বাংলাদেশে নতুন বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের দেড় মাস পার হতে চললেও ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে দেশের পররাষ্ট্রনীতি। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের ভারতঘেঁষা নীতি এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তৈরি হওয়া উষ্ণ সম্পর্কের পর, বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কোন দিকে ঝুঁকছে—তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সংকট ও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর ঐ অঞ্চল সফর করছেন, অন্যদিকে আগামী সপ্তাহে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের কথা রয়েছে। এর মধ্যেই মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. পল কাপুরের ঢাকা সফর এবং ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের দ্বিমুখী বিবৃতি সরকারের ভবিষ্যৎ নীতির গতিপথ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশকেন্দ্রিক নয়, বরং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা দেশের মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নির্ধারিত হবে। তিনি জানান, ভারত, চীন বা যুক্তরাষ্ট্র—কারও নাখোশ হওয়া বড় বিষয় নয়, বরং দেশের মানুষ যাতে ভালো থাকে সেটিই সরকারের অগ্রাধিকার। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভারসাম্য রক্ষা করা চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে প্রথমে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলার নিন্দা জানানো এবং পরে আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করলেও, ঢাকাস্থ ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি স্পষ্ট করেছেন যে তাদের প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল। এছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠিতে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের কথা উল্লেখ থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে চীনের বিনিয়োগ বা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, ‘তিস্তা প্রকল্প’ হবে বর্তমান সরকারের জন্য চীন-ভারত সম্পর্কের ‘লিটমাস টেস্ট’। বছরের পর বছর ঝুলে থাকা এই প্রকল্পে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং চীনের বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে সামঞ্জস্য আনা সহজ হবে না। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর সতর্ক করে বলেছেন, অতীতে কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ার মাশুল বাংলাদেশকে দিতে হয়েছে, যার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। বাংলাদেশের ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজার ইউরোপ-আমেরিকায় থাকলেও এর কাঁচামাল আসে চীন ও ভারত থেকে, ফলে এই ‘চেইন’ বা শৃঙ্খলা ভেঙে কোনো এক পক্ষকে বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রভাবশালী দেশগুলোর পাল্টাপাল্টি চাপ সামলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করাই তারেক রহমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 





















