ঢাকা ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

চাঁদাবাজির জাল ভাঙতে ডিএমপির সাঁড়াশি অভিযান: ৩৪২ জন চিহ্নিত, ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা

রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত চাঁদাবাজির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে এক বড় ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এরই মধ্যে ৩৪২ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজের একটি বিশেষ তালিকা চূড়ান্ত করেছে এবং তাদের ধরতে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করার জোর প্রস্তুতি চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্দেশনায় অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), বিশেষ শাখা (এসবি) এবং পুলিশের ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন (আইএডি) সম্মিলিতভাবে এই তালিকা হালনাগাদের কাজ সম্পন্ন করেছে। যাচাই-বাছাই শেষে এই তালিকার ভিত্তিতে খুব শীঘ্রই অভিযান শুরু হবে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অপরাধচক্রে পরিণত হয়েছে যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন খাতের অস্থিরতার পেছনে এই চাঁদাবাজচক্রের বড় ভূমিকা রয়েছে। পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের পাঁচটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে: পরিবহন খাত, ফুটপাত, এলাকাভিত্তিক বাজার, অটোরিকশা ও টেম্পোস্ট্যান্ড এবং অস্ত্রধারী চক্র। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে এবং অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।

গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে যে কেবল রাজধানীর কারওয়ান বাজারকে কেন্দ্র করেই অন্তত ৯টি শক্তিশালী চাঁদাবাজচক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা প্রতিদিন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পণ্য পরিবহনকারী ট্রাক থেকে শুরু করে ভ্যানচালক ও ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন যে কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বিরোধে সম্প্রতি এক রাজনৈতিক নেতা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে এই চক্রগুলোর ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন যে চাঁদা না দিলে তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ মাসে সারাদেশে চাঁদাবাজির অভিযোগে এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্তত ২ হাজার ৩২৫টি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে কেবল ঢাকা মহানগরীর ৫০টি থানায় ৪১৯টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে মহাসড়ক ও পাইকারি বাজারগুলোতে জেলা ও হাইওয়ে পুলিশ তৎপরতা বৃদ্ধি করে। এবারই প্রথম চাঁদাবাজদের নিয়ে এমন বিশেষায়িত ও কেন্দ্রীয় তালিকা তৈরি করা হলো যা রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে শুরু করে সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পয়েন্টগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাংলাদেশি জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস ইরানের

চাঁদাবাজির জাল ভাঙতে ডিএমপির সাঁড়াশি অভিযান: ৩৪২ জন চিহ্নিত, ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা

আপডেট সময় : ১২:৪২:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত চাঁদাবাজির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে এক বড় ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এরই মধ্যে ৩৪২ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজের একটি বিশেষ তালিকা চূড়ান্ত করেছে এবং তাদের ধরতে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করার জোর প্রস্তুতি চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্দেশনায় অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), বিশেষ শাখা (এসবি) এবং পুলিশের ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন (আইএডি) সম্মিলিতভাবে এই তালিকা হালনাগাদের কাজ সম্পন্ন করেছে। যাচাই-বাছাই শেষে এই তালিকার ভিত্তিতে খুব শীঘ্রই অভিযান শুরু হবে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অপরাধচক্রে পরিণত হয়েছে যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন খাতের অস্থিরতার পেছনে এই চাঁদাবাজচক্রের বড় ভূমিকা রয়েছে। পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের পাঁচটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে: পরিবহন খাত, ফুটপাত, এলাকাভিত্তিক বাজার, অটোরিকশা ও টেম্পোস্ট্যান্ড এবং অস্ত্রধারী চক্র। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে এবং অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।

গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে যে কেবল রাজধানীর কারওয়ান বাজারকে কেন্দ্র করেই অন্তত ৯টি শক্তিশালী চাঁদাবাজচক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা প্রতিদিন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পণ্য পরিবহনকারী ট্রাক থেকে শুরু করে ভ্যানচালক ও ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন যে কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বিরোধে সম্প্রতি এক রাজনৈতিক নেতা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে এই চক্রগুলোর ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন যে চাঁদা না দিলে তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ মাসে সারাদেশে চাঁদাবাজির অভিযোগে এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্তত ২ হাজার ৩২৫টি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে কেবল ঢাকা মহানগরীর ৫০টি থানায় ৪১৯টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে মহাসড়ক ও পাইকারি বাজারগুলোতে জেলা ও হাইওয়ে পুলিশ তৎপরতা বৃদ্ধি করে। এবারই প্রথম চাঁদাবাজদের নিয়ে এমন বিশেষায়িত ও কেন্দ্রীয় তালিকা তৈরি করা হলো যা রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে শুরু করে সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পয়েন্টগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাবে বলে আশা করা হচ্ছে।