ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত হামলার মুখে এক ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংকটের আশঙ্কা করছে ইরান। তেহরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এখন দেশটিতে একটি সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য জোরদার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো এই তথ্য জানিয়েছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধের পর থেকেই তেহরান উপলব্ধি করেছিল যে, অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় কোনও সংঘাত অনিবার্য। সেই থেকেই তারা সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ সামাল দেওয়ার কৌশল সাজাতে শুরু করে।
আইআরজিসির একটি সূত্র জানায়, যুদ্ধের পর দেশটির নিয়মিত সেনাবাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ডকে পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইরানে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, যদি কোনও কারণে কেন্দ্রীয় কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আঞ্চলিক ইউনিটগুলো যেন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ও লড়াই চালিয়ে যেতে পারে।
সূত্রটির ভাষ্যমতে, ‘পরবর্তী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরাক বা সিরিয়ার মতো পরিস্থিতি (অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা) তৈরি করার চেষ্টা করবে, এটি আমাদের কাছে স্পষ্ট ছিল। তাই যুদ্ধের পরপরই আমরা স্বাধীন কমান্ড সেন্টার তৈরি করেছি এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে এমন প্রদেশগুলোতে অতিরিক্ত স্থলসেনা মোতায়েন করেছি।’ গত সেপ্টেম্বর থেকে সামরিক মহড়ার নামে পর্যায়ক্রমে এই বাড়তি সেনা মোতায়েন শুরু হয়।
ইরানি কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজর এখন কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলের দিকে। তেহরান আশঙ্কা করছে, ইরাকের ভেতরে থাকা ইরানি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সহায়তায় ইরানে হামলা চালাতে পারে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি গত ২৮ ডিসেম্বর এক বার্তায় কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো যেন মনে না করে তারা কোনও সুযোগ পাবে। আমরা তাদের বরদাশত করব না।’
ইতোমধ্যে ইরাকে অবস্থানরত ছয়টি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে একটি কৌশলগত জোট গঠন করেছে। অন্যদিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া হামলায় তেহরানের বাইরে সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে কুর্দি শহরগুলো। মারিভান, সানান্দাজ, সাক্কেজ এবং কেরমানশাহর মতো শহরগুলোতে আইআরজিসি ও সেনাবাহিনীর ঘাঁটির পাশাপাশি পুলিশ স্টেশন এবং পৌরসভাগুলোতেও বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
পশ্চিমের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমের তেল সমৃদ্ধ খুজেস্তান প্রদেশেও সামরিক কমান্ডকে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সেখানে আহওয়াজিয়া নামক একটি আরব বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে, দেশের দরিদ্রতম প্রদেশ সিস্তান-বালুচিস্তানেও গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাদক চোরাচালান এবং সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার কারণে এই অঞ্চলটি আগে থেকেই অস্থিতিশীল। ইরানের প্রয়াত জেনারেল কাসেম সোলাইমানি একসময় এই অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযান চালিয়েছিলেন।
গৃহযুদ্ধ মোকাবিলা কৌশলের অংশ হিসেবে আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। শহর এলাকায় নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব এখন তাদের কাঁধে। তেহরান ও ইস্পাহানের মতো বড় শহরগুলোতে বর্তমানে বাসিজ সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
তেহরানে একটি হামলার পর ইরানিদের প্রার্থনা। ছবি: ওয়ানা
আগে সাধারণত নিরস্ত্র অবস্থায় দেখা গেলেও, বর্তমানে বাসিজ সদস্যরা সাধারণ পোশাকে হাতে কালাশনিকভ রাইফেল নিয়ে টহল দিচ্ছেন। পুলিশি অবকাঠামোর ওপর বিমান হামলার কারণে সরকার এখন শহর নিয়ন্ত্রণে এই মিলিশিয়া বাহিনীর ওপর বেশি নির্ভর করছে।
ইরানের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে এক ভিডিও বার্তায় সমর্থকদের রাজপথে ও মসজিদে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘শত্রুরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে, কিন্তু আমাদের দুর্গ হলো মসজিদ এবং শহরের মোড়গুলো। কালো পোশাক পরে সবাইকে বিপ্লবের আদর্শে অবিচল থাকতে হবে।’
তার এই ‘কালো পোশাকের’ আহ্বান ঐতিহাসিকভাবে উমাইয়া খিলাফতের পতন ঘটানো ‘সিয়াহ জামেগান’ আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হাসান খোমেনির এই বার্তা এবং বাসিজ ও সেনাবাহিনীর বর্তমান তৎপরতা প্রমাণ করে যে, ইরান সরকার দেশের ভেতরে যে কোনও ধরনের গণঅভ্যুত্থান বা সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটিতে অন্তত ১ হাজার ২৩০ জন নিহত হয়েছেন।
রিপোর্টারের নাম 





















