জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম এবং দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ দুই নেত্রীকে (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) ছাড়া প্রথম নির্বাচন—যেটি ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে বলে একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস—সেই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। আপনি যখন লেখাটি পড়ছেন, ততক্ষণে অনেকেই ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আগামীকাল অর্থাৎ শুক্রবার দুপুরের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পাওয়া যাবে।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও আধুনিক অটোমেশন সিস্টেম ও একাধিক ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের কারণে দ্রুততম সময়ে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। যদিও দুর্গম কিছু এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে ফলাফল পেতে সামান্য বিলম্ব হতে পারে, তবে কোনোভাবেই তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনি পরিবেশ অনেক বেশি চমৎকার ও শান্তিপূর্ণ রয়েছে।
একই দিনে দুই ভোট
এবারের নির্বাচনে ফলাফল হবে দুটি। কারণ এবার একই দিনে দুটি নির্বাচন হচ্ছে। একটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্যটি জুলাই সনদ প্রশ্নে গণভোট।
ভোটারদের হাতে দুটি ব্যালট পেপার দেওয়া হচ্ছে। একটিতে তিনি জাতীয় নির্বাচনে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। আরেকটি জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোয় তার সম্মতি আছে কিনা, সেই প্রশ্নে হ্যাঁ বা না সিল মারবেন। যদিও এই গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি ও সংশয়ের অন্ত নেই। এমনকি বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য সরকারের তরফে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া কাঙ্ক্ষিত ছিল, তাও চোখে পড়েনি। বরং ব্যালট পেপারে হ্যাঁ ও না দুটি অপশন থাকলেও সরকার শুরু থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে প্রধান উপদেষ্টা নিজে এবং তার উপদেষ্টাগণ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর সাফাই গেয়েছেন, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মচারীদের হ্যাঁ বা না ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোকে আইনত দণ্ডনীয় বলেছে। তার মানে হ্যাঁ-না ভোটের প্রশ্নে সরকারের মধ্যেই দ্বিধা ও বিভ্রান্তি ছিল, আছে।
বাংলাদেশে অতীতের তিনটি গণভোটের অভিজ্ঞতা বলছে, গণভোটের ফলাফল আসলে পূর্বনির্ধারিতই থাকে। অর্থাৎ হ্যাঁ না ভোটে সাধারণত হ্যাঁ জয়ী হয়। কারণ ‘হ্যাঁ’ জিতলেই কেবল সরকার তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারে বা নিজের কর্মকাণ্ডে জনগণের বৈধতা বা সম্মতি আদায় করতে পারে।
তবে এবারের গণভোট যেহেতু হচ্ছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে এবং একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে, সুতরাং এবার গণভোটের ফলাফল নির্ধারিত নয় বা গণভোটের জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে, এটিই প্রত্যাশিত। যেসব প্রশ্নে গণভোট হচ্ছে, আশা করা যায় দেশের অধিকাংশ মানুষই সেসব সংস্কারের পক্ষে। সংস্কার মানে যদি হয় ইতিবাচক পরিবর্তন, তাহলে সেই পরিবর্তন কে না চায়? কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এই সংস্কারের পক্ষে জনগণের মতামত নেওয়া হচ্ছে সেটি ত্রুটিপূর্ণ। অথচ এই ত্রুটি এড়িয়ে আগে নির্বাচন, তারপর সংসদে সংস্কার প্রস্তাবগুলো পাস করে গণভোটে দিলে এই বিতর্ক এড়ানো যেতো। তার আগে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে জনগণকে সুস্পষ্টভাবে জানানো এবং এগুলো যে সত্যিই দেশের কল্যাণের জন্য করা হচ্ছে, সেই বিশ্বাস জনমনে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত ছিল। কেননা অধিকাংশ মানুষের কাছেই সংস্কার প্রস্তাবগুলো পরিষ্কার নয়। উপরন্তু এই ধারণাও জনমনে আছে যে, জুলাই সনদের মূল লক্ষ্য মুক্তিযেুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানকে পাল্টে দেওয়া এবং জুলাই অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। জুলাইযোদ্ধাদেরকে মুক্তিযাদ্ধাদের সমান করে তোলার চেষ্টা ইত্যাদি। সেইসাথে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ফ্যাক্টগুলোর বাইরে গিয়ে নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা গত দেড় বছর ধরে চলছে, সেটির আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য গণভোট নেওয়া হচ্ছে—এমন ধারণাও জনমনে আছে। কিন্তু সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে জুলাই সনদ বা গণভোটের ব্যাপারে মানুষের মনে পরিষ্কার ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এটা ধারণা করাই যায় যে, বিপুল সংখ্যক মানুষ না বুঝেই গণভোটে হ্যাঁ বা না দেবেন। অনেকে পরিচিতজনের কথায় হ্যাঁ বা না দেবেন। অর্থাৎ সেখানে তার নিজের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে না। অনেকে হয়তো জটিলতা এড়ানোর জন্য গণভোটে অংশই নেবেন না। কেবল জাতীয় নির্বাচনের ব্যালটে সিল দেবেন।
এবার জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট নেওয়ার পেছনে সরকারের হয়তো এরকম একটি উদ্দেশ্য ছিল যে, জাতীয় নির্বাচনের পরে আবার একটি গণভোটে খুব বেশি মানুষ সাড়া দেবে না। তাই যেহেতু জাতীয় নির্বাচনের মানুষ ভোট দিতেই যাবে অতএব একই দিনে গণভোটের ব্যপারেও তাদের মতামত নেওয়া যায়। কিন্তু কাজটা সহজ করতে গিয়ে একটা বড় ধরনের ত্রুটি জিইয়ে রাখা হলো যা ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে।
তারপরও দেশ ও মানুষের কল্যাণেই এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে—এই বিশ্বাস থেকে প্রত্যাশা করা যায় যে, প্রধান উপদেষ্টার ভাষায় এবার ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’ না হলেও অন্তত একটা ভালো নির্বাচন হবে। প্রসঙ্গত, গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ভবনে উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য আয়োজিত ব্রিফিং শেষে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলারও বলেছিলেন, ‘এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন।’
ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন
ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন বলতে আসলে কী বুঝায়—সেটি অনেক বড় তর্ক। সেই তর্কে না গিয়েও এটা বলা যায় যে, ভালো নির্বাচন মানে হলো তফসিল ঘোষণার পর আগ্রহী সব প্রার্থী নির্বিঘ্নে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা রাজনৈতিক কারণ বা অন্য কোনোভাবে প্রভাবিত হবেন না। প্রতীক বরাদ্দের পরে প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে প্রচার-প্রচারণা চালাবেন এবং সেখানে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে যা নিশ্চিত করবে নির্বাচন কমিশন। কোনও প্রার্থীকে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার বা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে সরকারের কোনও বাহিনী চাপ প্রয়োগ করবে না। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ভোটের একটি সুন্দর ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে। ভোটের দিন ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্ভয়ে ফিরবেন। জাল ভোট, কেন্দ্রদখল বা সহিংসতা হবে না। ভোট গণনায় কোনও ধরনের কারচুপি হবে না। কোনও নির্দিষ্ট প্রার্থীকে জয়ী করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা উৎসাহ দেখাবেন না বা এ বিষয়ে তাদের ওপর কোনও ধরনের রাষ্ট্রীয় চাপ থাকবে না। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থী সেটি মেনে নেবেন।
অনেক সময় ভোট সুষ্ঠু বা শান্তিপূর্ণ হলেও সেখানেও কারচুপি হতে পারে। ভোটের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। সুতরাং সহিংসতামুক্ত নির্বাচন মানেই সেটি গ্রহণযোগ্য ভোট নাও হতে পারে। একটি নির্বাচনকে তখনই ভালো নির্বাচন বলা যায় যখন সেটি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশে বিগত দিনে হওয়া ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া আর কোনও নির্বাচনই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। ওই তিনটি নির্বাচন নিয়েও পরাজিত দলের পক্ষ থেকে কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু ভালো নির্বাচনের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেগুলো ছিল গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য।
গত তিনটি নির্বাচনে যে মানুষেরা ভোট দিতে পারেনি বা ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি, তারা এবার নিজের পছন্দের প্রার্থীকে কোনও ধরনের ভয়-ভীতি ও চাপমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারলেই খুশি হবে। কেননা সংবিধান যে জনগণকে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক বলে ঘোষণা করেছে, সেই মালিকানা প্রয়োগের প্রধান উপায় যে ভোট—সেই ভোট দিতে না পারার ক্ষোভও যে আওয়ামী লীগের পতনের পেছনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। অতএব এবারও যদি মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারে বা এবারও যদি সরকার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে এবং কোনও একটি দল বা জোটকে জিতিয়ে আনার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে—তাহলে দেশ যে সংকটের ভেতরে ছিল, তার চেয়ে বড় সংকটে পতিত হবে।
নির্বাচন কমিশন যতই নিরপেক্ষ থাকুক, নির্বাচন কেমন হবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করে ডিসি-এসপিদের ওপরেই। বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে শতভাগ নিরপেক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব কিনা—সেটি অনেক পুরনো তর্ক। কেননা নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যতই দলনিরপেক্ষ, সৎ, সাহসী ও যোগ্য হোন না কেন; মাঠ প্রশাসন যদি না চায়, তাহলে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ভোট কেমন হবে, সেটি নির্ভর করে যে সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে; তারা কেমন ভোট চায়, তার ওপর। মাঠ প্রশাসন যেহেতু সরকার তথা নির্বাহী বিভাগের অধীন এবং নির্বাচন কমিশনের কথা না শুনলে যেহেতু তাদের কোনও শাস্তির ভয় নেই কিংবা শাস্তি হলেও নির্বাহী বিভাগ থেকে তার ‘সুরক্ষা’ ব্যবস্থার যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে; মাঠ প্রশাসন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশের বাইরে যাবে না। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন কী নির্দেশনা দিল, তার চেয়ে বড় কথা- সরকার বা নির্বাহী বিভাগ তাকে কী বলছে?
নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেই। ভোট পরিচালনায় যে বিপুল সংখ্যক জনবল দরকার, সে পরিমাণ লোক তার নেই। ফলে তাকে পুরো নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্ভর করতে হয় নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের ওপর। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ বলছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন ভোট পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে যে সহায়তা চাইবে, সরকার সেটি দিতে বাধ্য। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন তারা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কর্মী নন। বরং তারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োজিত এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তা ব্যক্তিরা যা বলবেন, যে নির্দেশনা দেবেন, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং তারা কতটা নিরপেক্ষভাবে ভয়-ভীতি ও লোভের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন, তার ওপর নির্ভর নির্বাচনটি কেমন হবে। অর্থাৎ মাঠ প্রশাসন যদি ইসিকে সহায়তা না করে; তারা যদি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর মতো আচরণ করে; মাঠ প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ না থাকে বা থাকতে না পারে— তাহলে খুব ভালো নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
ধরা যাক, সিইসি ও কমিশনার হিসেবে দেশের সবচেয়ে মেধাবী, যোগ্য, সৎ ও সাহসী মানুষেরাই নিয়োগ পেলেন। কিন্তু একটি নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না। পুরো সিস্টেম যদি ভালো নির্বাচনের সহায়ক না হয়, তাহলে একজন সিইসি এবং চারজন কমিশনারের পক্ষে কিছুই করার নেই। তাদের নিয়ত যদি ‘সহিহ’ হোক না কেন, পুরো সিস্টেম যদি তাদেরকে সহযোগিতা না করে তাহলে তাদের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
যদি সরকার তথা নির্বাহী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে পুরোপুরি সহযোগিতা না দেয়; যদি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে দায়িত্বশীল আচরণ না করেন, তাহলে শুধুমাত্র পুলিশিং বা বিচার করে নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব নয়।
বিগত তিনটি নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত খারাপ নির্বাচন হয়েছে, এ বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। কিন্তু এই খারাপ নির্বাচনের দায় শুধু ওই তিন সিইসির নয়। এটা পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থার ত্রুটি।
মনে রাখতে হবে, পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণ হওয়ার পরও সেই ভোট গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। যেমন- একটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের ফল ঘোষণা পর্যন্ত কোনও হানাহানি হলো না, কোনও প্রার্থীর প্রচারে বাধা দেওয়া হলো না, কাউকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেওয়া হলো না; কিন্তু দেখা গেলো মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি বা ভোটার উপস্থিতি খুবই কম।
যেহেতু সংবিধানে ন্যূনতম ভোটের বিধান নেই, অর্থাৎ নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পেতে হবে এবং প্রাপ্ত ভোটের কত শতাংশ না পেলে জয়ী বলা যাবে না—এমন কোনও বিধান যেহেতু সংবিধানে বা নির্বাচনি আইনে (আরপিও) নেই, ফলে অনেক সময় দেখা গেছে ১০ শতাংশ ভোট পেয়েও অনেকে এমপি বা মেয়র নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এটিকে সুষ্ঠু ভোট বলা হলেও কোনও অর্থেই ভালো নির্বাচন বলা যায় না। আবার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেলে সেখানে কোনও ভোটই হয় না। ভোট না হলে সেখানো কোনও সংঘাত হয় না। তাতে ওই ভোটটি শান্তিপূর্ণ বা সংঘাতমুক্ত হলো বটে, কিন্তু এটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নয়।
পরিশেষে, ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন প্রয়োজন নেই, বরং অন্তর্বর্তী সরকার যদি নির্বাচনে কোনও ধরনের প্রভাব বিস্তার না করে বা করতে না পারে; সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মাঠ প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ ও নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করে—তাহলেই একটা ভালো নির্বাচন করা সম্ভব এবং সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ যাদেরকে চাইবে তারা যদি সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে দেশ ও জাতির জন্য বিরাট পাওয়া।
লেখক: সাংবাদিক
রিপোর্টারের নাম 





















