ঢাকা ০৮:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

‘মৃত’ শিক্ষাক্রমেই চলছে পাঠদান: পাঠ্যবই পরিমার্জনে এনসিটিবি কর্মকর্তাদের অনীহার অভিযোগ

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী এখনো ২০১০ সালে প্রণীত ‘সৃজনশীল পদ্ধতিতে’ পড়াশোনা করছে, যাকে ২০২০ সালেই তৎকালীন সরকার ‘অকার্যকর’ ও ‘বাস্তবায়নের অযোগ্য’ ঘোষণা করেছিল। গত ১৬ বছর ধরে একই নিয়মে পাঠ্যবই, ক্লাস ও পরীক্ষা চললেও বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন না হওয়ায় চরম পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদরা। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দ্রুত পাঠ্যবই পরিমার্জনের নির্দেশ দিলেও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একাংশের অসহযোগিতায় সেই প্রক্রিয়া থমকে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এনসিটিবি সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বোর্ডের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে থাকা অনেক কর্মকর্তা, যারা বিগত সরকারের আমলে সুবিধাভোগী ছিলেন, তারা শতভাগ পাঠ্যবই পরিমার্জনে অনীহা দেখাচ্ছেন। তারা কেবল বানান সংশোধন ও বাক্য গঠনের ভুল ঠিক করেই দায় সারতে চাচ্ছেন। অথচ শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন বর্তমান সৃজনশীল পদ্ধতির অধীনেই পাঠ্যবইগুলোকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশীদ জানিয়েছেন যে ১৫-১৬ বছর আগের সেকেলে প্রবন্ধ বা বিজ্ঞানের ধারণা দিয়ে বর্তমানের প্রযুক্তি-নির্ভর ‘আলফা’ প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তোলা অসম্ভব। পাঠ্যবইয়ে যদি আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকে, তবে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

সৃজনশীল পদ্ধতির অকার্যকারিতা নিয়ে আগে থেকেই নানা গবেষণা রয়েছে। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে ৪২ শতাংশ শিক্ষক নিজেই এই পদ্ধতি বোঝেন না এবং তারা নোট-গাইড দেখে প্রশ্ন তৈরি করেন। বর্তমানে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী জানিয়েছেন যে নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদেরও এই পদ্ধতির ওপর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই, ফলে প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষকই এখন গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে চালু করা নতুন শিক্ষাক্রমটি ব্যাপক বিতর্কের মুখে বাতিলের পর অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় ২০১০ সালের পদ্ধতিতে ফিরে গিয়েছিল। এখন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্যও এই ‘মৃত’ পদ্ধতিই বহাল থাকছে, যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাহবুবুল হক পাটওয়ারী পরিমার্জনে অবহেলার বিষয়টি অস্বীকার করলেও শিক্ষাবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে অতীতেও অনেক বিশেষজ্ঞ কমিটি করা হয়েছে কিন্তু তাদের পরামর্শ আমলে নেওয়া হয়নি। এদিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে ২০২৭ সালের জন্য দ্রুত পরিমার্জন শেষ করে ২০২৮ সাল থেকে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও যুগোপযোগী কারিকুলাম চালুর চেষ্টা করছে সরকার। পিছিয়ে থাকা শিক্ষাব্যবস্থাকে টেনে তুলতে পাঠদানে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

আজকের ক্রীড়াঙ্গনে উত্তেজনার পারদ: পিএসএল ও ম্যানইউ-লিডসের মহারণ

‘মৃত’ শিক্ষাক্রমেই চলছে পাঠদান: পাঠ্যবই পরিমার্জনে এনসিটিবি কর্মকর্তাদের অনীহার অভিযোগ

আপডেট সময় : ০২:২৪:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী এখনো ২০১০ সালে প্রণীত ‘সৃজনশীল পদ্ধতিতে’ পড়াশোনা করছে, যাকে ২০২০ সালেই তৎকালীন সরকার ‘অকার্যকর’ ও ‘বাস্তবায়নের অযোগ্য’ ঘোষণা করেছিল। গত ১৬ বছর ধরে একই নিয়মে পাঠ্যবই, ক্লাস ও পরীক্ষা চললেও বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন না হওয়ায় চরম পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদরা। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দ্রুত পাঠ্যবই পরিমার্জনের নির্দেশ দিলেও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একাংশের অসহযোগিতায় সেই প্রক্রিয়া থমকে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এনসিটিবি সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বোর্ডের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে থাকা অনেক কর্মকর্তা, যারা বিগত সরকারের আমলে সুবিধাভোগী ছিলেন, তারা শতভাগ পাঠ্যবই পরিমার্জনে অনীহা দেখাচ্ছেন। তারা কেবল বানান সংশোধন ও বাক্য গঠনের ভুল ঠিক করেই দায় সারতে চাচ্ছেন। অথচ শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন বর্তমান সৃজনশীল পদ্ধতির অধীনেই পাঠ্যবইগুলোকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশীদ জানিয়েছেন যে ১৫-১৬ বছর আগের সেকেলে প্রবন্ধ বা বিজ্ঞানের ধারণা দিয়ে বর্তমানের প্রযুক্তি-নির্ভর ‘আলফা’ প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তোলা অসম্ভব। পাঠ্যবইয়ে যদি আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকে, তবে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

সৃজনশীল পদ্ধতির অকার্যকারিতা নিয়ে আগে থেকেই নানা গবেষণা রয়েছে। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে ৪২ শতাংশ শিক্ষক নিজেই এই পদ্ধতি বোঝেন না এবং তারা নোট-গাইড দেখে প্রশ্ন তৈরি করেন। বর্তমানে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী জানিয়েছেন যে নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদেরও এই পদ্ধতির ওপর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই, ফলে প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষকই এখন গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে চালু করা নতুন শিক্ষাক্রমটি ব্যাপক বিতর্কের মুখে বাতিলের পর অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় ২০১০ সালের পদ্ধতিতে ফিরে গিয়েছিল। এখন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্যও এই ‘মৃত’ পদ্ধতিই বহাল থাকছে, যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাহবুবুল হক পাটওয়ারী পরিমার্জনে অবহেলার বিষয়টি অস্বীকার করলেও শিক্ষাবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে অতীতেও অনেক বিশেষজ্ঞ কমিটি করা হয়েছে কিন্তু তাদের পরামর্শ আমলে নেওয়া হয়নি। এদিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে ২০২৭ সালের জন্য দ্রুত পরিমার্জন শেষ করে ২০২৮ সাল থেকে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও যুগোপযোগী কারিকুলাম চালুর চেষ্টা করছে সরকার। পিছিয়ে থাকা শিক্ষাব্যবস্থাকে টেনে তুলতে পাঠদানে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।