ঢাকা ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

শহর ও গ্রামের শিক্ষা বৈষম্য: একই দেশে দুই ভিন্ন বাস্তবতার দুই শিক্ষার্থী

কুড়িগ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রামের নবম শ্রেণির ছাত্র রাকিবের স্কুলে কোনো বিজ্ঞানাগার নেই, লাইব্রেরি বলতে কিছু পুরোনো বই। বর্ষাকালে কাদা-পানি মাড়িয়ে স্কুলে যাওয়া এবং শিক্ষক স্বল্পতার কারণে ক্লাস না হওয়া তার নিত্যদিনের সঙ্গী। অন্যদিকে, ঢাকার স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্র আরিয়ানের জগত সম্পূর্ণ ভিন্ন; যেখানে রয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম, আধুনিক ল্যাব এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক। রাকিব ও আরিয়ানের এই জীবনচিত্র কেবল সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য নয়, বরং এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক গভীর ও কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন। স্বাধীনতার পর থেকে সাক্ষরতার হার বাড়লেও, শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানের এই ক্রমবর্ধমান ব্যবধান এখন জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।

অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও মানসম্মত শিক্ষকের অভাব এই বৈষম্যকে আরও জটিল করে তুলছে। শহরের স্কুলগুলোতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা কাজ করতে আগ্রহী হলেও গ্রামীণ এলাকায় যাতায়াত সমস্যা ও পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাবে শিক্ষক সংকট প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককেই একাধিক বিষয় পড়াতে হয়, যা শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত বৈষম্য বা ‘ডিজিটাল বিভাজন’ এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শহরের শিক্ষার্থীরা যখন ইন্টারনেট ও এআই-ভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বাড়াচ্ছে, গ্রামের শিক্ষার্থীরা তখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও স্মার্টফোন সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। করোনাকালে এই চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, যা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতাও এই ব্যবধান বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ। গ্রামীণ পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পড়ালেখা ছেড়ে শ্রমে যুক্ত হচ্ছে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ড. হারুন রশীদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সহজলভ্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি। একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে যখন তার প্রতিটি শিশু সমান সুযোগ পায়। এই বৈষম্য দূর করা না গেলে ভবিষ্যতে একটি বিভক্ত সমাজ গড়ে উঠবে, যা জাতীয় উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। তাই সমতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখনই সময় বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

অধ্যাদেশ ও সংস্কার ইস্যুতে সরকারের ইউ-টার্ন

শহর ও গ্রামের শিক্ষা বৈষম্য: একই দেশে দুই ভিন্ন বাস্তবতার দুই শিক্ষার্থী

আপডেট সময় : ০১:১১:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

কুড়িগ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রামের নবম শ্রেণির ছাত্র রাকিবের স্কুলে কোনো বিজ্ঞানাগার নেই, লাইব্রেরি বলতে কিছু পুরোনো বই। বর্ষাকালে কাদা-পানি মাড়িয়ে স্কুলে যাওয়া এবং শিক্ষক স্বল্পতার কারণে ক্লাস না হওয়া তার নিত্যদিনের সঙ্গী। অন্যদিকে, ঢাকার স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্র আরিয়ানের জগত সম্পূর্ণ ভিন্ন; যেখানে রয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম, আধুনিক ল্যাব এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক। রাকিব ও আরিয়ানের এই জীবনচিত্র কেবল সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য নয়, বরং এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক গভীর ও কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন। স্বাধীনতার পর থেকে সাক্ষরতার হার বাড়লেও, শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানের এই ক্রমবর্ধমান ব্যবধান এখন জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।

অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও মানসম্মত শিক্ষকের অভাব এই বৈষম্যকে আরও জটিল করে তুলছে। শহরের স্কুলগুলোতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা কাজ করতে আগ্রহী হলেও গ্রামীণ এলাকায় যাতায়াত সমস্যা ও পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাবে শিক্ষক সংকট প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককেই একাধিক বিষয় পড়াতে হয়, যা শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত বৈষম্য বা ‘ডিজিটাল বিভাজন’ এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শহরের শিক্ষার্থীরা যখন ইন্টারনেট ও এআই-ভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বাড়াচ্ছে, গ্রামের শিক্ষার্থীরা তখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও স্মার্টফোন সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। করোনাকালে এই চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, যা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতাও এই ব্যবধান বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ। গ্রামীণ পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পড়ালেখা ছেড়ে শ্রমে যুক্ত হচ্ছে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ড. হারুন রশীদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সহজলভ্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি। একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে যখন তার প্রতিটি শিশু সমান সুযোগ পায়। এই বৈষম্য দূর করা না গেলে ভবিষ্যতে একটি বিভক্ত সমাজ গড়ে উঠবে, যা জাতীয় উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। তাই সমতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখনই সময় বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।