ঢাকা ০৯:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

জনগণের নৈতিক পুনর্গঠন: উত্তরণের রূপরেখা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:০৭:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

রাষ্ট্র কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানা বা রাজনৈতিক কাঠামো নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর নৈতিক সত্তা। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার জনগণের নৈতিক চরিত্র, মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর, কেবল সামরিক সক্ষমতা, আকাশচুম্বী দালান বা জিডিপি-নির্ভর অর্থনৈতিক সামর্থ্যে নয়। বাংলাদেশের বর্তমান বহুমাত্রিক সংকট ও বাস্তবতা অনুধাবনের জন্য সমাজের দর্পণে জনগণের জনচরিত্র, তার ঐতিহাসিক বিবর্তন, সাম্প্রতিক দশকের অবক্ষয় এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত সম্ভাব্য পুনর্জাগরণের দিকে দৃষ্টি ফেরানো জরুরি।

চতুর্দশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তার ‘আল মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের উত্থান ও টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে জনগণের অভ্যন্তরীণ সংহতি, যাকে তিনি ‘আসাবিয়্যা’ বা সামাজিক সংহতি বলেছেন। এই আসাবিয়্যা কেবল যান্ত্রিক ঐক্য নয়, এটি এক গভীর নৈতিক ও সামাজিক শক্তি যা জনসমষ্টিকে নিঃস্বার্থভাবে ঐক্যবদ্ধ করে, সামষ্টিক কল্যাণে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত অখণ্ডতা টিকিয়ে রাখে। যখন শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি, বিলাসিতা এবং অবিচারের কারণে সমাজের এই নৈতিক সংহতি দুর্বল হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের বাহ্যিক কাঠামো যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন, তা ভেতর থেকে অসার হয়ে পড়ে এবং অনিবার্য পতনের দিকে ধাবিত হয়।

বাংলাদেশের জনচরিত্র কোনো আকস্মিক শূন্যতা থেকে উদ্ভূত নয়; এটি দীর্ঘ ইতিহাসের এক ধারাবাহিক ও জটিল বিবর্তনের ফসল। বদ্বীপের বহমান নদী, পলিময় প্রকৃতি, কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি, শতবর্ষের বঞ্চনাময় ঔপনিবেশিক শাসন, বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ—এসবের সম্মিলিত ও গভীর প্রভাব এ দেশের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক মানস গঠন করেছে। বাঙালি একদিকে যেমন চরম আবেগপ্রবণ, পরোপকারী, সহানুভূতিশীল ও গভীর সংস্কৃতিমনা, অন্যদিকে সে আত্মকেন্দ্রিক, বিভাজিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে স্বল্পমেয়াদি চিন্তায় অভ্যস্ত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অধ্যাদেশ ও সংস্কার ইস্যুতে সরকারের ইউ-টার্ন

জনগণের নৈতিক পুনর্গঠন: উত্তরণের রূপরেখা

আপডেট সময় : ০৩:০৭:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

রাষ্ট্র কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানা বা রাজনৈতিক কাঠামো নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর নৈতিক সত্তা। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার জনগণের নৈতিক চরিত্র, মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর, কেবল সামরিক সক্ষমতা, আকাশচুম্বী দালান বা জিডিপি-নির্ভর অর্থনৈতিক সামর্থ্যে নয়। বাংলাদেশের বর্তমান বহুমাত্রিক সংকট ও বাস্তবতা অনুধাবনের জন্য সমাজের দর্পণে জনগণের জনচরিত্র, তার ঐতিহাসিক বিবর্তন, সাম্প্রতিক দশকের অবক্ষয় এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত সম্ভাব্য পুনর্জাগরণের দিকে দৃষ্টি ফেরানো জরুরি।

চতুর্দশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তার ‘আল মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের উত্থান ও টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে জনগণের অভ্যন্তরীণ সংহতি, যাকে তিনি ‘আসাবিয়্যা’ বা সামাজিক সংহতি বলেছেন। এই আসাবিয়্যা কেবল যান্ত্রিক ঐক্য নয়, এটি এক গভীর নৈতিক ও সামাজিক শক্তি যা জনসমষ্টিকে নিঃস্বার্থভাবে ঐক্যবদ্ধ করে, সামষ্টিক কল্যাণে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত অখণ্ডতা টিকিয়ে রাখে। যখন শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি, বিলাসিতা এবং অবিচারের কারণে সমাজের এই নৈতিক সংহতি দুর্বল হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের বাহ্যিক কাঠামো যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন, তা ভেতর থেকে অসার হয়ে পড়ে এবং অনিবার্য পতনের দিকে ধাবিত হয়।

বাংলাদেশের জনচরিত্র কোনো আকস্মিক শূন্যতা থেকে উদ্ভূত নয়; এটি দীর্ঘ ইতিহাসের এক ধারাবাহিক ও জটিল বিবর্তনের ফসল। বদ্বীপের বহমান নদী, পলিময় প্রকৃতি, কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি, শতবর্ষের বঞ্চনাময় ঔপনিবেশিক শাসন, বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ—এসবের সম্মিলিত ও গভীর প্রভাব এ দেশের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক মানস গঠন করেছে। বাঙালি একদিকে যেমন চরম আবেগপ্রবণ, পরোপকারী, সহানুভূতিশীল ও গভীর সংস্কৃতিমনা, অন্যদিকে সে আত্মকেন্দ্রিক, বিভাজিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে স্বল্পমেয়াদি চিন্তায় অভ্যস্ত।