বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাবে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা পানি সংকট ও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা নিরসনে ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। মৃতপ্রায় নদীগুলো প্রাণ ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এটি হবে এক নতুন দিগন্ত।
কেন এই পদ্মা ব্যারাজ?
১৯৭৫ সালে ভারত পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কায় ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। এর ফলে গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল নদীগুলো শুকিয়ে যেতে শুরু করে। সুপেয় পানির অভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, যা সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম এবং কৃষির জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, যা এই প্রকল্পের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ হবে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। তবে কাজের সুবিধার জন্য একে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:
- পানি সংরক্ষণ: শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) প্রায় ২,৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ।
- নদী পুনরুজ্জীবিতকরণ: পাঁচটি প্রধান নদী সিস্টেমের (হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী ইত্যাদি) প্রবাহ নিশ্চিত করা।
- লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ: খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট এলাকায় লবণাক্ততার প্রবেশ রোধ।
- বিদ্যুৎ উৎপাদন: কোনো জ্বালানি ছাড়াই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন।
- কৃষি ও মৎস্য: বার্ষিক প্রায় ২৩.৯০ লাখ টন অতিরিক্ত ধান এবং ২.৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি।
নির্মাণশৈলী ও অবকাঠামো
রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় এই ব্যারাজটি নির্মিত হবে। এর কারিগরি বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:
- দৈর্ঘ্য: ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ।
- গেট: ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট এবং ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট।
- অন্যান্য সুবিধা: ১৪ মিটার প্রশস্ত নেভিগেশন লক (নৌ-চলাচলের জন্য), দুটি ফিস পাস এবং ব্যারাজের ওপর দিয়ে একটি রেলওয়ে সেতু।
- বিদ্যুৎ কেন্দ্র: পাংশা ও গড়াই অফটেকে পৃথক দুটি হাইড্রো-পাওয়ার প্ল্যান্ট।
উপকৃত এলাকা
প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ে ৪টি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে। এর মধ্যে খুলনা বিভাগের প্রায় সব জেলাসহ রাজশাহী, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই বিশাল অঞ্চলের প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে।
চ্যালেঞ্জ ও ভূ-রাজনীতি
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মো. মাহমুদুল হোসাইন খান জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলো মাথায় রেখে প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ এবং দুই দেশের পানিবণ্টন রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা বাংলাদেশের টিকে থাকার লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ব্যারাজের উজানে ভাঙন ও ভাটিতে পলি জমার মতো ঝুঁকিগুলো উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে।
বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) আশা করছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে কাজ শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হবে। এটি সফল হলে প্রতি বছর দেশ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক সুফল পাবে।
রিপোর্টারের নাম 
























