সোনালী ভবিষ্যতের আশায় সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পা রাখা বাংলাদেশি তরুণদের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুঝুঁকি। যুক্তরাজ্যের বর্তমান শরণার্থী বা অ্যাসাইলাম ব্যবস্থার গভীর সংকটে পড়ে একের পর এক প্রাণ ঝরছে বাংলাদেশি ও সুদানি তরুণদের। সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ব্রিটিশ সরকারের তথাকথিত নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা অবস্থায় তরুণ আশ্রয়প্রার্থীদের স্বাস্থ্যজনিত জটিলতা ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পদ্ধতিগত অবহেলা এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া স্বপ্নবাজ তরুণেরা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের সরাসরি তদারকিতে থাকা অবস্থায় অন্তত ৫৪ জন তরুণ আশ্রয়প্রার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। যদিও শুরুর দিকে আফগানিস্তান বা এরিট্রিয়ার তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা ছিল, তবে বর্তমান চিত্র বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। এখন বাংলাদেশি ও সুদানি তরুণদের মধ্যে চিকিৎসাজনিত অবহেলা এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে যা মানবাধিকার কর্মীদের মতে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং ব্রিটিশ শরণার্থী ব্যবস্থার এক পদ্ধতিগত ব্যর্থতা।
দীর্ঘ ও বিপজ্জনক যাত্রাপথ পাড়ি দিয়ে যারা ব্রিটেনে পৌঁছান তারা এমনিতেই শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত থাকেন। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর ভাষাগত সমস্যা এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে তারা সঠিক চিকিৎসা পান না যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিচ্ছে। মানবিক এই সংকটের সমান্তরালে ব্রিটিশ আদালতগুলো অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কঠোর হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই বাসিলডন ক্রাউন কোর্টের এক রায়ে জনৈক বিদেশি নাগরিককে পুনরায় অবৈধ প্রবেশের দায়ে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার এখন আশ্রয়ের চেয়ে বিতাড়ন বা ডিপোর্টেশন নীতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যা অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশিদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলছে। ‘দাড়ো ইয়ুথ প্রোজেক্ট’ নামক একটি সংস্থা জানিয়েছে যে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা হোম অফিস আশ্রয়প্রার্থীদের মৃত্যুর তথ্য গোপন করার চেষ্টা করছে এবং তথ্য কমিশনারের আইনি নোটিশের বিরুদ্ধেও তারা আপিল করেছে যা মূলত স্বচ্ছতার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।
লন্ডনের চ্যান্সেরি সলিসিটরসের কর্ণধার ব্যারিস্টার মো. ইকবাল হোসেন এই করুণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে ২০২৪ সালটি ছিল তরুণ আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বছরগুলোর একটি। ২০২৬ সালের শুরুতেও এই মৃত্যুর মিছিল থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মানবাধিকার কর্মীরা এখন জাতীয় পর্যায়ে সুরক্ষা প্রোটোকল পর্যালোচনার দাবি তুলেছেন যাতে প্রতিটি মৃত্যুর সঠিক তদন্ত ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়। তাঁদের মতে কোনো আশ্রয়প্রার্থীর মৃত্যু হলে স্থানীয় কাউন্সিলগুলোকে দ্রুত কেন্দ্রীয় সরকারকে জানাতে হবে। স্বপ্নের দেশে ঠাঁই খুঁজতে গিয়ে কেন বাংলাদেশি তরুণদের নিথর দেহ কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরছে সেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সময় এখন এসেছে।
রিপোর্টারের নাম 

























