ঢাকা ০৪:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

এপ্রিলের জন্য এলএনজি নিশ্চিত করল পেট্রোবাংলা: ভর্তুকি ছাড়াবে ২০ হাজার কোটি টাকা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আগামী এপ্রিল মাসের জন্য প্রয়োজনীয় ৯ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জোগান নিশ্চিত করেছে পেট্রোবাংলা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামে এই গ্যাস কেনায় চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির বোঝা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এপ্রিলের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা: পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিল মাসের চাহিদা মেটাতে মোট ৯ কার্গো এলএনজি কেনা হচ্ছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে আসার কথা থাকলেও যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বদলে গেছে। ৮টি কার্গো সরাসরি স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে কেনা হচ্ছে এবং বাকি ১টি কার্গো বিকল্প দেশ অ্যাঙ্গোলা থেকে সরবরাহ করবে কাতার এনার্জি। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান জানান, গত ২৫ মার্চ এই সরবরাহ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হয়েছে।

ভর্তুকির রেকর্ড উল্লম্ফন: সরকার সাধারণত এলএনজি আমদানিতে বছরে গড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। কিন্তু বর্তমান সংকটে স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন মেট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) গ্যাস প্রায় ২২ ডলারে কিনতে হচ্ছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল মাত্র ৯-১০ ডলার। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে পেট্রোবাংলার হিসাব মতে, চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। অথচ অর্থবছর শুরুর প্রাক্কলন ছিল মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা।

কাতার ও ওমান থেকে সরবরাহ সংকট: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর কাতার এনার্জি ও ওমানের ওকিউটি-সহ বড় সরবরাহকারীরা ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ (নিয়ন্ত্রণ-বহির্ভূত পরিস্থিতি) ঘোষণা করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ-চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় কাতার থেকে এলএনজি আসা কার্যত বন্ধ রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে বড় কোনো বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করেনি, তবে ১১টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা থাকলেও সরবরাহ সংকটে ২টি কার্গো কম আমদানি করা হচ্ছে।

বিকল্প উৎস ও উচ্চমূল্য: গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকার এখন দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও অ্যাঙ্গোলার মতো বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করছে। গত ১১ মার্চ ও ২৬ মার্চ স্পট মার্কেট থেকে কয়েক কার্গো গ্যাস কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ-এর দাম ধরা হয়েছে ১৯.৭৭ থেকে ২১.৫৮ ডলার পর্যন্ত। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরেও এই দাম ছিল মাত্র ১০.৩৭ ডলার।

বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে গড়ে সাড়ে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা স্বাভাবিক সময়ের (সাড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট) চেয়ে কম। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ নিয়ে এই অনিশ্চয়তা ও উচ্চমূল্যের চাপ অব্যাহত থাকবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

নাটোরের গুরুদাসপুরে কলেজে কাফনের কাপড় পার্সেল, শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক

এপ্রিলের জন্য এলএনজি নিশ্চিত করল পেট্রোবাংলা: ভর্তুকি ছাড়াবে ২০ হাজার কোটি টাকা

আপডেট সময় : ১২:৫৫:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আগামী এপ্রিল মাসের জন্য প্রয়োজনীয় ৯ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জোগান নিশ্চিত করেছে পেট্রোবাংলা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামে এই গ্যাস কেনায় চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির বোঝা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এপ্রিলের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা: পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিল মাসের চাহিদা মেটাতে মোট ৯ কার্গো এলএনজি কেনা হচ্ছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে আসার কথা থাকলেও যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বদলে গেছে। ৮টি কার্গো সরাসরি স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে কেনা হচ্ছে এবং বাকি ১টি কার্গো বিকল্প দেশ অ্যাঙ্গোলা থেকে সরবরাহ করবে কাতার এনার্জি। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান জানান, গত ২৫ মার্চ এই সরবরাহ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হয়েছে।

ভর্তুকির রেকর্ড উল্লম্ফন: সরকার সাধারণত এলএনজি আমদানিতে বছরে গড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। কিন্তু বর্তমান সংকটে স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন মেট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) গ্যাস প্রায় ২২ ডলারে কিনতে হচ্ছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল মাত্র ৯-১০ ডলার। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে পেট্রোবাংলার হিসাব মতে, চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। অথচ অর্থবছর শুরুর প্রাক্কলন ছিল মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা।

কাতার ও ওমান থেকে সরবরাহ সংকট: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর কাতার এনার্জি ও ওমানের ওকিউটি-সহ বড় সরবরাহকারীরা ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ (নিয়ন্ত্রণ-বহির্ভূত পরিস্থিতি) ঘোষণা করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ-চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় কাতার থেকে এলএনজি আসা কার্যত বন্ধ রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে বড় কোনো বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করেনি, তবে ১১টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা থাকলেও সরবরাহ সংকটে ২টি কার্গো কম আমদানি করা হচ্ছে।

বিকল্প উৎস ও উচ্চমূল্য: গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকার এখন দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও অ্যাঙ্গোলার মতো বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করছে। গত ১১ মার্চ ও ২৬ মার্চ স্পট মার্কেট থেকে কয়েক কার্গো গ্যাস কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ-এর দাম ধরা হয়েছে ১৯.৭৭ থেকে ২১.৫৮ ডলার পর্যন্ত। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরেও এই দাম ছিল মাত্র ১০.৩৭ ডলার।

বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে গড়ে সাড়ে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা স্বাভাবিক সময়ের (সাড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট) চেয়ে কম। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ নিয়ে এই অনিশ্চয়তা ও উচ্চমূল্যের চাপ অব্যাহত থাকবে।