রাজধানীর মিরপুরে শাহ আলী বোগদাদী মাজারে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে যেখানে ধর্মীয় বিরোধের পাশাপাশি হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারের বিষয়গুলো মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
রাজধানীর মিরপুরে হযরত শাহ আলী বোগদাদী এর মাজারে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। এক পক্ষের দাবি মাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। অন্যদিকে অপর পক্ষের অভিযোগ মাদকবিরোধী অভিযানের আড়ালে মূলত মাজারকেন্দ্রিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিশাল অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্যই এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই ঘটনার পেছনে শুধু উগ্রবাদ বা মাদক নয় বরং মাজার কমিটির নিয়ন্ত্রণ চাঁদাবাজি ধর্মীয় মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে এই মাজারের রয়েছে হাজার কোটি টাকার বিশাল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ যা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের নজর কেড়েছে। মাজারের মোট জমির পরিমাণ বত্রিশ দশমিক এক চার একর বা সাতানব্বই দশমিক চার শূন্য বিঘা যার মধ্যে পঁচাত্তর বিঘা জমি ওয়াকফ করা সম্পত্তি হলেও বর্তমানে মাজারের দখলে রয়েছে মাত্র পাঁচ দশমিক সাত ছয় একর জমি এবং বাকি সম্পত্তিতে গড়ে ওঠা আড়ত ও দোকানপাটে চাঁদাবাজি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে মাজারগুলো কেবল ধর্মীয় স্থান নয় বরং এগুলো কালক্রমে সামাজিক সাংস্কৃতিক ও বিশাল অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শরীয়তপন্থিদের সাথে মাজারপন্থিদের মতভেদ দীর্ঘদিনের হলেও মাজার ঘিরে গড়ে ওঠা অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি অনেক সময় অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম এবং নগদ অর্থ লেনদেনের সুযোগ নিয়ে কিছু মাজার এলাকায় মাদক গ্রহণ ও কেনাবেচা নিয়মিত ঘটনায় রূপ নিয়েছে। ভাসমান মানুষ বা ভিক্ষুকদের আড়ালে মূলত বড় বড় মাদক সিন্ডিকেট এসব নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এর পাশাপাশি সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্রের গোপন আস্তানা অবৈধ অস্ত্র মজুত নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অলৌকিক চিকিৎসার নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মতো প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডেরও অভিযোগ রয়েছে। এতসব অভিযোগ ও হাজার কোটি টাকার ওয়াকফ সম্পত্তির তদারকিতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম থাকলেও রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষ বরাবরই চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে যা বর্তমান সংঘাতের ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করেছে।
মাজারসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনায় হামলাকারীদের ক্ষেত্রে তৌহিদী জনতা পরিচয় ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও বিশিষ্টজনরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব স উ ম আবদুস সামাদ জানান দুই হাজার চব্বিশ সালের পাঁচ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর কুমিল্লার লাকসামে প্রথম মাজার হামলার ঘটনা ঘটে এবং এরপর দেশজুড়ে তা অব্যাহত থাকে। তিনি প্রশ্ন তোলেন সরকার পরিবর্তনের মতো রাজনৈতিক ঘটনার পর কেন হঠাৎ ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা শুরু হবে এবং তার মতে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে তৌহিদী জনতা নাম ব্যবহার করে নিজেদের আড়াল করছে। ইসলামিক বুদ্ধিজীবী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান শাহসুফি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হান্নান আল হাদী জানান কোনো মাজারে ইসলামবিরোধী কাজ হলে তা বন্ধ করার দায়িত্ব প্রশাসনের কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। এদিকে শাহ আলী মাজারের ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন কেবল অভিযোগ অস্বীকার করাই যথেষ্ট নয় বরং ইসলামপন্থি দলগুলোকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সরকারকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সারাদেশে মাজারগুলোতে হামলার বিষয়ে পুলিশের পরিসংখ্যানেও বেশ উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দুই হাজার চব্বিশ সালের পাঁচ আগস্ট থেকে দুই হাজার ছাব্বিশ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট আটষট্টিটি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এখন পর্যন্ত সত্তর জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মাজারকেন্দ্রিক হুমকির বিষয়ে বিভিন্ন থানায় চল্লিশটি সাধারণ ডায়েরি ও সাতাশটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের দেওয়া হিসাবমতে তদন্ত শেষে ইতিমধ্যে নয়টি মামলায় আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে প্রমাণের অভাবে ছয়টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে এবং বাকি বারোটি মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে। রাজধানীর মিরপুরে শাহ আলী বোগদাদী মাজারে হামলার ঘটনায় শাহ আলী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জানান ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে ইতিমধ্যে তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে তাদের দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে হামলার প্রকৃত কারণ ও নেপথ্যের কারিগরদের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 

























