ঢাকা ১০:৫১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা: নিয়তি নাকি অব্যবস্থাপনার অনুমিত ফলাফল?

ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি করতে প্রতিবছর কোটি মানুষ শেকড়ের টানে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু গত ১৭ থেকে ২৬ মার্চের ঈদযাত্রায় সড়ক, রেল ও নৌপথে যে ভয়াবহ প্রাণহানিগুলো ঘটল, সেগুলোকে কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এগুলো আসলে আমাদের গোটা পরিবহন ব্যবস্থার ‘সিস্টেম ব্যর্থতার’ এক চরম বহিঃপ্রকাশ। এই ঈদযাত্রা এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতার একটি লিটমাস টেস্টে পরিণত হয়েছে, যেখানে আমরা বারবার অকৃতকার্য হচ্ছি।

এই বছরের ঈদযাত্রায় তিনটি বড় ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে গলদটা ঠিক কোথায়। প্রথমত, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে ১২ জন প্রাণ হারান। দ্বিতীয়ত, সদরঘাটে লঞ্চের চাপে ছোট নৌযান পিষ্ট হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু এবং তৃতীয়ত, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মায় পড়ে সলিল সমাধি। এই তিনটি ঘটনাকে আলাদা মনে হলেও প্রকৌশল ও অপারেশনাল দৃষ্টিকোণ থেকে এদের মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র আছে—তা হলো মানুষ, যান ও অবকাঠামো যেখানে একসাথে মিশেছে, সেখানেই ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার একটি প্রধান কারণ হলো স্পিড-ম্যানেজমেন্ট বা গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা। ঈদের সময় মহাসড়কে তীব্র যানজটের পর রাস্তা কিছুটা ফাঁকা পেলেই চালকরা ‘টাইম রিকভারি’ করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এই অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং এবং বেপরোয়া ঝুঁকি নেওয়াই মূলত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের মিশ্র ট্রাফিক ব্যবস্থা। একই রাস্তায় যখন বাস, ট্রাকের পাশাপাশি মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক চলে, তখন গতির এই ভিন্নতা চরম ঝুঁকি তৈরি করে। বাসের টিকিট না পাওয়া বা অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেলে দূরপাল্লার যাত্রা করছেন, যা ২০২৬ সালের ঈদযাত্রাতেও দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানকে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো মালিকানা পদ্ধতির বিশৃঙ্খলা। এখানে একজন বাসের মালিক যেমন অপারেটর, তেমনি শত বাসের মালিকও একইভাবে ব্যবসা করছেন। ফলে যাত্রী ধরার এক অসুস্থ ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এই প্রতিযোগিতার কারণেই সড়কে গতি বাড়ে, টার্মিনালে বিশৃঙ্খলা হয় এবং ফেরিঘাটে অপারেশনাল ঝুঁকি তৈরি হয়। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে ‘বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি’ এবং ‘নৌ রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি’ সিস্টেম চালুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। অর্থাৎ নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট সংখ্যক অনুমোদিত অপারেটর এবং একীভূত টিকিটিং ব্যবস্থা থাকলে এই প্রাণঘাতী প্রতিযোগিতা কমবে।

রেলপথের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো রেলক্রসিং। এটি এমন একটি স্পর্শকাতর জায়গা যেখানে ভুলের সুযোগ শূন্য হওয়া উচিত। অথচ আমরা এখনো মান্ধাতা আমলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও দুর্বল তদারকির ওপর নির্ভর করছি। একইভাবে নৌ-পথেও সমস্যাটি কাঠামোগত। টার্মিনালগুলোর ডিজাইন ও অপারেশনাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত নড়বড়ে। নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ছোট নৌযান নিষিদ্ধ করার আইনগুলো কাগজে থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। তাই ঈদযাত্রার এই মৃত্যুমিছিল থামাতে হলে শুধু মৌসুমি প্রস্তুতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পহেলা বৈশাখে নিরাপত্তার চাদরে রাজধানী: ১৪ স্থানে ব্যারিকেড ও কঠোর বিধিনিষেধ

ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা: নিয়তি নাকি অব্যবস্থাপনার অনুমিত ফলাফল?

আপডেট সময় : ১২:২১:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি করতে প্রতিবছর কোটি মানুষ শেকড়ের টানে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু গত ১৭ থেকে ২৬ মার্চের ঈদযাত্রায় সড়ক, রেল ও নৌপথে যে ভয়াবহ প্রাণহানিগুলো ঘটল, সেগুলোকে কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এগুলো আসলে আমাদের গোটা পরিবহন ব্যবস্থার ‘সিস্টেম ব্যর্থতার’ এক চরম বহিঃপ্রকাশ। এই ঈদযাত্রা এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতার একটি লিটমাস টেস্টে পরিণত হয়েছে, যেখানে আমরা বারবার অকৃতকার্য হচ্ছি।

এই বছরের ঈদযাত্রায় তিনটি বড় ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে গলদটা ঠিক কোথায়। প্রথমত, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে ১২ জন প্রাণ হারান। দ্বিতীয়ত, সদরঘাটে লঞ্চের চাপে ছোট নৌযান পিষ্ট হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু এবং তৃতীয়ত, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মায় পড়ে সলিল সমাধি। এই তিনটি ঘটনাকে আলাদা মনে হলেও প্রকৌশল ও অপারেশনাল দৃষ্টিকোণ থেকে এদের মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র আছে—তা হলো মানুষ, যান ও অবকাঠামো যেখানে একসাথে মিশেছে, সেখানেই ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার একটি প্রধান কারণ হলো স্পিড-ম্যানেজমেন্ট বা গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা। ঈদের সময় মহাসড়কে তীব্র যানজটের পর রাস্তা কিছুটা ফাঁকা পেলেই চালকরা ‘টাইম রিকভারি’ করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এই অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং এবং বেপরোয়া ঝুঁকি নেওয়াই মূলত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের মিশ্র ট্রাফিক ব্যবস্থা। একই রাস্তায় যখন বাস, ট্রাকের পাশাপাশি মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক চলে, তখন গতির এই ভিন্নতা চরম ঝুঁকি তৈরি করে। বাসের টিকিট না পাওয়া বা অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেলে দূরপাল্লার যাত্রা করছেন, যা ২০২৬ সালের ঈদযাত্রাতেও দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানকে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো মালিকানা পদ্ধতির বিশৃঙ্খলা। এখানে একজন বাসের মালিক যেমন অপারেটর, তেমনি শত বাসের মালিকও একইভাবে ব্যবসা করছেন। ফলে যাত্রী ধরার এক অসুস্থ ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এই প্রতিযোগিতার কারণেই সড়কে গতি বাড়ে, টার্মিনালে বিশৃঙ্খলা হয় এবং ফেরিঘাটে অপারেশনাল ঝুঁকি তৈরি হয়। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে ‘বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি’ এবং ‘নৌ রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি’ সিস্টেম চালুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। অর্থাৎ নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট সংখ্যক অনুমোদিত অপারেটর এবং একীভূত টিকিটিং ব্যবস্থা থাকলে এই প্রাণঘাতী প্রতিযোগিতা কমবে।

রেলপথের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো রেলক্রসিং। এটি এমন একটি স্পর্শকাতর জায়গা যেখানে ভুলের সুযোগ শূন্য হওয়া উচিত। অথচ আমরা এখনো মান্ধাতা আমলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও দুর্বল তদারকির ওপর নির্ভর করছি। একইভাবে নৌ-পথেও সমস্যাটি কাঠামোগত। টার্মিনালগুলোর ডিজাইন ও অপারেশনাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত নড়বড়ে। নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ছোট নৌযান নিষিদ্ধ করার আইনগুলো কাগজে থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। তাই ঈদযাত্রার এই মৃত্যুমিছিল থামাতে হলে শুধু মৌসুমি প্রস্তুতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।