পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সোমবারের ওই বৈঠক থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাঁটাতার নির্মাণের জন্য ঝুলে থাকা জমি আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) হস্তান্তর করতে হবে।
রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। নির্বাচনের প্রচারের সময় মোদি-শাহ জুটি বারবার অভিযোগ করেছিলেন যে, পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই জমি হস্তান্তরে বাধা দিচ্ছে। দায়িত্ব নিয়েই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পূর্ববর্তী সরকারের তৈরি করা সব বাধা অপসারণ করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যানের চিত্র: কেন পিছিয়ে পশ্চিমবঙ্গ?
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমএইচএ) সংসদীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে প্রায় ১৪৯ কিলোমিটার এলাকায় জমি অধিগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। ভারতের মোট ২ হাজার ২১৬ কিমি সীমান্ত এলাকার মধ্যে ৫৬৯ কিলোমিটার এখনও কাঁটাতারবিহীন। এর মধ্যে প্রায় ৩৭৮ কিমি এলাকায় কাঁটাতার দেওয়া সম্ভব হলেও রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার কারণে অধিকাংশ জমিই নির্মাণ সংস্থাকে হস্তান্তর করা যায়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, আসাম বা ত্রিপুরার মতো রাজ্যে কাঁটাতারের কাজ দ্রুত এগোলেও পশ্চিমবঙ্গের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছিল অস্বাভাবিক।
অধিগ্রহণে বাধার কারণ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
সীমান্ত জেলাগুলোতে জমি অধিগ্রহণ কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং প্রশাসনিক ও মানিবক কারণেও জটিল ছিল। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার অত্যন্ত উর্বর কৃষিজমি হারানো নিয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। পাশাপাশি, নিয়ম অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে ১৫০ গজ ভেতরে কাঁটাতার নির্মাণের ফলে অনেক কৃষকের জমি ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে বিজেপি সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে ‘ভোটব্যাংক’ রক্ষায় অনুপ্রবেশকারীদের সুবিধা দিতেই পূর্ববর্তী সরকার জমি হস্তান্তরে বিলম্ব করেছিল। গত বছর লোকসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনিচ্ছাই সীমান্ত সুরক্ষিত না হওয়ার একমাত্র কারণ।
আইনি চাপ ও ভবিষ্যতের পথ
গত নভেম্বরে কলকাতা হাইকোর্ট জমি হস্তান্তর নিয়ে মমতা সরকারের কাছে কৈফিয়ত তলব করেছিল। কেন্দ্রীয় সরকার জমির টাকা দিয়ে দেওয়ার পরেও কেন অধিগ্রহণ হচ্ছে না—আদালতের সেই প্রশ্নের উত্তর এখন বর্তমান সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমেই মিলছে বলে মনে করা হচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারীর এই দ্রুত সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং কেন্দ্রের সাথে সুসম্পর্ক এবং অনুপ্রবেশ ইস্যুতে দেওয়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রক্ষারই একটি বড় পদক্ষেপ।
রিপোর্টারের নাম 























