দীর্ঘ ছয় দশকের আলোচনার পর পদ্মা নদীতে ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প সম্প্রতি একনেক-এর অনুমোদন পেয়েছে এবং এটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বড় অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজবাড়ীর পাংশা ও পাবনার সুজানগরের সাতবাড়িয়ার মাঝামাঝি স্থানে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদী ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা, সুন্দরবনে লবণাক্ততা কমানো, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়ানো এবং প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার বলছে, এর মাধ্যমে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, খুলনা, যশোর, রাজশাহী, পাবনা ও বরিশাল অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে এবং ২৪টি জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ উপকৃত হবে।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে শুরু থেকেই তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ বলছেন, পদ্মা যেহেতু আন্তঃদেশীয় নদী, তাই ভারতের সঙ্গে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না করে এই প্রকল্পের সফলতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। খালেকুজ্জামান সতর্ক করে বলেছেন, “উজানের পানি ছাড়া পদ্মা ব্যারেজ একটি ধুধু বালুচর ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না।” তার মতে, ভারত যদি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না ছাড়ে, তাহলে ব্যারেজের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা কার্যত ব্যর্থ হবে। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বুয়েট-এর পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকলে পদ্মা ব্যারেজ বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা আরও আশঙ্কা করছেন, ব্যারেজের কারণে নদীতে পলি জমে উজানে বন্যা ও ভাটিতে নদীভাঙন বাড়তে পারে, পাশাপাশি আড়িয়াল খাঁসহ মধ্যাঞ্চলের নদীগুলোর প্রবাহ কমে লবণাক্ততা আরও ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন এবং বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্ক বলছে, প্রকল্পের সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট স্বচ্ছ আলোচনা হয়নি এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
অন্যদিকে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পানি সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের অবকাঠামো ছাড়া কার্যকর বিকল্প নেই। সিইজিআইএস-এর নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান মনে করেন, পদ্মা ব্যারেজ হলে গড়াই, মাথাভাঙ্গা ও হিসনা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ বাড়বে, সুন্দরবনের লবণাক্ততা কমবে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়বে। সরকারও বলছে, ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়া, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির সমস্যা সমাধানে পদ্মা ব্যারেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি শুধু প্রকৌশলগত নয়, কূটনৈতিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত জটিল। ফলে ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনা ছাড়া এত বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 

























