বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান তীব্র তারল্য সংকট মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ধার দেওয়ার বিষয়টি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশের ১২টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে সংকট থেকে টেনে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত মোট ৬৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের তারল্য সহায়তা প্রদান করেছে। যদিও এই অর্থ স্বল্পমেয়াদী ঋণের আওতায় দেওয়া হয়েছিল, তবে বাস্তব চিত্র হচ্ছে বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও এই অর্থের সিংহভাগই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে ফেরত আসেনি।
এই বিশাল অংকের অর্থ সহায়তার নেপথ্যে থাকা দুই গভর্নরের আমলের তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণ করলে এক চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে দায়িত্ব পালনকারী গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এবং পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব নেওয়া ড. আহসান এইচ মনসুর—উভয়ের আমলেই ব্যাংকগুলোকে টাকা ছাপিয়ে বড় অঙ্কের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে পরিমাণের বিচারে ড. মনসুরের সময়কাল রউফ তালুকদারের সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মোট ৬৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকার মধ্যে ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে। অন্যদিকে, ড. আহসান এইচ মনসুরের মেয়াদে দেওয়া হয়েছে ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট সহায়তার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। অথচ দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. মনসুর টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক বাঁচানোর প্রক্রিয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং এই অবস্থান থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়ে শুরুতে এক ধরণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিলেন বলেও বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা।
ব্যাংকিং খাতের এই গভীর সংকটের শিকড় মূলত গত এক দশকের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে প্রোথিত। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোতে বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ২০২২ সালের শেষ দিকে যখন এই ব্যাংকগুলোর দেউলিয়া হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং তারা গণহারে টাকা তুলতে শুরু করেন। ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বাধ্যতামূলক সিআরআর ও এসএলআর সংরক্ষণ করতেও ব্যর্থ হয়। তৎকালীন গভর্নর রউফ তালুকদার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা এসব দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিশেষ সুবিধা ও নতুন টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আব্দুর রউফ তালুকদার আত্মগোপনে চলে গেলে নতুন গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি এসেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আর কোনো টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক বাঁচানো হবে না। তার এই কঠোর অবস্থানে ব্যাংকগুলোর শাখা পর্যায়ে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং গ্রাহকরা টাকা ফেরত না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে গ্রাহকের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত ড. মনসুর তার আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। ২০২৪ সালের শেষ দিকে তিনি নিজেই স্বীকার করেন যে, গ্রাহকদের স্বার্থে এবং ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে সাময়িকভাবে টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিতে হচ্ছে।
সহায়তা পাওয়া ব্যাংকগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, যারা একাই পেয়েছে ১৫,৮১০ কোটি টাকা। এছাড়া এক্সিম ব্যাংক ১২,০১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০,৮৪১ কোটি এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ১০,৫৬৮ কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে। অন্যান্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এবি ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকও বড় অংকের অর্থ পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের বিধান অনুযায়ী এই অর্থ ৯০ দিনের জন্য ১১.৫ শতাংশ সুদে প্রদান করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এভাবে টাকা ছাপিয়ে অর্থায়ন করা সাময়িক সমাধান হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয় এবং বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এতে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী একে ‘সাময়িক মলম’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন যে, মূল সমস্যার সমাধান না করে শুধু টাকা ছাপিয়ে স্থায়ী মুক্তি সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিশাল সহায়তার পরও সাধারণ গ্রাহকরা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংক থেকে তাদের আমানত ফেরত পাচ্ছেন না।
ঈদের আগে অনেক গ্রাহককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন করতেও দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র অবশ্য দাবি করেছেন যে, আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতেই তারা এই ঝুঁকি নিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এই সংকটের প্রকৃত সমাধান নির্ভর করছে ঋণ জালিয়াতির বিচার এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের ওপর, অন্যথায় টাকা ছাপানোর এই প্রক্রিয়া অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়েই থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 

























