রাত গভীর। সারার ঘরে কেবল সিগারেটের ধোঁয়া। বাইরের আলো জানালার পর্দায় পড়েছে, ছায়াগুলোও অস্থির। একাকিত্ব কি মুক্তির আরেক নাম? সারা জানে না। সে জানে কেবল, বেঁচে থাকা মানেই নিজের পথ খুঁজে নেওয়া, আর এই সমাজে নারীর জন্য সেই পথটা সবসময় রক্তাক্ত। দূর ইংল্যান্ডে, অন্য এক সমাজে, এলিজাবেথেরও হয়তো এমনই এক গভীর রাত ছিল, যেখানে সে নিজের মনকে প্রশ্ন করেছিল; একজন নারী কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে? প্রেমের জন্য আপোশ করবে, না নিজের আত্মসম্মান ধরে রাখবে?
দিলারা হাশেমের ‘আমলকীর মৌ’ উপন্যাসের সারা এবং জেন অস্টিনের ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’-এর এলিজাবেথ—দুই নারী, দুই কাল, দুই ভূগোল। অথচ তাদের সংগ্রাম যেন একই সুতোয় গাঁথা। নারী কি আসলেই নিজের জন্য বাঁচতে পারে, নাকি সমাজ তাকে কোনো না কোনোভাবে শৃঙ্খলিত করে রাখে? এই প্রশ্নটিই বারবার ঘুরেফিরে আসে তাদের জীবনের গল্পে।
বিদ্রোহের পথ: সারার স্বাধীনতা
সারা, যে কোনো শেকল মানতে চায়নি। সমাজ তাকে যা শেখাতে চেয়েছিল – নারী মানে দায়িত্ব, নারী মানে সংসার, নারী মানে শৃঙ্খল – সে সবকিছু ছুড়ে ফেলেছিল। স্বামী, সন্তান, সামাজিক প্রতিষ্ঠা – সব ছেড়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছে। রাত-বিরেতে রিকশায় ঘুরেছে, ইচ্ছে হলে পান করেছে, বন্ধুদের বাড়িতে থেকেছে, কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে কারও কাছে জবাবদিহি করেনি। তার কাছে সমাজটা ছিল একটা খাঁচার মতো, আর সে বেছে নিয়েছিল খাঁচার বাইরে আসার পথ।
কিন্তু সমাজ কি তাকে ছেড়েছে? “মেয়েটার লজ্জা নেই!” – শুনতে হয়েছে তাকে। “তোমার মতো মেয়ের বাবা বলে পরিচয় দিতে লজ্জা করে!” – বাবার কণ্ঠস্বর তীব্র হয়ে উঠেছে। তবুও, সে নিজের পথে দাঁড়িয়ে থাকে। সারা বিশ্বাস করে, ভালোবাসা আর স্বাধীনতা সবসময় একসঙ্গে যায় না। সে শর্তহীন প্রেম চায়, কিন্তু পুরুষদের ভালোবাসার মধ্যে সে দেখে এক অনিবার্য দাবির ছায়া – “এত রাতে বাইরে যেও না,” বা “কেন এভাবে থাকতে চাও?” তার কাছে, মুক্তি মানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকে ঘোষণা করা।
তবে এই স্বাধীনতার মূল্য তাকে দিতে হয়েছে একাকিত্বের রূপে। যখন জীবন একটার পর একটা মৃত্যু নিয়ে এসেছে – মায়ের মৃত্যু, বোনের আত্মহত্যা, প্রেমিকের মৃত্যু – তখন কি সে সত্যিই ভাবেনি, সমাজের নিয়মগুলো এত সহজে ভাঙা যায় না? সমাজ তার বিদ্রোহকে মেনে নেয়নি, বরং তাকে “অস্বাভাবিক” তকমা দিয়েছে। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সে নিজের শরীর ও মনকে সম্পূর্ণ নিজের বলে ঘোষণা করেছে, কিন্তু শেষপর্যন্ত ক্লান্ত হয়েছে সমাজের নিন্দা, অবজ্ঞা আর চাপা প্রতিহিংসার কাছে।
সহাবস্থানের কৌশল: এলিজাবেথের আত্মমর্যাদা
অন্যদিকে, জেন অস্টিনের এলিজাবেথ বেনেট এক ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিল। তার সমাজও কম শাসন করেনি। “একটা ভালো বিয়ে করাই তোমার জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত!” – মা প্রতিদিন বলে গেছে। “নারীর কাজ সংসার সাজানো, বুদ্ধি দিয়ে সমাজ পাল্টানোর চেষ্টা করা নয়!” – সমাজের মানুষ চোখ পাকিয়ে তাকিয়েছে। কিন্তু এলিজাবেথ মাথা নিচু করেনি। সে ভালোবাসাকে গ্রহণ করেছে, তবে আত্মসম্মানের শর্তে। মিস্টার কলিন্সের মতো কাউকে বিয়ে করলে জীবনটা নিরাপদ হতো, কিন্তু সে রাজি হয়নি। মি. ডার্সির সম্মান অর্জন না করা পর্যন্ত তাকে গ্রহণ করেনি।
এলিজাবেথ সমাজকে পাল্টানোর চেষ্টা করেনি, বরং সমাজের কাঠামোর মধ্যেই নিজের স্বাধীনতা কুড়িয়ে নিয়েছে। সে এমন একজন জীবনসঙ্গীকে বেছে নিয়েছে যে তাকে সম্মান করবে, নিয়ন্ত্রণ নয়। ধৈর্য মানে অন্যায়ের সঙ্গে আপোশ করা নয় – এলিজাবেথ তার জীবনে এই নীতিই অনুসরণ করেছে। সে সমাজকে সময় দিয়েছে, যাতে তারা তাকে মেনে নিতে শেখে। তার কৌশল ছিল বেশি বাস্তববাদী; সমাজের ভেতর থেকে লড়াই করে নিজের জায়গাটা খুঁজে নেওয়া।
মুক্তির দ্বিধা: কে বেশি স্বাধীন?
তাহলে কে জয়ী? সারা, যে সমাজের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল? নাকি এলিজাবেথ, যে সমাজের ভেতর থেকেই নিজের জন্য স্থান করে নিয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোই নারী স্বাধীনতার বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। সারা হয়তো রাতের নির্জনতায় নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে ভাবে, “আমি ঠিক করেছিলাম তো?” আর এলিজাবেথ হয়তো তার নতুন জীবনের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি হারিনি। আমি নিজের মতো করেই জিতেছি।”
দিলারা হাশেমের ‘আমলকীর মৌ’ উপন্যাসটি ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয়, যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হবার সাত বছর হয়ে গেছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কি সবাই মুক্তি পেল? নারীরা কি স্বাধীন হলো? সমাজের মন-মানসিকতা কি বদলেছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যেন এগিয়ে আসে ‘আমলকীর মৌ’। উপন্যাসটি নিছক এক সামাজিক উপন্যাস নয়, নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকও বটে। এটি মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কঠিন কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর গল্প।
সারা এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র, যে আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিমতী, উচ্চশিক্ষিত। তার সমস্যা একটাই – সে রূপসীও বটে। যেন রূপের সঙ্গে মেধার সংযোগ মানেই এক অমার্জনীয় অপরাধ। সমাজ তাকে ভয় পায়, কারণ সে তৈরি সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে দিতে চায়। সে নারীদের ‘নারী’ করে তোলার চতুর কারসাজি বোঝে এবং তা প্রত্যাখ্যান করে। ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন, নারী স্বাধীনতার জন্য তার নিজস্ব একটা কামরা দরকার। কিন্তু একবিংশ শতকে এসে শুধু একটা কামরায় আর হচ্ছে না; দরকার হচ্ছে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টও। অর্থনীতিই যে ক্ষমতা দেয়, সেই সত্যটাই যেন আবার নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সারার গল্প।
তবে শুধু অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত থাকলেই কি সমাজের সব আচার-সংস্কার ভেঙে ফেলা যায়? যায় না। সারা সেটাই টের পায় প্রতিদিন। তার স্বাধীন জীবন তাকে সমাজ ও পরিবারের কাছে এক ‘অপ্রয়োজনীয়’ মানুষ করে তুলেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়; এই সমাজই রাতের অন্ধকারে তাকে সবচেয়ে ‘প্রয়োজনীয়’ বানিয়ে ফেলে! যেসব পুরুষ ঘরের নারীকে আটকে রাখতে চায়, তারাই আবার অন্যের ঘরের নারীকে টেনে বের করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সমাজের এই দ্বিচারিতা সারার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শেষপর্যন্ত সারা কি সত্যিই মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছে? যখন সে বলে, “I will marry again. I must get out of it.” তখন মনে হয়, আসলে কোন বৃত্তের বাইরে বেরোতে চাইছে সে? মুক্তির জন্য কি বিয়ে আবারও এক সমাধান হতে পারে? কোনো পুরুষ কি কখনো মুক্তির জন্য বিয়ের কথা ভাবে? তাহলে সারার মুক্তির সংজ্ঞাটা কি সত্যিই স্পষ্ট? দিলারা হাশেম নারীকে শুধু নারী হিসেবে নয়, এক ধরনের শ্রেণি হিসেবেও কল্পনা করেছেন, যাদের অবস্থান প্রলেতারিয়েতদের থেকে খুব একটা আলাদা নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বহু উপায়ে তাদের পথ আটকে রেখেছে।
‘আমলকীর মৌ’ উপন্যাসটি অধিকার আদায়ের সংগ্রাম নয়, এটি এক গভীর আত্ম-অনুসন্ধানেরও গল্প। সমাজ নারীর জন্য যে কাঠামো তৈরি করেছে, সেই কাঠামোর ভেতরে থেকেই কি স্বাধীন হওয়া সম্ভব, নাকি মুক্তির জন্য সমাজকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে হবে? এই প্রশ্নই যেন এক ভিন্ন মাত্রায় এসে দাঁড়ায় সারা ও এলিজাবেথের চরিত্রের ভেতর দিয়ে। মুক্তির সংজ্ঞা একরকম নয়, বরং তা প্রতিটি নারীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্যেই ধরা দেয়। নারী কি আসলেই নিজের জন্য বাঁচতে পারে? এই অম্লমধুর প্রশ্নের উত্তর হয়তো কখনোই সহজ নয়, কিন্তু এই আলোচনা চিরন্তন।
রিপোর্টারের নাম 
























