ঢাকা ০৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬

মৃত্যু পরবর্তী জীবনেও কেন মানুষ স্মরণীয় থাকতে চায়?

মানুষ মৃত্যুর পরেও কী রেখে যেতে চায়? কেবলই সম্পদ, স্মৃতিচিহ্ন, নাকি নিজের অর্জিত মূল্যবোধ? মনোবিজ্ঞানী এবং গবেষকদের মতে, উত্তরাধিকার বা ‘লিগ্যাসি’ রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষের এক গভীর মানসিক চাহিদা। এটি মৃত্যুভয়, জীবনের অর্থ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ইচ্ছার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও-এর বোলিং গ্রিন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক বেথ হান্টার বলেছেন, মানুষ সচেতনভাবে বা অবচেতনভাবে সবসময়ই কিছু না কিছু উত্তরাধিকার রেখে যায়। তবে এই উত্তরাধিকার কেবল সম্পদ বা বিখ্যাত কোনো সৃষ্টিই নয়, এর মধ্যে মানুষের শরীর, মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা এবং প্রভাবও অন্তর্ভুক্ত।

গবেষকরা সাধারণত উত্তরাধিকারকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন: জৈবিক, বস্তুগত এবং মূল্যবোধভিত্তিক। জৈবিক উত্তরাধিকার সন্তান বা জিনগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে প্রবাহিত হতে পারে। অনেকে মৃত্যুর পর তাঁদের অঙ্গ বা পুরো দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণার জন্য দান করেন। যুক্তরাষ্ট্রে কোটি কোটি মানুষ অঙ্গদাতা হিসেবে নিবন্ধিত, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু অর্থবহ রেখে যাওয়ার একটি উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

ক্যান্সারজয়ী বা গুরুতর রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষ মনে করেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের মানুষকে সচেতন ও উপকৃত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের জীবন থেকে কিছু শিক্ষা বা প্রভাব রেখে যাওয়ার অনুভূতি মৃত্যুভয় কমাতে সহায়ক।

জীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা রোগীদের জন্য অনেক হাসপাতালে ‘লিগ্যাসি অ্যাক্টিভিটি’ চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডায়েরি লেখা, স্মৃতিচারণমূলক অ্যালবাম তৈরি, প্রিয়জনকে চিঠি লেখা বা নিজের মূল্যবোধ নিয়ে ‘নৈতিক উইল’ তৈরি করা। বিভিন্ন গবেষণায় এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, এই ধরনের কার্যক্রম হতাশা ও উদ্বেগ কমাতে এবং মৃত্যুকে সহজভাবে গ্রহণ করতে সাহায্য করে।

তবে গবেষকদের মতে, মানুষ সবচেয়ে বেশি যে উত্তরাধিকার রেখে যেতে চায়, তা হলো তার মূল্যবোধ। দয়া, সহানুভূতি, সততা অথবা অন্যের জন্য কাজ করার মতো বিশ্বাস ও জীবনদর্শনকেই অনেকে সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার হিসেবে গণ্য করেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী বয়স্ক ব্যক্তিরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জীবনসংগ্রামের গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে মানসিক শান্তি লাভ করেছেন বলে জানিয়েছেন।

উত্তরাধিকার নিয়ে আধুনিক গবেষণার সূত্রপাত মনোবিশ্লেষক এরিক এরিকসনের ‘জেনারেটিভিটি’ ধারণা থেকে। তাঁর মতে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে অবদান রাখতে চায়। পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে কাজ করার এই প্রবণতা মানুষের একটি মৌলিক প্রবৃত্তি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে পানামাকে উড়িয়ে দিল ব্রাজিল

মৃত্যু পরবর্তী জীবনেও কেন মানুষ স্মরণীয় থাকতে চায়?

আপডেট সময় : ০৭:৪৬:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

মানুষ মৃত্যুর পরেও কী রেখে যেতে চায়? কেবলই সম্পদ, স্মৃতিচিহ্ন, নাকি নিজের অর্জিত মূল্যবোধ? মনোবিজ্ঞানী এবং গবেষকদের মতে, উত্তরাধিকার বা ‘লিগ্যাসি’ রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষের এক গভীর মানসিক চাহিদা। এটি মৃত্যুভয়, জীবনের অর্থ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ইচ্ছার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও-এর বোলিং গ্রিন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক বেথ হান্টার বলেছেন, মানুষ সচেতনভাবে বা অবচেতনভাবে সবসময়ই কিছু না কিছু উত্তরাধিকার রেখে যায়। তবে এই উত্তরাধিকার কেবল সম্পদ বা বিখ্যাত কোনো সৃষ্টিই নয়, এর মধ্যে মানুষের শরীর, মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা এবং প্রভাবও অন্তর্ভুক্ত।

গবেষকরা সাধারণত উত্তরাধিকারকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন: জৈবিক, বস্তুগত এবং মূল্যবোধভিত্তিক। জৈবিক উত্তরাধিকার সন্তান বা জিনগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে প্রবাহিত হতে পারে। অনেকে মৃত্যুর পর তাঁদের অঙ্গ বা পুরো দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণার জন্য দান করেন। যুক্তরাষ্ট্রে কোটি কোটি মানুষ অঙ্গদাতা হিসেবে নিবন্ধিত, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু অর্থবহ রেখে যাওয়ার একটি উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

ক্যান্সারজয়ী বা গুরুতর রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষ মনে করেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের মানুষকে সচেতন ও উপকৃত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের জীবন থেকে কিছু শিক্ষা বা প্রভাব রেখে যাওয়ার অনুভূতি মৃত্যুভয় কমাতে সহায়ক।

জীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা রোগীদের জন্য অনেক হাসপাতালে ‘লিগ্যাসি অ্যাক্টিভিটি’ চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডায়েরি লেখা, স্মৃতিচারণমূলক অ্যালবাম তৈরি, প্রিয়জনকে চিঠি লেখা বা নিজের মূল্যবোধ নিয়ে ‘নৈতিক উইল’ তৈরি করা। বিভিন্ন গবেষণায় এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, এই ধরনের কার্যক্রম হতাশা ও উদ্বেগ কমাতে এবং মৃত্যুকে সহজভাবে গ্রহণ করতে সাহায্য করে।

তবে গবেষকদের মতে, মানুষ সবচেয়ে বেশি যে উত্তরাধিকার রেখে যেতে চায়, তা হলো তার মূল্যবোধ। দয়া, সহানুভূতি, সততা অথবা অন্যের জন্য কাজ করার মতো বিশ্বাস ও জীবনদর্শনকেই অনেকে সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার হিসেবে গণ্য করেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী বয়স্ক ব্যক্তিরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জীবনসংগ্রামের গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে মানসিক শান্তি লাভ করেছেন বলে জানিয়েছেন।

উত্তরাধিকার নিয়ে আধুনিক গবেষণার সূত্রপাত মনোবিশ্লেষক এরিক এরিকসনের ‘জেনারেটিভিটি’ ধারণা থেকে। তাঁর মতে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে অবদান রাখতে চায়। পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে কাজ করার এই প্রবণতা মানুষের একটি মৌলিক প্রবৃত্তি।