ঢাকা ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

অরক্ষিত রেলপথে মৃত্যুর মিছিল: পাঁচ বছরে উদ্ধার ৫ হাজারেরও বেশি লাশ

দেশের ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ রেলপথ এখন এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন রেললাইন থেকে মোট ৫ হাজার ৯৮টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে গড়ে ৮৫ জন এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ জন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন এই রেলপথে। উদ্ধার হওয়া লাশের একটি বড় অংশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না কারণ ট্রেনে কাটা পড়ে দেহ বিকৃত হয়ে যায়। পরিচয় না মেলা এসব লাশকে শেষ পর্যন্ত বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে হয়। অন্যদিকে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

রেলওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, এসব মৃত্যুর পেছনে রয়েছে আত্মহত্যা, অসচেতনতা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের এক জটিল সমীকরণ। মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই আত্মহত্যার ঘটনা। এছাড়া প্রায় ৩০ শতাংশ মৃত্যু ঘটছে কানে হেডফোন বা মোবাইল ফোন লাগিয়ে রেললাইনে হাঁটাচলা করার সময় ট্রেনের শব্দ শুনতে না পেয়ে। অনেকে আবার রেললাইনের ওপর অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকা, লেভেলক্রসিং দ্রুত পারাপারের চেষ্টা কিংবা ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। তবে এর বাইরেও রয়েছে অপরাধীদের নৃশংসতা। অনেক সময় ছিনতাইকারী বা দুষ্কৃতকারীরা যাত্রীদের ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করছে অথবা অন্য কোথাও খুনের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে রেললাইনে লাশ ফেলে রেখে যাচ্ছে যাতে একে দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়। গত পাঁচ বছরে এ ধরনের অন্তত ২৫টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতির জন্য রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা ও অরক্ষিত লেভেলক্রসিংকে দায়ী করছেন। অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী মনে করেন, দেশের রেলপথের ৯৮ শতাংশ এলাকাই রাতে অন্ধকারে ঢাকা থাকে এবং জনমানবহীন নির্জন হওয়ার কারণে অপরাধীরা লাশ গুম করার সহজ সুযোগ পায়। যদিও রেল আইনের ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী রেললাইনের দুই পাশে ২০ ফুটের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং সেখানে সবসময় ১৪৪ ধারা জারি থাকে, কিন্তু জনবহুল এই দেশে বাস্তব কারণে এই আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। রেলওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন যে প্রতিটি ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করে তদন্ত চালানো হয়, তবে বিশাল এই উন্মুক্ত রেলপথ পাহারা দেওয়া সীমিত লোকবল দিয়ে অসম্ভব।

এই সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং লেভেলক্রসিংগুলোতে পর্যাপ্ত গেটম্যান নিয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন। রেলওয়ে পুলিশের কর্মকর্তাদের মতে, অরক্ষিত রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হবে। অপরাধীরা যাতে নির্জন অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে রেললাইনকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাংলাদেশি জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস ইরানের

অরক্ষিত রেলপথে মৃত্যুর মিছিল: পাঁচ বছরে উদ্ধার ৫ হাজারেরও বেশি লাশ

আপডেট সময় : ১২:৪১:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

দেশের ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ রেলপথ এখন এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন রেললাইন থেকে মোট ৫ হাজার ৯৮টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে গড়ে ৮৫ জন এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ জন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন এই রেলপথে। উদ্ধার হওয়া লাশের একটি বড় অংশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না কারণ ট্রেনে কাটা পড়ে দেহ বিকৃত হয়ে যায়। পরিচয় না মেলা এসব লাশকে শেষ পর্যন্ত বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে হয়। অন্যদিকে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

রেলওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, এসব মৃত্যুর পেছনে রয়েছে আত্মহত্যা, অসচেতনতা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের এক জটিল সমীকরণ। মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই আত্মহত্যার ঘটনা। এছাড়া প্রায় ৩০ শতাংশ মৃত্যু ঘটছে কানে হেডফোন বা মোবাইল ফোন লাগিয়ে রেললাইনে হাঁটাচলা করার সময় ট্রেনের শব্দ শুনতে না পেয়ে। অনেকে আবার রেললাইনের ওপর অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকা, লেভেলক্রসিং দ্রুত পারাপারের চেষ্টা কিংবা ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। তবে এর বাইরেও রয়েছে অপরাধীদের নৃশংসতা। অনেক সময় ছিনতাইকারী বা দুষ্কৃতকারীরা যাত্রীদের ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করছে অথবা অন্য কোথাও খুনের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে রেললাইনে লাশ ফেলে রেখে যাচ্ছে যাতে একে দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়। গত পাঁচ বছরে এ ধরনের অন্তত ২৫টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতির জন্য রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা ও অরক্ষিত লেভেলক্রসিংকে দায়ী করছেন। অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী মনে করেন, দেশের রেলপথের ৯৮ শতাংশ এলাকাই রাতে অন্ধকারে ঢাকা থাকে এবং জনমানবহীন নির্জন হওয়ার কারণে অপরাধীরা লাশ গুম করার সহজ সুযোগ পায়। যদিও রেল আইনের ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী রেললাইনের দুই পাশে ২০ ফুটের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং সেখানে সবসময় ১৪৪ ধারা জারি থাকে, কিন্তু জনবহুল এই দেশে বাস্তব কারণে এই আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। রেলওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন যে প্রতিটি ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করে তদন্ত চালানো হয়, তবে বিশাল এই উন্মুক্ত রেলপথ পাহারা দেওয়া সীমিত লোকবল দিয়ে অসম্ভব।

এই সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং লেভেলক্রসিংগুলোতে পর্যাপ্ত গেটম্যান নিয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন। রেলওয়ে পুলিশের কর্মকর্তাদের মতে, অরক্ষিত রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হবে। অপরাধীরা যাতে নির্জন অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে রেললাইনকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।