কুষ্টিয়া ও রাজধানীর শাহবাগে গত দুই দিনে ঘটে যাওয়া দুটি পৃথক নৃশংস ঘটনা দেশে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির ভয়াবহ চিত্রকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। গত শনিবার কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীম রেজা নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা এবং শুক্রবার শাহবাগে ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামিতার অভিযোগে একদল নারী-পুরুষের ওপর হামলা দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ একাধিকবার দাবি করেছেন যে দেশে ‘মব কালচার’ শেষ হয়ে গেছে এবং এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না, কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে চুরি, ছিনতাই এবং ধর্মীয় অবমাননার মতো ঠুনকো অজুহাতে গণপিটুনির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক ক্ষেত্রেই হিমশিম খাচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান দেশের এই পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, কেবল গত মার্চ মাসেই ২৫টি মব সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ৩৮ জন আহত হয়েছেন। গত তিন মাসে মোট ৮৮টি এ ধরনের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৯ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ৮০ জন। এছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে ১২৮ জন নিহত হলেও ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ জনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং অনলাইন গুজবের কারণে এই বর্বরতা থামছে না। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মব ভায়োলেন্স আইনের শাসনের জন্য একটি বড় হুমকি এবং প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া এই প্রবণতা রোধ করা প্রায় অসম্ভব।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে তারা মব সহিংসতা রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেছেন যে মব ভায়োলেন্স পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে পুলিশ প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। অন্যদিকে মানবাধিকার কর্মীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে এই ধরনের উন্মত্ততা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব উল্লেখ করে তারা মব সহিংসতা বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 



















