ঢাকা ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি তেল সরবরাহে স্বচ্ছতা ফেরাতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ: অনিয়ম রুখতে সরকারের কঠোর নজরদারি

সারাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা নিরসনে প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিধি নির্ধারণ করে দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গত রবিবার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয় যে পাম্পগুলোতে তেলের মজুত, সরবরাহ এবং বিক্রয় কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। নির্ধারিত দায়িত্ব অনুযায়ী ট্যাগ অফিসারদের প্রতিদিন পাম্পের প্রারম্ভিক মজুত রেকর্ড করতে হবে এবং ডিপো থেকে আসা তেল সরাসরি উপস্থিত থেকে পরিমাপ করে গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। চালানের সঙ্গে তেলের পরিমাণ মিলিয়ে দেখার পাশাপাশি ডিপ-রডের মাধ্যমে বাস্তব মজুত যাচাই এবং বিক্রয় মিটারের রিডিং নিয়মিত পরীক্ষা করাও তাদের কাজের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া পাম্পের আশেপাশে কোনো অননুমোদিত ট্যাংক বা গোপন মজুত আছে কি না তাও তারা খতিয়ে দেখবেন।

সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে প্রতিটি ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে যেখানে দিনে অন্তত তিনবার স্টকের তথ্য আপডেট করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে ডিপো থেকে তেল গ্রহণের এক ঘণ্টার মধ্যে খুচরা বিক্রি শুরু করতে হবে নতুবা এটি নিয়ম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। নিয়ম ভাঙলে প্রথমবার সতর্কতা এবং পরবর্তী ধাপে মোবাইল কোর্ট ও পাম্পের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ট্যাগ অফিসাররা নিয়মিতভাবে পাম্প খোলা রাখা, ক্যাশ মেমো প্রদান এবং কন্টেইনারে অবৈধ বিক্রি প্রতিরোধের বিষয়গুলো জিও-ট্যাগ প্রমাণসহ রিপোর্ট করবেন যা জ্বালানি খাতের কারসাজি কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে সরকারি এসব উদ্যোগের মাঝেও মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনও বেশ সংকটাপন্ন কারণ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তেলের জন্য চালকদের হাহাকার কমেনি। গতকাল সকালে রাজধানীর আসাদগেট এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায় যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন যে আগের রাতেই তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং নতুন সরবরাহ কবে আসবে তা নিশ্চিত না হওয়ায় তারা বিক্রি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে যেসব পাম্পে সরবরাহ সচল আছে সেখানে অতিরিক্ত চাপের কারণে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্টিকার দিয়ে সিরিয়াল নির্ধারণ করতে হচ্ছে যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে রংপুর বিভাগে ট্যাংকলরি শ্রমিকদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে উত্তরের আট জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে যা সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নীলফামারী জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তিনজন শ্রমিককে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়ার প্রতিবাদে এই আন্দোলন শুরু হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ যে লরির কেবিনে অতিরিক্ত তেল রাখার অজুহাতে অযৌক্তিকভাবে এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং এর প্রতিবাদে পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপো থেকে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে দণ্ডপ্রাপ্তদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে যা উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও পরিবহণ ব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাংলাদেশি জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস ইরানের

জ্বালানি তেল সরবরাহে স্বচ্ছতা ফেরাতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ: অনিয়ম রুখতে সরকারের কঠোর নজরদারি

আপডেট সময় : ১২:৩৯:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

সারাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা নিরসনে প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিধি নির্ধারণ করে দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গত রবিবার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয় যে পাম্পগুলোতে তেলের মজুত, সরবরাহ এবং বিক্রয় কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। নির্ধারিত দায়িত্ব অনুযায়ী ট্যাগ অফিসারদের প্রতিদিন পাম্পের প্রারম্ভিক মজুত রেকর্ড করতে হবে এবং ডিপো থেকে আসা তেল সরাসরি উপস্থিত থেকে পরিমাপ করে গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। চালানের সঙ্গে তেলের পরিমাণ মিলিয়ে দেখার পাশাপাশি ডিপ-রডের মাধ্যমে বাস্তব মজুত যাচাই এবং বিক্রয় মিটারের রিডিং নিয়মিত পরীক্ষা করাও তাদের কাজের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া পাম্পের আশেপাশে কোনো অননুমোদিত ট্যাংক বা গোপন মজুত আছে কি না তাও তারা খতিয়ে দেখবেন।

সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে প্রতিটি ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে যেখানে দিনে অন্তত তিনবার স্টকের তথ্য আপডেট করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে ডিপো থেকে তেল গ্রহণের এক ঘণ্টার মধ্যে খুচরা বিক্রি শুরু করতে হবে নতুবা এটি নিয়ম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। নিয়ম ভাঙলে প্রথমবার সতর্কতা এবং পরবর্তী ধাপে মোবাইল কোর্ট ও পাম্পের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ট্যাগ অফিসাররা নিয়মিতভাবে পাম্প খোলা রাখা, ক্যাশ মেমো প্রদান এবং কন্টেইনারে অবৈধ বিক্রি প্রতিরোধের বিষয়গুলো জিও-ট্যাগ প্রমাণসহ রিপোর্ট করবেন যা জ্বালানি খাতের কারসাজি কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে সরকারি এসব উদ্যোগের মাঝেও মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনও বেশ সংকটাপন্ন কারণ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তেলের জন্য চালকদের হাহাকার কমেনি। গতকাল সকালে রাজধানীর আসাদগেট এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায় যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন যে আগের রাতেই তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং নতুন সরবরাহ কবে আসবে তা নিশ্চিত না হওয়ায় তারা বিক্রি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে যেসব পাম্পে সরবরাহ সচল আছে সেখানে অতিরিক্ত চাপের কারণে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্টিকার দিয়ে সিরিয়াল নির্ধারণ করতে হচ্ছে যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে রংপুর বিভাগে ট্যাংকলরি শ্রমিকদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে উত্তরের আট জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে যা সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নীলফামারী জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তিনজন শ্রমিককে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়ার প্রতিবাদে এই আন্দোলন শুরু হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ যে লরির কেবিনে অতিরিক্ত তেল রাখার অজুহাতে অযৌক্তিকভাবে এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং এর প্রতিবাদে পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপো থেকে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে দণ্ডপ্রাপ্তদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে যা উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও পরিবহণ ব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।