মধ্যপ্রাচ্যে আকস্মিক যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠায় বাংলাদেশের অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি ভিত্তিতে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা) ঋণের প্রয়োজন। মূলত মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসের বাড়তি আমদানি ব্যয় মেটাতেই উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে এই বাজেট সহায়তা চাইছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের বহুমুখী আঘাত গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠনের মাত্র ১০ দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে বিশ্ব অর্থনীতি ওলটপালট হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ২৫০ শতাংশ, এলএনজি ১০০ শতাংশ এবং সারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে গত বছর এই সময়ে যেখানে জ্বালানি ও সার আমদানিতে ৩০১ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল, এবার তা বেড়ে ৫৫৮ কোটি ডলারে দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভের ওপর পড়ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে আইএমএফ-এর পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেলেও, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তা ২৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
ভর্তুকির চাপ ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির আশঙ্কা সরকারের অভ্যন্তরীণ বাজেটেও এই যুদ্ধের প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী জুন পর্যন্ত জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সার খাতে বাড়তি ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা ভর্তুকি লাগবে। বাজেটে এই খাতে ৫৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে মোট ভর্তুকির প্রয়োজন দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় একই ধরনের সংকটে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ শতাংশে পৌঁছেছিল। বর্তমান সরকার সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে চাইছে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি দামের বোঝা চাপাতে না হয় এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক তৎপরতা সংকট মোকাবিলায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বসন্তকালীন সভায় যোগ দিয়েছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইএমএফ-এর কাছে বাড়তি ঋণ সহায়তার আবেদন জানানো হবে। এই ঋণ মূলত তিনটি কাজ করবে:
- দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত রক্ষা করে খাদ্য ও জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করা।
- নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
- স্থানীয় বাজারে জ্বালানি ও সারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো।
ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ছাড়াও এডিবি এবং এআইআইবি-র সঙ্গেও ঋণের বিষয়ে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। তবে সংস্কারের শর্ত এবং জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের বিষয়ে উন্নয়ন-সহযোগীদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সার্বিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা যদিও ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে, কিন্তু বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ এখনো খোলেনি। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হলেও যুদ্ধের কারণে অবকাঠামোর যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তাতে জ্বালানির দাম দ্রুত আগের অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এমন এক প্রতিকূল সময়ে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ১১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নতুন করে এই ঋণের সংস্থান করা এবং ভর্তুকির পাহাড় সামাল দেওয়া সরকারের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 






















