প্রতি বছর বইমেলা এলেই পাঠক ও প্রকাশকদের মনে নানা প্রশ্ন উঁকি দেয়। তবে এই প্রশ্নগুলোর গভীরে গিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলেছেন প্রখ্যাত লেখক ও অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। তার মতে, বইমেলা এখন কেবল একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, বরং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নিম্নমানের বইয়ের ছড়াছড়ি এবং নিরাপত্তার শঙ্কা নিয়ে এক জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে।
আসন্ন বইমেলায় তার দুটি নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের ধ্রুপদী গ্রন্থ ‘মেডিটেশনস’, যা প্রকাশ করছে বাংলা একাডেমি। এছাড়াও নিকোস কাজানজাকিসের বিশ শতকের প্রথম দিকের উপন্যাসিকা ‘সাপ ও শাপলা’ আসছে বেঙ্গল বুকস থেকে। চল্লিশ বছর আগে প্রকাশিত মিখাইল শলোখভের প্রথম জীবনের গল্পের পুনর্মুদ্রণও বের হচ্ছে নটিলাস প্রকাশনী থেকে।
বইমেলার আয়োজন নিয়ে শুরু থেকেই যে অনিশ্চয়তা ছিল, সে প্রসঙ্গে খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, “মেলা কর্তৃপক্ষ এখানে অসহায়। আমাদের দেশে সবক্ষেত্রে সবকিছুই রাজনীতি দ্বারা বিবেচিত, বাধাগ্রস্ত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। ওয়ার্ডসওয়ার্থের বিখ্যাত সনেট ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ টু মাচ উইথ আস’-এর অনুকরণে বলতে বাধ্য হচ্ছি, ‘পলিটিক্স ইজ টু মাচ উইথ আস’।”
মেলার সময় কমিয়ে আনা এবং রমজানের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে বই কেনাবেচায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন। তার আশঙ্কা, “গত বছরের চেয়েও কম বিক্রি হতে পারে, যা প্রকাশকদের হতাশা আরও তীব্র করবে।”
নিরাপত্তার প্রসঙ্গে ইলিয়াস বলেন, “আশঙ্কা তো আছেই। কোনো বইকে কেন্দ্র করে মব হামলা হলেও আমি অবাক হব না। সরকারের দুর্বলতার সুযোগে যদি বিশৃঙ্খলা হয়, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।” তিনি আরও যোগ করেন, বইমেলায় তরুণরা ঘুরেফিরে ছবি তুললেও বই কেনায় তাদের আগ্রহ কম দেখা যায়; মূলত বাবা-মা-ই বাচ্চাদের জন্য বই কেনেন। একটি সুন্দর ও নিরাপদ বইমেলা আয়োজনের জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা জোরদার করার পাশাপাশি উত্তম পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনীর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
বইয়ের মান ও সম্পাদনার বিষয়ে তিনি প্রকাশকদের সচেতনতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইলিয়াসের পর্যবেক্ষণ, “প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু এর অধিকাংশই অপাঠ্য কিংবা নিম্নমানের। মানসম্মত না হলে এত বই ছাপবার দরকার কী?” তবে তিনি আশাবাদও ব্যক্ত করেন, “তবু ব্যবসার খাতিরে বলতে হয় ছাপুক না, কে জানে এই অপাঠ্যের ভস্মেই হয়তো মিলবে দুচারটে অমূল্য রতন।”
পাঠক-লেখকের সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেলায় জনপ্রিয় লেখকদের নতুন বই এলেই কেবল তাদের সঙ্গে পাঠকদের দেখা-সাক্ষাৎ হয় এবং লেখকরা তখন বইয়ে অটোগ্রাফ দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
সামগ্রিকভাবে, খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের মতে, বইমেলা তার স্বকীয়তা ও মূল উদ্দেশ্য হারাচ্ছে। তবে এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তিনি অপাঠ্য বইয়ের স্তূপ থেকে অমূল্য সাহিত্য খুঁজে পাওয়ার এক সুপ্ত আশার কথা শোনান।
রিপোর্টারের নাম 





















