আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠোর শর্ত ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। গত শুক্রবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় এই বাজেটের সামগ্রিক কাঠামো ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রণীত এই বাজেটে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি, যা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে বিশাল রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা। আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হতে পারে, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একাই প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব নিতে হবে। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব আদায়কে জিডিপির ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার চাপ থাকায় এনবিআরকে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হচ্ছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল ছাড়া এনবিআর কখনোই কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে পূরণ করতে পারেনি। চলতি অর্থবছরেও ৪ লাখ কোটি টাকা আদায় নিয়ে যেখানে সংশয় রয়েছে, সেখানে এমন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা এনবিআরের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এই বিশাল ব্যয়ের সংস্থান করতে গিয়ে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি বেশ জটিল। বর্তমান বাজারে মূল্যস্ফীতির হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি থাকায় এবং বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা বিরাজ করায় এই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
সব মিলিয়ে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যেই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে অর্থ বিভাগ। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বরাদ্দের অপ্রতুলতা দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদিও কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলে কাঠামো চূড়ান্ত হয়েছে, তবে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার জনস্বার্থে বাজেটের বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে পারে। বর্তমানে আইএমএফের শর্ত পূরণ এবং অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সমন্বয় করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বড় বাজেট তৈরির কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। কোনো বিকল্প না থাকায় এনবিআরকে এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সামনে এগোতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 























