## জ্বালানি তেল নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়, জনমনে চরম আতঙ্ক
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে সাশ্রয়ী ব্যবহারের আহ্বান এবং সীমিত মজুতের তথ্যের পর দেশজুড়ে পেট্রোলপাম্পগুলোতে উপচেপড়া ভিড় ও হাহাকার দেখা যাচ্ছে। যানবাহন চালক ও মালিকদের মধ্যে চলছে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে এক অভূতপূর্ব অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। আগাম সতর্কতার অংশ হিসেবে সরকার জনসাধারণকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সীমিত মজুতের বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে উল্লেখ করে যানবাহন মালিকদের রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সংগ্রহের নির্দেশনা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে পেট্রোলপাম্পগুলোতে যানবাহন চালক ও মালিকদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও হাহাকার দেখা যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের জন্য পেট্রোলপাম্পগুলোর উভয় পাশে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ গাড়ির লাইন তৈরি হয়েছে। অনেক পাম্পে আতঙ্কের বশে মালিকরা তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন। পাম্প মালিকদের মতে, সরকারের সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বানের পর গত দুদিনে জ্বালানি তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, কোথাও কোথাও তা ১০ গুণেরও বেশি। সবাই তাদের গাড়ির জ্বালানি ট্যাংক সম্পূর্ণ ভর্তি করে নিতে চাইছে। তেল না পেলে অনেক ক্ষেত্রে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে, যা অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।
তবে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ১০ দিনের ডিজেল, ১৭ থেকে ১৮ দিনের অকটেন, ১৩ দিনের পেট্রোল, ৯০ দিনের ফার্নেস অয়েল এবং ৫২ দিনের জেট ফুয়েল মজুত আছে। এছাড়াও, ৩০ হাজার ও ২৭ হাজার টন জ্বালানি তেল বহনকারী আরও দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে এসে পৌঁছেছে এবং আরও কয়েকটি জাহাজ পথে রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের সূত্রমতে, জ্বালানি তেলের পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেও সরকার বাড়তি দামে স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পবিত্র রমজান মাস এবং সেচ মৌসুমকে সামনে রেখে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার এই খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক জানিয়েছেন, চলতি মার্চ মাসে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং এপ্রিলের পরিকল্পনাও চলছে। সরকার এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা আরও জানান, স্বাভাবিক সময়ে দুই কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও, বর্তমানে একই পরিমাণ এলএনজি কিনতে দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে, যা প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়তি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গানভোরের কার্গোটি ১৫ থেকে ১৬ মার্চ এবং অপর প্রতিষ্ঠান ভিটলের কার্গোটি ১৮ থেকে ১৯ মার্চ দেশে পৌঁছাবে।
পাম্পগুলোতে তেল না পাওয়ার অভিযোগ ও মালিকদের বক্তব্য:
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুতের ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও, অনেক পেট্রোলপাম্পে ক্রেতারা ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল পাচ্ছেন না। ক্রেতাদের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক এবং অতিরিক্ত পরিমাণে জ্বালানি তেল সংগ্রহের প্রবণতাকেই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন পাম্প মালিকরা। তারা বলছেন, গত শুক্রবার ও শনিবার ডিপো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। যদিও এটি একটি পুরোনো সিদ্ধান্ত, তবুও এই দুদিনে জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল অস্বাভাবিক, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি।
পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাজ্জাদ করিম কাবুল এই পরিস্থিতিকে “গ্রাহকদের অতিমাত্রার পাগলামি” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “মানুষ এতটা পাগল হলো কেন বুঝতে পারছি না। সবার মধ্যেই একটি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে কেয়ামত খুব কাছেই চলে এসেছে, জ্বালানি তেল না পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।” তিনি আরও জানান, সারা দেশ থেকে আসা সংবাদ সুখকর নয়; অনেক জায়গায় পাম্প মালিকদের ওপর হামলা হয়েছে এবং তারা নাজেহাল হয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে অনেক পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যদিও জ্বালানির কোনো সংকট নেই।
সাজ্জাদ করিম কাবুল উল্লেখ করেন যে, সরকার মোটরসাইকেলের জন্য দুই লিটার তেলের রেশনিং করে দিলেও, সবাই ট্যাংক ফুল করে তেল নিতে আসছে। নিষেধ করলে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে এবং অনেকে স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে ফোন করিয়ে তেল নিচ্ছেন। গাড়ির মালিকদের আচরণ আরও খারাপ বলেও তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জ্বালানি মন্ত্রীর বৈঠক ও সরকারি পদক্ষেপ:
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এবং দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি, মজুত ও সরবরাহের সবশেষ অবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জ্বালানি মন্ত্রী। বৈঠকে জ্বালানি পণ্য আমদানি করতে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প দেশ খোঁজার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাংবাদিকদের জানান, দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি উল্লেখ করেন যে, অনেকেই আশঙ্কা থেকে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও আতঙ্কিত করে তুলছে। মন্ত্রী জানান, বর্তমান মজুত সন্তোষজনক এবং ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সংকট এড়াতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পরিকল্পনাও প্রস্তুত রেখেছে।
মন্ত্রী গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান এবং মিডিয়াকে এই বার্তা দেওয়ার অনুরোধ করেন যে, তাড়াহুড়া করে তেল কেনার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে মজুত আছে, আমরা নিয়মিত পেট্রোলপাম্পে তেল সরবরাহ করছি। মানুষ তেল নিতে গেলে তেল পাবে। সারা রাত লাইন দিয়ে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।”
কিছু পেট্রোলপাম্পে তেল না পাওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল সরবরাহ করছে। কোনো পাম্প যদি দ্রুত সব তেল বিক্রি করে ফেলে, তাহলে তাদের পরবর্তী সরবরাহ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তিনি আরও বলেন, কোনো পাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি লাভের আশায় তেল বিক্রি বন্ধ রাখছে কিনা, তা তদন্তের মাধ্যমে দেখা হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার মোবাইল কোর্ট পরিচালনারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে দুই লিটার করে তেল দেওয়ার রেশনিং আপাতত বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও তিনি জানান।
ইস্টার্ন রিফাইনারি ও এলএনজিবাহী জাহাজ:
দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড কাঁচামালের (অপরিশোধিত তেল) কোনো সংকটে নেই। প্রতিষ্ঠানটির কাছে এখনো অপরিশোধিত তেলের যে মজুত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী ৩ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যক্রম চালানো যাবে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য আমদানির এক লাখ টন তেলভর্তি একটি জাহাজ সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে অপেক্ষা করছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে জাহাজটি আটকা পড়েছে, তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেটি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবে। এছাড়া, আরব আমিরাত থেকে আরও এক লাখ অপরিশোধিত তেল নিয়ে একটি জাহাজ ২১ মার্চ বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রমতে, হরমুজ প্রণালির বিপজ্জনক নৌপথ পাড়ি দিয়ে কাতার থেকে এক লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামে দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া, ‘আল গালায়েল’ ও ‘লুসাইল’ নামে আরও দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে, ‘লিবারেল’ নামে একটি এলএনজিবাহী জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরে আটকা পড়ে আছে। ওমানের সোহার বন্দর থেকে ‘সেভান’ ও ‘জি ওয়াইএমএম’ নামের আরও দুটি জাহাজে করে প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি আসছে, যা নিরাপদ পথে বাংলাদেশ অভিমুখে রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 






















