ঢাকা ০৬:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

পুলিশের ‘চাঁদাবাজদের তালিকা’ ও অপরাধ দমন: স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার বড় পরীক্ষা

সারাদেশে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও অপরাধ দমনে পুলিশের তৈরি করা ‘চাঁদাবাজদের তালিকা’ জনমনে আশার পাশাপাশি নতুন বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে জনঅসন্তোষের মুখে পুলিশ এই তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিলেও এর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা। পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মোট ৩ হাজার ৮৪৯ জন চাঁদাবাজের একটি অভ্যন্তরীণ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধুমাত্র ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই রয়েছে ১ হাজার ২৫৪ জন। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই তালিকাভুক্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে। পরিবহন, ফুটপাত, বাজার ও নির্মাণখাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলোতে সক্রিয় এই চক্রগুলোকে শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই কাজ করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর বসিলা এলাকা থেকে ‘কালা ফারুক’ নামক এক দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তারের পর তার অপরাধের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে চাঁদাবাজি দমনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক মনে করেন, বাংলাদেশে চাঁদাবাজির প্রধান ঢাল হলো রাজনৈতিক পরিচয়। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, সরকারের ইতিবাচক সদিচ্ছা থাকলেও তার বাস্তব রূপায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সমানভাবে আইন প্রয়োগ না করলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে না। অতীতের ‘লোক দেখানো’ অভিযানের পুনরাবৃত্তি হলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সুরে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন জানিয়েছেন যে, অতীতে পুলিশ সদস্যদেরও অনেক সময় এসব চক্রের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। তাই এই তালিকা যদি জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো চাপ বা দ্বিধা ছাড়াই কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

অন্যদিকে, পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই ইস্যুতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, তালিকা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সরকার চাঁদাবাজিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং অপরাধী যেই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির সম্প্রতি এক কঠোর বার্তায় বলেছেন যে, দল-মত নির্বিশেষে সকল সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, রাজনৈতিক পরিচয়ে বলীয়ান এই বিশাল তালিকার বিরুদ্ধে পুলিশ কতটা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, কারণ এর ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতি ও জননিরাপত্তা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুঝুঁকি ও লিবিয়ার ‘গেম ঘরে’ বন্দি বাংলাদেশিরা

পুলিশের ‘চাঁদাবাজদের তালিকা’ ও অপরাধ দমন: স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার বড় পরীক্ষা

আপডেট সময় : ১১:৪৪:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬

সারাদেশে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও অপরাধ দমনে পুলিশের তৈরি করা ‘চাঁদাবাজদের তালিকা’ জনমনে আশার পাশাপাশি নতুন বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে জনঅসন্তোষের মুখে পুলিশ এই তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিলেও এর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা। পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মোট ৩ হাজার ৮৪৯ জন চাঁদাবাজের একটি অভ্যন্তরীণ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধুমাত্র ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই রয়েছে ১ হাজার ২৫৪ জন। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই তালিকাভুক্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে। পরিবহন, ফুটপাত, বাজার ও নির্মাণখাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলোতে সক্রিয় এই চক্রগুলোকে শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই কাজ করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর বসিলা এলাকা থেকে ‘কালা ফারুক’ নামক এক দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তারের পর তার অপরাধের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে চাঁদাবাজি দমনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক মনে করেন, বাংলাদেশে চাঁদাবাজির প্রধান ঢাল হলো রাজনৈতিক পরিচয়। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, সরকারের ইতিবাচক সদিচ্ছা থাকলেও তার বাস্তব রূপায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সমানভাবে আইন প্রয়োগ না করলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে না। অতীতের ‘লোক দেখানো’ অভিযানের পুনরাবৃত্তি হলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সুরে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন জানিয়েছেন যে, অতীতে পুলিশ সদস্যদেরও অনেক সময় এসব চক্রের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। তাই এই তালিকা যদি জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো চাপ বা দ্বিধা ছাড়াই কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

অন্যদিকে, পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই ইস্যুতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, তালিকা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সরকার চাঁদাবাজিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং অপরাধী যেই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির সম্প্রতি এক কঠোর বার্তায় বলেছেন যে, দল-মত নির্বিশেষে সকল সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, রাজনৈতিক পরিচয়ে বলীয়ান এই বিশাল তালিকার বিরুদ্ধে পুলিশ কতটা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, কারণ এর ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতি ও জননিরাপত্তা।