ঢাকা ১০:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

জেট ফুয়েলের দামে ‘আগুন’: দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে দেশের এভিয়েশন খাত

দফায় দফায় জেট ফুয়েলের (উড়োজাহাজের জ্বালানি) দাম বৃদ্ধির প্রবাদে দেশের এভিয়েশন খাতে রীতিমতো ‘আগুন’ লেগেছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় রুটে বিমান ভাড়া এক লাফে আকাশ ছুঁয়েছে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটের প্রতিটি টিকিটে যাত্রীদের আগের তুলনায় গড়ে অন্তত দেড় হাজার টাকা এবং আন্তর্জাতিক রুটে ৫ হাজার টাকার বেশি অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার অজুহাতে দেশে মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি ১০৭ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন যাত্রী ও এয়ারলাইন্স মালিকরা।

অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরিসংখ্যান: সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ লিটারপ্রতি বেড়েছে প্রায় ৯০ টাকা। আন্তর্জাতিক রুটেও প্রতি লিটারে বৃদ্ধি পেয়েছে ৭০ টাকার বেশি। অথচ প্রতিবেশী ভারত ও নেপালে জেট ফুয়েলের মূল্য এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। পাকিস্তানে এই বৃদ্ধির হার সাড়ে ২৪ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা এভিয়েশন খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

ঝুঁকির মুখে বেসরকারি এয়ারলাইন্স: এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান এই মূল্যবৃদ্ধিকে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই এবং গত ২২ দিনে প্রায় ২৫টি তেলবাহী জাহাজ এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ এই বিশাল মূল্যবৃদ্ধি খাতের জন্য আত্মঘাতী। ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রার মতো সংস্থাগুলো জানিয়েছে, পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশই জ্বালানি খাতে যায়। ফলে এই খরচ সমন্বয় করতে গিয়ে ভাড়া বাড়াতে তারা বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে যাত্রীসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ভাড়ার ওপর প্রভাব ও যাত্রী ভোগান্তি: বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট বা সৈয়দপুর রুটে টিকিটের ন্যূনতম দাম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার নিচে মিলছে না, যা আগে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা ছিল। শেষ মুহূর্তের টিকিট ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, “আগে যে টাকা দিয়ে আসা-যাওয়া করতাম, এখন তা দিয়ে একদিকের টিকিটও হচ্ছে না।” চড়া ভাড়ার কারণে অনেক পর্যটক ও নিয়মিত যাত্রী এখন বিমান ছেড়ে সড়ক বা রেলপথে ঝুঁকছেন, যা পর্যটনশিল্পের জন্যও অশনিসংকেত।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বিশেষ ভর্তুকি বা করছাড় দিতে হবে। জেট ফুয়েলের ওপর বিদ্যমান ট্যাক্স ও ভ্যাট কমিয়ে দাম সহনীয় পর্যায়ে না আনলে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি ডলার সংকটের এই সময়ে এয়ারলাইনসগুলোর জন্য বিশেষ এলসি সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।

বিইআরসি অবশ্য দাবি করছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্ল্যাটসের দর ও ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় এই দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকাশপথ শুধু বিলাসিতা নয়, এটি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আকাশপথের বাজার ছোট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি গোটা পরিবহন ব্যবস্থা গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

স্পিকারের ‘শাহবাগ স্কয়ার’ মন্তব্য: সংসদে বৈষম্যের অভিযোগ হাসনাত আবদুল্লাহর

জেট ফুয়েলের দামে ‘আগুন’: দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে দেশের এভিয়েশন খাত

আপডেট সময় : ১২:৩২:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

দফায় দফায় জেট ফুয়েলের (উড়োজাহাজের জ্বালানি) দাম বৃদ্ধির প্রবাদে দেশের এভিয়েশন খাতে রীতিমতো ‘আগুন’ লেগেছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় রুটে বিমান ভাড়া এক লাফে আকাশ ছুঁয়েছে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটের প্রতিটি টিকিটে যাত্রীদের আগের তুলনায় গড়ে অন্তত দেড় হাজার টাকা এবং আন্তর্জাতিক রুটে ৫ হাজার টাকার বেশি অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার অজুহাতে দেশে মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি ১০৭ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন যাত্রী ও এয়ারলাইন্স মালিকরা।

অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরিসংখ্যান: সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ লিটারপ্রতি বেড়েছে প্রায় ৯০ টাকা। আন্তর্জাতিক রুটেও প্রতি লিটারে বৃদ্ধি পেয়েছে ৭০ টাকার বেশি। অথচ প্রতিবেশী ভারত ও নেপালে জেট ফুয়েলের মূল্য এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। পাকিস্তানে এই বৃদ্ধির হার সাড়ে ২৪ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা এভিয়েশন খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

ঝুঁকির মুখে বেসরকারি এয়ারলাইন্স: এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান এই মূল্যবৃদ্ধিকে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই এবং গত ২২ দিনে প্রায় ২৫টি তেলবাহী জাহাজ এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ এই বিশাল মূল্যবৃদ্ধি খাতের জন্য আত্মঘাতী। ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রার মতো সংস্থাগুলো জানিয়েছে, পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশই জ্বালানি খাতে যায়। ফলে এই খরচ সমন্বয় করতে গিয়ে ভাড়া বাড়াতে তারা বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে যাত্রীসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ভাড়ার ওপর প্রভাব ও যাত্রী ভোগান্তি: বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট বা সৈয়দপুর রুটে টিকিটের ন্যূনতম দাম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার নিচে মিলছে না, যা আগে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা ছিল। শেষ মুহূর্তের টিকিট ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, “আগে যে টাকা দিয়ে আসা-যাওয়া করতাম, এখন তা দিয়ে একদিকের টিকিটও হচ্ছে না।” চড়া ভাড়ার কারণে অনেক পর্যটক ও নিয়মিত যাত্রী এখন বিমান ছেড়ে সড়ক বা রেলপথে ঝুঁকছেন, যা পর্যটনশিল্পের জন্যও অশনিসংকেত।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বিশেষ ভর্তুকি বা করছাড় দিতে হবে। জেট ফুয়েলের ওপর বিদ্যমান ট্যাক্স ও ভ্যাট কমিয়ে দাম সহনীয় পর্যায়ে না আনলে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি ডলার সংকটের এই সময়ে এয়ারলাইনসগুলোর জন্য বিশেষ এলসি সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।

বিইআরসি অবশ্য দাবি করছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্ল্যাটসের দর ও ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় এই দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকাশপথ শুধু বিলাসিতা নয়, এটি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আকাশপথের বাজার ছোট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি গোটা পরিবহন ব্যবস্থা গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে।