বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য জেলা বান্দরবান তার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। এখানকার উঁচু পাহাড়ের চূড়া ভেদ করে মেঘের আনাগোনা যেন প্রকৃতির এক মায়াবী খেলা। ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি এই জনপদকে এক জীবন্ত ক্যানভাসে পরিণত করেছে, যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
মার্মা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যাসহ ১১টি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আবাসস্থল বান্দরবান। পাহাড়ের ঢালে তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘জুম’ চাষ পদ্ধতি কেবল কৃষিকাজ নয়, বরং তা তাদের জীবন সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জুমের ফসল, ভুট্টা এবং পাহাড়ি শাকসবজির সুগন্ধে মুখরিত থাকে পাহাড়গুলো। তাদের নিপুণ হাতে বোনা ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র এবং বিন্নি চালের পিঠার স্বাদ পর্যটকদের এক আদিম ও অকৃত্রিম অভিজ্ঞতার সন্ধান দেয়।
বান্দরবান নামের উৎপত্তিও এক আকর্ষণীয় লোককথার সঙ্গে জড়িত। মার্মা ভাষায় এর আদি নাম ছিল ‘ম্যাঅকছি ছড়া’। ‘ম্যাঅক’ শব্দের অর্থ বানর এবং ‘ছি’ শব্দের অর্থ বাঁধ। কিংবদন্তী অনুসারে, একসময় শহরের প্রবেশমুখে একটি পাহাড়ি ছড়ায় অসংখ্য বানর লবণ খেতে আসত। প্রবল বর্ষায় যখন ছড়ার পানি বেড়ে যেত, তখন বানরের দল একে অপরের হাত ধরে সারিবদ্ধভাবে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করে ছড়া পার হতো। বানরের এই অদ্ভুত দৃশ্য থেকেই স্থানটি ‘বান্দরবান’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
বান্দরবানের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘বোমাং সার্কেল’-এর ঐতিহ্য। ১৯০০ সালের চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন অনুসারে এই অঞ্চলটি বোমাং রাজার শাসনাধীন ছিল। ১৯৮৪ সালে বান্দরবান পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে শত বছরের পুরোনো বোমাং রাজবাড়ি, যা এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। এখানকার ঐতিহ্যবাহী ‘রাজ পুণ্যাহ’ উৎসব আজও এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে পালিত হয়।
বান্দরবানকে প্রায়শই ‘বাংলাদেশের ছাদ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, কারণ দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিনডং ও কেওক্রাডং এখানেই অবস্থিত। কেবল পাহাড় নয়, এটি ঝর্ণারও এক অপূর্ব রাজ্য। জাদিপাই, নাফাখুম এবং অমিয়াখুমের শীতল জলধারা পর্যটকদের ক্লান্তি নিমেষেই দূর করে দেয়। স্বচ্ছ পানির সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে আপন ছন্দে বয়ে চলে। নীলগিরি বা নীলাচলের মেঘেদের সমুদ্র এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তির জন্য ‘বুদ্ধ ধাতু জাদী’ বা স্বর্ণমন্দির পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এছাড়াও, রহস্যময় বগা লেকের নীল জল তার দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে রাখে।
এই জেলা প্রাকৃতিক সম্পদের এক বিশাল ভাণ্ডার। দিগন্তবিস্তৃত গহিন অরণ্য থেকে আহরিত সেগুন, গামারি, গর্জন এবং শীল কড়ইয়ের মতো মূল্যবান কাঠ যুগ যুগ ধরে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর মাধ্যমে বিপণন হয়ে আসছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রিপোর্টারের নাম 
























