মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি আঘাত আসতে শুরু করেছে বাংলাদেশের রফতানি খাতে। রফতানি আদেশ কমে যাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাসের ফলে দেশের রফতানিমুখী শিল্প এখন এক বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। রফতানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং শিপিং রুটের নিরাপত্তা ঝুঁকি ক্রেতা দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ফলে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকসহ চামড়া ও কৃষিপণ্যের নতুন অর্ডার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আগের অর্ডারগুলোও স্থগিত করা হচ্ছে। বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানিয়েছেন যে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে তৈরি পোশাক খাতে পড়তে শুরু করেছে এবং বিদেশি ক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি অবলম্বন করছেন। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো অর্ডার বাতিল হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই, তবে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পণ্য উৎপাদনের খরচ ও শিপিং ব্যয় বৃদ্ধির ফলে এই খাত বড় ধরনের ধসের মুখে পড়তে পারে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে পচনশীল কৃষিপণ্য রফতানি খাতে। বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসূর জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সংকটের কারণে বর্তমানে শাকসবজি ও ফল রফতানি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট হাবগুলো যেমন দুবাই বা দোহা হয়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পণ্য পাঠানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে রফতানি কার্যক্রম প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। কৃষিপণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান লী এন্টারপ্রাইজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগে যেখানে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ কন্টেইনার পণ্য রফতানি হতো, এখন পুরো সপ্তাহে মাত্র ৩ থেকে ৫ কন্টেইনার পাঠানো যাচ্ছে।
এর ওপর এয়ার ফ্রেইট বা বিমান ভাড়া কেজিতে ২৫০-৩০০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৬০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই চিত্র চামড়া শিল্পেও; বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে নতুন রফতানি আদেশ প্রায় আসছে না এবং চীন থেকে আমদানিকৃত রাসায়নিকের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, পরিবহন সময় বা লিড টাইম বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সহজেই বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন, যা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বয়ে আনবে।
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের পণ্য রফতানি টানা সপ্তম মাসের মতো নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ কমে ৩৫০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মোট রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ১৯১ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩.১৫ শতাংশ কম। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট ও হোম টেক্সটাইলসহ প্রায় প্রতিটি প্রধান খাতেই নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
রফতানি আয় কমার বিপরীতে আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকায় পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারে, যা গত বছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ কেবল আঞ্চলিক সংকট নয়, এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় আঘাত। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে রফতানি বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো না গেলে এবং বিকল্প শিপিং রুট ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কা সামাল দেওয়া বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
রিপোর্টারের নাম 
























