে ফেলেন। ‘যাও, মোকাম, ওই জায়গায় গিয়া দাঁড়াইয়া এই পুরা জায়গাটার একটা ভালো কম্পোজিশন মনে মনে আঁকো।’ বস আঙুলের ইশারায় তোমাকে একটু আগে সলিম-উল্লাহর দাঁড়ানো সেই ক্রসচিহ্নিত জায়গাটা দেখিয়ে দেন। ‘নতুন অ্যাসাইনমেন্ট দিতেছি তোমারে। আজকের হাতের কাজ শেষ কইরা আমার এই এডিটরের কামরার ওপর একটা ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট লেইখা আনবা। যা কিছু এতক্ষণ দেখছ এই জায়গায়, প্রপস, প্রপার্টি, পাবলিক—সবকিছু মিলায়া একটা ইনভেস্টিগেটিভ ন্যারেটিভ রিপোর্ট। মনে করবা, একটা গোয়েন্দা উপন্যাসের প্রথম চ্যাপ্টার লিখতেছ। কী কী ক্রাইম হইতে পারে এই জায়গায়, খুব খুঁটায়া খুঁটায়া, ড্রামাটাইজ কইরা, একদম ডিটেইলসে লিখবা। পারবা না?’

তুমি হ্যাঁ-না কিছু না বলে বিরস বদনে বসের চিহ্নিত জায়গায় গিয়ে দাঁড়াও। বস আবারও চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘ইমাজিনেটিভ হবা। চিন্তাভাবনায় ক্রিয়েটিভিটি আনবা। সৃষ্টিশীল উপায়ে ভাববা প্রতিটা কেইস নিয়া। মনে রাখবা, ইমাজিনেশন ইজ পাওয়ার। ইমাজিনেশন ইজ দ্য স্ট্রঙ্গেস্ট টুল দ্যাট অ্যান ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট মে এভার হ্যাভ। লেখার মধ্যে একটা সেনসুয়াসনেস আনবা। ফিচার হবে সেক্সি। ছোট ছোট বাক্য, মাঝেমধ্যে কড়কদার শব্দ। লেখাটা পড়ার পর ভাষার সেক্সিনেসে মুগ্ধ মানুষ যেন বাধ্য হয় পত্রিকার শরীরে হাত বুলাইতে।’

তোমার বুঝতে সমস্যা হয় না যে বসের এসব আলাপ হচ্ছে শিশুকে ডাক্তারের ইনজেকশন দেওয়ার আগে বাতলানো ছেলেভোলানো কথাবার্তা। এখনই তোমার মাথায়ও কাঁঠাল ভাঙা হবে। তবে কাঁঠাল ভাঙার আগে বস যে তোমাকে এসব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন—এ কারণে তুমি মনে মনে বসের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করো। এতটুকু মানবিকতাই-বা আজকাল কয়জন দেখায়?

‘এই বাজে গন্ধটা কোত্থেকে আসছে? হু ফার্টেড? মোকাম, হ্যাভ ইউ জাস্ট ফার্টেড?’ বস তার টেবিলের নিচে তার সুইচ খুঁজতে খুঁজতে বিরক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করেন।

একটা কটু গন্ধ তোমার নাকে এসেও ধাক্কা দেয়। তবে তুমি নিশ্চিত জানো, তুমি বায়ু ত্যাগ করোনি। তবে কি সলিম-উল্লাহ? বসের বিরূপ আচরণের বিরুদ্ধে সে কি বায়ু ত্যাগ করে তার নীরব প্রতিবাদ জ্ঞাপন করল?

মুহূর্তের মধ্যেই তোমার মাথায় কাঁঠাল এসে পড়ে বটে, কিন্তু তার পতন হয় টুক করে। তুমি ব্যথা পাও না মোটেই। তোমার চোখ খুলে যায় সঙ্গে সঙ্গে। চলবে

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সমালোচকদের কড়া জবাব: নেইমারের জোড়া গোলে সান্তোসের প্রথম জয়

সরীসৃপতন্ত্র

আপডেট সময় : ০৬:০৩:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

***

টিলা থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে যাওয়ার পর আচমকা আলবাঁধানো পথটুকুও শেষ হয়ে যায়। সামনে জেগে ওঠে এক কিম্ভূতকিমাকার ব আকৃতির টুকরো জমি। দক্ষিণে তার বিশাল এক জলাশয়। বাকি তিন দিকে স্থল। সেই টুকরো জমিনে মানুষজন নানা কাজে ব্যস্ত। তুমি আবিষ্কার করো, ভিড়ের উজান ঠেলে তোমার পরিচিত কিছু মুখ একটা-দুটো করে ভেসে উঠছে। মুখগুলো তোমার পত্রিকা অফিসের সহকর্মীদের।

ওই যে বাতাবিলেবুর চারায় ঝাঁজরি দিয়ে পানি দিচ্ছে রফিক, পত্রিকা অফিসের জাঁদরেল দুজন স্টাফ রিপোর্টারের একজন। বাঁশের মাচায় লাউ চাষে ব্যস্ত অপর স্টাফ রিপোর্টার লুতফর। পেড়ে ফেলা লাউগুলোর একাংশ টুকরিতে তুলে রাখছে সে, অপেক্ষাকৃত কচিকাঁচাগুলোকে মাচার সঙ্গে জড়িয়ে ঝুলিয়ে দিচ্ছে যত্ন করে। একটু পরপর কাজ থামিয়ে দুজনেই নোটপ্যাডে নোট নিচ্ছে—খসখসাখসখস। আগামী দিনের রিপোর্ট হয়তো। সাল ১৯৮৭। বাতাবিলেবু আর লটকনের এ বছরে যে বাম্পার ফলন, তার ওপরে একটা রিপোর্ট তো এখন সময়ের দাবি। কিন্তু রিপোর্টটা ওদের দুজনের মধ্যে লিখবে কে? তোমার একবার ইচ্ছা হয় গলা উঁচিয়ে ওদের দুজনকে ডেকে সেটা জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু ওরা যে যার কাজে এত ব্যস্ত যে ডাক আর দিয়ে ওঠা হয় না তোমার। ওদের পাশ কাটিয়ে তুমি এগিয়ে যাও আরও সামনে।

খানিকটা দূরে, দক্ষিণ দিকে জলাশয়ের তীর ঘেঁষে দেখা মেলে আরেক এলাহি কারবারের। মাছ ধরার এক বিশাল জাল হাতে দাঁড়িয়ে সংস্কৃতি ও বিনোদন বিট কাভার করা সাইফুল। পানিতে জাল ফেলে যাকে আটকেছে সে, তাকে তো মৎস্যকন্যা ভিন্ন আর কিছু মনে হচ্ছে না। সাইফুলের দিকে তির্যক চোখে তাকিয়ে, অর্থপূর্ণ হাসি ছুড়ে দিয়ে সে মৎস্যকন্যা লেজ থপাস থপাস বাড়ি মারছে ডাঙায়। সঙ্গে সঙ্গে দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কোথা থেকে যেন ছুটে এসে সাদা রিফ্লেক্টর এনে ধরে মৎস্যকন্যার সামনে। সূর্যের আলো তাতে প্রতিবিম্বিত হয়ে মৎস্যকন্যার চেহারার চেকনাই বাড়িয়ে দেয়। সাইফুল হাতের জাল ছুড়ে ফেলে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে কন্যার কোমর, থুতনি, চিবুক স্পর্শ করে করে নানা আবেদনময়ী অঙ্গভঙ্গি শিখিয়ে দেয় একটু পরপর, আর কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরায় সে লাস্যময়ীর ছবি তোলে পটাস পটাস। সবকিছু দেখেশুনে তোমার ঠোঁটের কোণ চিরে হাসি ফুটে ওঠে। তুমি মাথা নাড়তে নাড়তে এগিয়ে চলো সামনে। অফিসে সাইফুলকে কেন সবাই বেশ হিংসার চোখে দেখে, তা তোমার কাছে আরও বোধগম্য হয়।

উত্তর পাশে দেখা মেলে বিজ্ঞাপন বিভাগের ছোটনের। ঘানিতে খুব পরিশ্রম করে শরিষা ভেঙে তেল বের করছে সে। রোদে ওর ঘর্মাক্ত চাঁদি চকচক করলেও তোমার খুব একটা মায়া হয় না। ঘানি ভাঙিয়ে বের করা তেলের প্রায় অর্ধেকটাই ও গোপনে বাসায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে প্রতিবার। ধরাও পড়ে যায় বসের চোখে মাঝেসাঝে। বসের ক্ষমাঘেন্নার জোরেই ছোটনের চাকরিটা বেঁচে আছে এখনো। বস বড়লোক ফ্যামিলির সন্তান, প্রতি মাসের শেষে একটা নির্দিষ্ট দিনে তার স্যালারি না গুনলেও চলে। কিন্তু পত্রিকা অফিসের যেসব কর্মচারীর মাসে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে বেতন হাতে পাওয়াটা খুবই জরুরি, তারা যারপরনাই খেপা ছোটনের ওপর। তবে ঘানিতে শরিষা ভেঙে তেল বের করার কাজে ওর কোনো জুড়ি নেই এবং কাজটা এতটা নিয়মিত, এতটা এফোর্ট দিয়ে করবার মতো আপাতত কেউ নেই বলে ছোটন যথারীতি বহাল রয়ে গেছে ওর পজিশনে। সবশেষে পিয়ন হাশেমেরও দেখা মেলে। শুধু শুধুই চক্রাকারে দৌড় পাড়ছে সে জায়গাটার পরিধি বরাবর।

বদ্বীপের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট মাঠ। বৃত্তাকার সে মাঠের মাঝবরাবর একটা কাঁঠালগাছ। গাছটার গুঁড়ি ঘেঁষে পাতা চেয়ার-টেবিলে বসা পত্রিকা অফিসের সম্পাদক, তোমার বস। তোমাকে দেখামাত্রই দূর থেকে হাত নাড়লেন তিনি। কাছে এগিয়ে গেলে হাতের ইশারায় বসতে বললেন তোমাকে উল্টো পাশে পেতে রাখা চেয়ারে।

‘ডিসিশন নিছি, তোমারে এর পর থেকে রিপোর্টিংয়ে পাঠাব।’

টেবিলের ওপর রাখা দিস্তা দিস্তা নিউজপ্রিন্ট কাগজ। তারই একটা দুহাতে ফরফর করে ছিঁড়তে ছিঁড়তে কথাটা বললেন তিনি। তার শীতল, অভিব্যক্তিহীন দৃষ্টি তোমার দিকে তাক করা। মানুষের নানা রকম মুদ্রাদোষ থাকে। একজনের মুদ্রাদোষের সঙ্গে অন্যজনেরটা সাধারণত মেলে না। তবে তোমার বসের মুদ্রাদোষটা একটু বেশিই ব্যতিক্রম। অফিসে যতক্ষণ তার ডেস্কে থাকেন, তার পুরোটা সময়ই তিনি ফরফরিয়ে কাগজ ছেঁড়েন। ছেঁড়ার মতো কাগজ হাতের কাছে না থাকলে অস্থির হয়ে পড়েন। তোমরা, অফিসের কর্মচারীরা সবাই মিলে একবার হিসাব করে বের করেছিলে, যে পরিমাণ কাগজ বস প্রতি মাসে ছিঁড়ে নষ্ট করেন, সে টাকায় একজন স্টাফ রিপোর্টারের এক মাসের বেতন হয়ে যায়। তবু তোমাদের বেতন নিয়মিত হয় না। এদিকে বসের টেবিলে ছিঁড়বার মতো পর্যাপ্ত কাগজের সাপ্লাই মাসজুড়ে মজুত থাকে।

টেবিলের ওপর মজুত কাগজের দিস্তা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘এখন অফিসে তোমার কী কাজ?’

‘মূলত প্রুফ দেখা, আর দরকার পড়লে টুকটাক ফিচার লেখা, বস।’

‘প্রুফট্রুফ বাদ দাও, তোমারে আমি প্রমোশন দিয়া ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট বানাব। তুমি মনে মনে নিজেরে রিপোর্টিংয়ের জন্য প্রস্তুত করো। প্রিপারেশন নিতে থাকো নিজের মতো কইরা।’ এই বলতে বলতে বস টেবিল থেকে কাগজের একটা দিস্তা তুলে একটানে ফরফর করে সেটা ছিঁড়ে দুটুকরো করে ফেলেন। তারপর দুই টুকরো থেকে চার টুকরো, চার টুকরো থেকে আট টুকরো, আট থেকে ষোলো—এরপর আরও কুটিকুটি করে ছিঁড়তে থাকেন।

‘সবাই জীবনে ইমপ্রুভমেন্ট চায়। তুমি চাও না?’

‘চাই, বস।’ তুমি তোমার সম্পাদকের তালে তাল মেলাও।

‘“ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম”—এই পুরা ফ্রেজটারে দুই ভাগে ভাগ করলে কী পাওয়া যায়?’

বসের প্রশ্ন শুনে তোমার মাথার এদিক-সেদিক চুলকানি আসে। তুমি মাথা চুলকাও। উত্তরটা তুমি তোমার মতো করে দিতে পারবে, তবে তুমি জানো যে বসের আসলে তোমার উত্তর শোনার আগ্রহ নেই। তিনি এ বিষয়ে তার নিজস্ব হাইপোথিসিস তোমাকে শোনাতে চান বলেই প্রশ্নটা করেছেন। কাজেই এ পরিস্থিতিতে তোমার যা করা নিরাপদ, তুমি তা-ই করো। চেহারা যথাসম্ভব ক্যাবলা ক্যাবলা বানিয়ে বসে থাকো।

‘প্রথম শব্দটা, অর্থাৎ “ইনভেস্টিগেটিভ”—এইটা হইল একটা অ্যাডজেকটিভ, বাংলায় যারে বলে বিশেষণ। আর দ্বিতীয় শব্দটা, যারে বিশেষায়িত করা হইসে, সেইটা হইল গিয়া একটা নাউন, অর্থাৎ বিশেষ্য “জার্নালিজম”। এখন জার্নালিজম, অর্থাৎ সাংবাদিকতা তো আমরা করিই। কতটুকু ঠিক হয় বা ভুল হয় বা আদৌ হয় কি না—সেইটা ভিন্ন আলাপ। কিন্তু পেশাগতভাবে আমরা সবাই সাংবাদিক। এখন এই যে আগের বিশেষণ বা অ্যাডজেকটিভ, এইটা একটা ডিফারেন্ট ক্যাটাগরি, সাংবাদিকতার একটা ভিন্ন শ্রেণি। জার্নালিজমের একটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। ফলো করতেছ আমার কথা?’

তুমি বসের প্রশ্নের উত্তরে জোরে জোরে মাথা নাড়ো। চেহারায়, হাবেভাবে দ্বিগুণ উৎসাহ ফুটিয়ে তোলো।

‘কথা হচ্ছে, সবাইরে দিয়া এই ইনভেস্টিগেশন ব্যাপারটা হয় না। একে তো এই কাজ একদম হাতে-কলমে শেখার জিনিস। আর এর তাড়নাটাও আসা লাগে একদম বুকের ভেতর থেকে,’ বস দুবার বুকের ওপর আঙুল ঠোকেন। ‘লাইক লিবিডো ইনস্টিঙ্কট। কোনো ফরমাল ট্রেইনআপ সম্ভব না। লাগানোর মতো ব্যাপার অনেকটা। যতই বন্ধুবান্ধবের কানকথা শুনো, চটি পড়ো কিংবা ভিডিও টিউটরিয়াল দেখো, নিজে থেইকা একটা মেয়ের গায়ে হাত রাখার আগপর্যন্ত তুমি কাজটা ঠিকঠাক করতে পারবা না।’

বস তার বুকপকেট থেকে পেটমোটা পাইলট জেল পেন বের করে টেবিলের ওপর রেখে ঘোরাতে থাকেন বনবন করে।

‘তবে তোমারে দিয়া হবে। দেখলেই বোঝা যায় যে তুমি ঘাগু মাল। ভেতরে ভেতরে পাইকা একদম ঝানু হইয়া আছ।’

বস টেবিলের এপাশ থেকে হাত বাড়িয়ে তোমার থুতনি ধরার চেষ্টা করে নাগাল পেতে ব্যর্থ হন। নিজের জায়গায়ই বসে থাকবে, না একটু ঝুঁকে গিয়ে থুতনি এগিয়ে দেবে—এ ব্যাপারে কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পেরে শেষমেশ তুমি সিটেই বসে থাকো চুপচাপ। তবে এই অভূতপূর্ব নতুন পরিচয় লাভে তুমি কিছুটা হকচকিতও বটে। আসলেই তুমি ঘাগু বান্দা, যেমনটা বললেন বস? ভেতরে-ভেতরে পেকে ঝানু হয়ে আছ? কবে থেকে? অবশ্য হতেও পারে, বস বলছেন যেহেতু। এই অফিসে বা দুনিয়ার সমস্ত অফিসে, বসেরা যা বলেন, সেটাই ঠিক।

‘গ্রামে মাছ ধরছ কখনো?’

বসের প্রশ্নে তোমার ডানে-বামে মাথা নাড়ানো লাগে। নিজের বাড়ি ছেড়ে গ্রামে যাওনি কখনো তুমি। মাছ ধরা তোমার কম্মও নয়।

‘ধুরু! মাছ ধরো নাই কখনো আর আসছ সাংবাদিকতা করতে।’ বসকে সত্যি সত্যি বিরক্ত লাগে। ‘গ্রামের পুকুরে বা খেতের আইলে মাছ ধরার চেয়ে আমাদের সাংবাদিকতার লাইনে মাছ ধরার কাজ খুব বেশি ভিন্ন না। তবে আমরা ট্যাঁটা, বড়শি দিয়া বা জাল পাইতা মাছ মারি না। আমাদের মাছ ধরতে হয় খালি হাতে, ছাই দিয়া।’ বস জিব বের করে সুড়ুত সুড়ুত করে লোল টানেন। ‘যারেই ধরবা, একদম ছাইচাপা দিয়া ক্যাঁক কইরা ধরবা। পার্টি তুড়ুক-বুরুক করবে, কিন্তু হাত ফসকায়া বাইরায়া যাইতে পারবে না। এইটা হইল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম ইন আ নাটশেল।’

ঠিক এমন সময় পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক সলিমুল্লাহ এসে দাঁড়ায় টেবিলের এক পাশে। বস টেবিলের ওপর কলম ঘোরাতে ঘোরাতেই প্রশ্ন করেন, ‘অ্যাসাইনমেন্ট যা দিছিলাম, শেষ করতে পারছ, সলিমুল্লা?’

সলিম উত্তর না দিয়ে বুকপকেট থেকে একটুকরো কাগজ বের করে রাখে সম্পাদকের টেবিলে। তারপর বলে, ‘বস, আমার নাম সলিম-উল্লাহ, সলিমুল্লা না। আলাদা আলাদা দুইটা সিলেবল। সলিম-উল্লাহ আলাদা আলাদা বলতে কষ্ট হলে খালি সলিম বললেও চলে।’

‘আই সি,’ বস ভ্রু কুঁচকে ফেলেন। ‘তো তোমার নামের যে শেষ সিলেবল, অর্থাৎ “উল্লাহ”, ওইটা কি আরবি হরফ “আইন” দিয়া, নাকি “হামজা” দিয়া, নাকি “আলিফ” দিয়া?’

‘জানি না বস।’ কিছুক্ষণ মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে থেকে সলিম-উল্লাহ জানায়।

জবাবে বস তার সামনে এনে রাখা কাগজ ঠেলে এগিয়ে দেন সলিমের দিকে। ‘ধরো। কী লিখছ, ছন্দ মেনটেইন কইরা জোরে জোরে আবৃত্তি কইরা শুনাও আমাদের। মোকামও আছে এইখানে। অয়ও শুনুক। মোকামরে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট বানানোর পরিকল্পনা আছে। তোমার কবিতা জাতের হইলে সাহিত্য পাতা থেকে প্রমোশন দিয়া তোমারে ক্রাইম রিপোর্টার বানাব।’

তুমি আবিষ্কার করো, সলিম শুকনো মুখে কাগজটা হাতে তুলে নিচ্ছে।

‘খুশি হইলা না লাগে?’ বস মুখ গম্ভীর করে বলেন। ‘সাহিত্য পাতায় থাইকা উপরি টুপাইস কামানোর সুযোগ আছে? সাহিত্য হইল অকম্মা ভাদাইম্মাদের কারবার। ক্রাইম রিপোর্টিংয়ে একবার ঢুকলে দেখবা, টুপাইস থেকে ফোর পাইস, ফোর পাইস থেকে সিক্সটিন পাইস—অ্যারিথমেটিক্যাল না, একদম জিওম্যাট্রিক প্রগ্রেশনে উন্নতি।’ বস সলিমের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ঘোষণা দিয়ে খোশমেজাজে ফেরত আসেন, ‘নাও, শুরু করো।’

সলিম দু-একবার গলাখাঁকারি দিয়ে শুরু করে আবৃত্তি:

‘ভোরের পাখিটির মতন

কে যেন আচানক ডাকিয়া ওঠে কুহু কুহু

সুদূরে যায় উড়ে মুদিয়া নয়ন

কাহার ছায়া ভাসে চৌক্ষে এমন

কাজলেরও রেখাটি যেমন

আবছা হলেও থেকে যায় চৌক্ষের পাতায়

স্মৃতির ঝাঁপি খুলি অপেক্ষায় থাকি তোমারি।

প্রভাতে-দিনান্তে-নিশিরাতে

মনের মাঝে আঁকা তোমার তসবির দেখি

প্রেমের তশতরিতে

ভাবি অবিরাম আমারে যে ব্যারাম দিয়াছ তুমি

ভালোবাসা-কুহেলিকা

তার হয় কি প্রতিদান?

তার চেয়ে ভালো এসো নিরজনে

কুঞ্জবনে গুঞ্জরনে

হাতে রাখি হাত, চলি আনমনে

যেতে যেতে বীথিকায় দেখি সহসা

তোমার আমার প্রেমের ফুল ফুটে আছে সাঁঝবেলায়

সে ফুল পরাব আমি তোমার কবরীতে

এই সে উপহার শুধু তোমারই জন্য।’

মনের গভীর থেকে উঠে আসা হাই চেপে বসে থাকতে তোমার যারপরনাই কষ্ট হচ্ছিল। এই পর্যন্ত পড়ে সলিম-উল্লাহ চুপ করলে তুমি মনে মনে খোদাকে আন্তরিক ধন্যবাদ দাও।

এদিকে বস এতক্ষণ কলম ঘোরানো বন্ধ রেখে, চোখ বুজে, মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে কবিতা শুনছিলেন। সলিমের কবিতা পাঠ বন্ধের প্রায় দশ সেকেন্ড পর তিনি মাথা তুলে বললেন, ‘তোমারে বলছিলাম প্রেমের কবিতা লিখতে। বলছিলাম, যাতে কবিতায় একটা রয়েল, রাজকীয় প্রেমের পিলিংস থাকে। পইড়া যেন মনে হয় উচ্চপদস্থ, সম্মানিত কোনো ব্যক্তির লেখা কবিতা। তুমি লিখা আনছ এই মেন্দামারা জিনিস। কি শব্দচয়নে, কি বাক্যগঠনে—এই ভুসিমালের মধ্যে কোনো রাজকীয় ভাব আছে? “কুঞ্জবনে গুঞ্জরনে, হাতে রাখি হাত, চলি আনমনে”—এইটা কি কবিতা না ছড়াগান? আবারও তুমি তোমার কবিতার মধ্যে কবরীরে টাইনা আনছ। কতবার বলছি তোমারে—জাস্ট লিভ হার। শি ইজ ওয়ে আউট অব ইয়োর লিগ। সব কবিতায় কবরীরে ঢুকাইয়ো না।’

‘কিন্তু বস,’ সলিম-উল্লাহ মিনমিন করে প্রতিবাদ জানায়, ‘কবিতাই তো গোপন ভালোবাসা প্রকাশের জায়গা।’

‘শাট আপ!’ বসের গর্জনে সলিম-উল্লাহ আর তুমি একসঙ্গে কেঁপে ওঠো। ‘কবিতার মা-বাপ ঠিক নাই, সে আসছে তার গোপন ভালোবাসার প্রকাশ নিয়া। কোনো ছন্দ নাই, অন্ত্যমিল নাই। স্বরবৃত্ত-মাত্রাবৃত্ত-অক্ষরবৃত্ত নাই। আরে, ছন্দ ছাড়া কবিতা হয়? বলো, মোকাম?’

বসের প্রশ্নের তীব্রতায় তুমি মাথা নাড়ানোর দিক গুবলেট করে ফেল। প্রথমে প্রবল বেগে ওপরে-নিচে এবং শীঘ্রই ভুল শুধরে নিয়ে ডানে-বামে মাথা নাড়তে থাকো।

‘আহা, কবিতা লিখতেন ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। পড়ো তো, মোকাম, ওনার মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা “পালকির গান” কবিতাটা।’

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা (বা ছড়াটা) আদৌ মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা কি না, এ নিয়ে তোমার কিছুটা কনফিউশন হয়। তুমি দেখো, বস তোমার অপেক্ষায় না থেকে নিজে নিজেই টেবিল চাপড়ে আবৃত্তি শুরু করে দিয়েছেন, ‘পালকি চলে পালকি চলে/ গগন তলে আগুন জ্বলে/ ঠিক দুপুরে ভরদুপুরে/ ছুটছে কারা পাগলপারা…’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

‘আহ, কী গভীর কবিতা, পড়লেই গায়ের লোম দাঁড়ায়ে যায়।’ বস স্বপ্নালু চোখে তাকিয়ে থাকেন দূরে।

এদিকে ক্রমাগত বসের ধ্যাতানি খেয়ে আর অপমান সহ্য করে সলিম-উল্লাহ মুষড়ে পড়েছে। তার হিক্কা উঠছে ক্রমাগত। এত জোরে যে কেউ হিক্কা দিতে পারে, তুমি আগে তা কখনো দেখোনি। সলিমের হিক্কার আওয়াজে শশব্যস্ত রফিক বাতাবিলেবুর গোড়ায় পানি ঢালা বন্ধ করে, লুতফর লাউ নিয়ে ছানাছানি বন্ধ করে, সাইফুল তার মৎস্যকন্যার সঙ্গে জলকেলি বাদ দেয়, ছোটন ঘানি ঘোরানো থামিয়ে সবাই একসঙ্গে ছুটে আসে তোমাদের টেবিলে। এসে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ক্রমাগত হেঁচকি তুলে চলা সলিম-উল্লাহর দিকে। ওর ততক্ষণে হেঁচকি তুলতে তুলতে খিঁচুনি ধরে যাওয়ার অবস্থা।

‘এই, থামো বলছি! স্টপ রাইট নাও!’ বস তার চারপাশে জমে যাওয়া সার্কাস দেখে অবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিতে চেষ্টা করেন। টেবিল চাপড়ে বাঘের মতো গর্জে ওঠেন সলিম-উল্লাহর দিকে তাকিয়ে। তার ধমকে কাজ হয়। চমকে উঠে সে হিক্কা তোলা থামিয়ে দেয় পুরোপুরি।

‘কবিতার নাম দিছ কী?’ একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বস প্রশ্ন করেন, আড়চোখে সলিমের দিকে তাকিয়ে।

‘ভোরেরো কইতর,’ প্রায় শোনা যায় না, এমন মিনমিনে কণ্ঠে উত্তর আসে।

নামটা শুনেই তোমার মনে হয়, এখন আরেক পশলা ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে যাবে সলিম-উল্লাহর ওপর দিয়ে। কিন্তু একদিনের বিবেচনায় অনেক বেশি ঝাড়াঝাড়ি অলরেডি হয়ে গিয়েছে—সম্ভবত এই বিবেচনায় বস আর গলা চড়ান না। বরং কিছুটা চিন্তাভাবনা করে বলেন, ‘প্রেমের কবিতার নাম “ভোরেরো কইতর” কেন হইতে যাবে? কী যে যন্ত্রণা তোমাদের নিয়া। এই পুনমারা কবিতা একজন রাষ্ট্রপতির নামে ছাপানো যায়? পত্রিকার লাইসেন্স বাতিল কইরা ছাড়বে শালা। আর কইতর মানে তো কবুতর পাখি। কবুতর কি কুহু কুহু কইরা ডাকে? কুহু কুহু কইরা ডাকে কোকিল, এইটাও জানো না? শালার কাদের নিয়া যে অফিস চালাই…’ বস বিরক্ত চেহারায় বনবন বনবন করে কলম ঘোরাতে থাকেন টেবিলের ওপর। একটু পর সলিম-উল্লাহকে কাঁঠালগাছের নিচেই ক্রস চিহ্ন দেওয়া একটা জায়গার দিকে ইশারা করে বললেন, ‘যাও, ওইখানে গিয়া দাঁড়াও।’

সলিম-উল্লাহ ঢোঁক গেলে কয়েকবার। তারপর মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়ায়, গুটি গুটি পায়ে হেঁটে গিয়ে চলে ওই ক্রস চিহ্ন আঁকা জায়গার দিকে। দাঁড়ানোমাত্র বস টেবিলের নিচে কোনো একটা সুইচে চাপ দেন। কে জানে, ধুপ করে একটা কাঁঠাল এসে পড়ে ভেঙে দুভাগ হয়ে যায় সলিম-উল্লাহর মাথায়। সে হাইমাই করে ডাক ছেড়ে কেঁদে ওঠে—‘ওরে কাকু…কাকু রে…’

তুমি দেখো যে উপর্যুপরি বিরক্তি প্রকাশের পরও বস ওর কবিতাটা ছিঁড়ে ফেলেননি অন্য সব কাগজের মতো, বরং ভাঁজ করে রেখে দিয়েছেন তার টেবিলের ড্রয়ারে। সম্ভবত এই কবিতাটা আগামীকাল তাদের পত্রিকার ফ্রন্ট পেজের ডান দিকে পুরো এক কলামজুড়ে ছাপা হবে মহাত্মনের নামে। এদিকে রফিক, লুতফর, সাইফুল, ছোটন এসে মাটিতে চিতপটাং হয়ে শুয়ে থাকা সলিম-উল্লাহকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যেতে আরম্ভ করলে সে তখনো চেঁচিয়ে কাঁদতে থাকে, ‘ওরে কাকু রে…আমারে ছাড়িয়া তুমি কই গেলা রে কাকু…তুমি থাকিলে আজ আমার এই দিন দেখা লাগে না রে কাকু…’

বস গলা চড়িয়ে প্রশ্ন করেন, ‘ও ওর কাকাকে ডাকছে কেন?’

ছোটন হাসি হাসি মুখে উত্তর দেয়, ‘বস, ওর কাকা মারা গেছে এই সেই দিন, মিছিলে। কাকার কাছে মানুষ হইছে তো ছোটবেলার থিকা, তাই লইতে পারে নাই এখনো খবরটা পুরাপুরি। সুযোগ পাইলেই কাকারে মনে কইরা চিক পাড়ে।’

‘ওহ,’ বস অস্ফুট একটা শব্দ করে টেবিলের ওপর ঘুরতে থাকা কলমটা তুলে নিয়ে পকেটে পুরে ফেলেন। ‘যাও, মোকাম, ওই জায়গায় গিয়া দাঁড়াইয়া এই পুরা জায়গাটার একটা ভালো কম্পোজিশন মনে মনে আঁকো।’ বস আঙুলের ইশারায় তোমাকে একটু আগে সলিম-উল্লাহর দাঁড়ানো সেই ক্রসচিহ্নিত জায়গাটা দেখিয়ে দেন। ‘নতুন অ্যাসাইনমেন্ট দিতেছি তোমারে। আজকের হাতের কাজ শেষ কইরা আমার এই এডিটরের কামরার ওপর একটা ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট লেইখা আনবা। যা কিছু এতক্ষণ দেখছ এই জায়গায়, প্রপস, প্রপার্টি, পাবলিক—সবকিছু মিলায়া একটা ইনভেস্টিগেটিভ ন্যারেটিভ রিপোর্ট। মনে করবা, একটা গোয়েন্দা উপন্যাসের প্রথম চ্যাপ্টার লিখতেছ। কী কী ক্রাইম হইতে পারে এই জায়গায়, খুব খুঁটায়া খুঁটায়া, ড্রামাটাইজ কইরা, একদম ডিটেইলসে লিখবা। পারবা না?’

তুমি হ্যাঁ-না কিছু না বলে বিরস বদনে বসের চিহ্নিত জায়গায় গিয়ে দাঁড়াও। বস আবারও চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘ইমাজিনেটিভ হবা। চিন্তাভাবনায় ক্রিয়েটিভিটি আনবা। সৃষ্টিশীল উপায়ে ভাববা প্রতিটা কেইস নিয়া। মনে রাখবা, ইমাজিনেশন ইজ পাওয়ার। ইমাজিনেশন ইজ দ্য স্ট্রঙ্গেস্ট টুল দ্যাট অ্যান ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট মে এভার হ্যাভ। লেখার মধ্যে একটা সেনসুয়াসনেস আনবা। ফিচার হবে সেক্সি। ছোট ছোট বাক্য, মাঝেমধ্যে কড়কদার শব্দ। লেখাটা পড়ার পর ভাষার সেক্সিনেসে মুগ্ধ মানুষ যেন বাধ্য হয় পত্রিকার শরীরে হাত বুলাইতে।’

তোমার বুঝতে সমস্যা হয় না যে বসের এসব আলাপ হচ্ছে শিশুকে ডাক্তারের ইনজেকশন দেওয়ার আগে বাতলানো ছেলেভোলানো কথাবার্তা। এখনই তোমার মাথায়ও কাঁঠাল ভাঙা হবে। তবে কাঁঠাল ভাঙার আগে বস যে তোমাকে এসব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন—এ কারণে তুমি মনে মনে বসের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করো। এতটুকু মানবিকতাই-বা আজকাল কয়জন দেখায়?

‘এই বাজে গন্ধটা কোত্থেকে আসছে? হু ফার্টেড? মোকাম, হ্যাভ ইউ জাস্ট ফার্টেড?’ বস তার টেবিলের নিচে তার সুইচ খুঁজতে খুঁজতে বিরক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করেন।

একটা কটু গন্ধ তোমার নাকে এসেও ধাক্কা দেয়। তবে তুমি নিশ্চিত জানো, তুমি বায়ু ত্যাগ করোনি। তবে কি সলিম-উল্লাহ? বসের বিরূপ আচরণের বিরুদ্ধে সে কি বায়ু ত্যাগ করে তার নীরব প্রতিবাদ জ্ঞাপন করল?

মুহূর্তের মধ্যেই তোমার মাথায় কাঁঠাল এসে পড়ে বটে, কিন্তু তার পতন হয় টুক করে। তুমি ব্যথা পাও না মোটেই। তোমার চোখ খুলে যায় সঙ্গে সঙ্গে। চলবে