ঢাকা ০২:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

কতটা মসৃণ হবে নতুন সরকারের পথচলা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩১:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। অসাধারণ সাফল্যের কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরা উল্লসিত স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু নতুন সরকারের পথচলা কতটা মসৃণ হবে এটা প্রশ্নাতীত নয়। বেসরকারিভাবে ভোটের ফল প্রকাশের শুরুর দিকে ১২ তারিখ রাতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ইতিবাচক রাজনীতির আশ্বাস দিলেন সাংবাদিকদের সামনে।

মানুষ ভাবতে শুরু করে, পরদিন পত্রিকায় দেখবে বিজিত প্রার্থী বিজয়ীর বাড়িতে ফুল নিয়ে গেছে অভিনন্দন জানাতে। কিংবা বিজয়ী গেছে পরাজিতের বাড়ি মিষ্টি নিয়ে। সহনশীল রাজনীতির কিছু ছাপ দেখাও গেলো। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বাসায় আজকে গেলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখান থেকে বের হয়ে তিনি গেলেন নাহিদ ইসলামের বাসায়।

যদিও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অন্যতম এনসিপি নেতারা ভোটের ফলে নাখোশ। তারা প্রকাশ্যে কারচুপির অভিযোগ আনতে শুরু করলেন। এর প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো জামায়াতে ইসলামীর আমিরের মধ্যেও।

১৩ তারিখ কিছু সহিংসতার খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম আলো সংবাদ প্রকাশ করে ৮ জেলায় হামলা হয়েছে, নিহতের সংখ্যা ১। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম দল এনসিপি নেতার কাছ থেকে রাজপথে নামার প্রস্তুতির হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়। তাদের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে।

আপাতদৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির এমন হুঁশিয়ারিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরোনো বিষয় বলেই মনে করা যায়। কিন্তু তারা যে রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেছিলেন, এমনকি পরাজিত হলে বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানানোর কথাও বলেছিলেন, নির্বাচন শেষে দুটি দলই সেই কথা ভুলে যায়। এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী কিংবা এনসিপি বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও অভিনন্দন জানায়নি। সুতরাং জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের দুটি পক্ষের দূরত্ব কি বাড়ছে? 

সর্বশেষ জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ৩০ আসনের ভোটের ফল মনঃপূত হয়নি বলে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হয়তো এই লেখা প্রকাশ হওয়ার পরপরই জানা যেতে পারে তারা নির্বাচনি লড়াইকে আইনি লড়াইয়ের দিকে নিয়ে যাবে।

বন্ধুরতম পথ কি তাহলে অপেক্ষা করছে বিএনপির জন্য? জামায়াতে ইসলামী কিংবা এনসিপি নেতাদের মুখের দুটি কথাই শুধু নয়, নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই সনদের সূত্র ধরেও তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক ইতিবাচক থাকার কথা নয়। এবং সেই দৃশ্য সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়া থেকেই স্পষ্ট হতে থাকবে এবং সময়ান্তরে তীব্রতর হতে থাকবে এমন আভাসই পাওয়া যাচ্ছে।

গণভোট মাধ্যমে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হলো। যদিও এই গণভোট নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে কাস্ট হওয়া ভোটের চেয়ে অধিক দেখানো হয়েছে। এই প্রসঙ্গ বাদ দিলেও নতুন শঙ্কার প্রসঙ্গ বাদ দেওয়া যাবে না। এখানে জুলাই সনদ সরকারিভাবে প্রকাশের পরই বিএনপির প্রতিক্রিয়া স্মরণ করা যেতে পারে। বিএনপি সরাসরি অভিযোগ করেছিল, যে সনদে তারা সই করেছে সেই সনদ সরকার পরিবর্তন করে ফেলেছে।

এর রেশ ধরেই বিএনপির নেতারা গণভোট নিয়ে খুব একটা কথা বলেননি। বিএনপির মহাসচিব বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ এটা জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। এর আগে পরে বিএনপি স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য যথাক্রমে মির্জা আব্বাস ও মেজর হাফিজ স্পষ্টত ‘না’র পক্ষে কথা বলেছেন।

শেষ পর্যন্ত বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বেশ কয়েকবার ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচারণা করেছেন। তারপরও দেখা গেলো ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন (৩১.৯৪%) মানুষ গণভোটে ‘না’ ভোট প্রদান করেছে।

গণভোটে বিশাল সংখ্যক ভোটার ‘না’ ব্যালটে সমর্থন জানানোর পরও গণভোটে জুলাই সনদ সমর্থন লাভ করেছে এটাই বাস্তবতা। সেই অনুযায়ী জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম চলার কথা। প্রথম সংস্কারই শুরু হবে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। আর এখানেই বড় বাধাটির মুখে পড়তে হবে নতুন সরকারকে।

জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার পরও সরকারি দল কি জুলাই সনদে উল্লেখিত পথের বাইরে গিয়ে সংবিধান সংশোধন করতে যাবে? ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলার প্রয়োজন নেই, তারা তাদের মতো করেই সংবিধান সংশোধনের দিকে এগিয়ে যাবে। নির্বাচন পরবর্তীকালে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সংবাদ সম্মেলনেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জুলাই সনদের হুবহু বাস্তবায়ন না করে সংবিধান সংস্কারের সুযোগের পক্ষেও তাদের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। কারণ বিএনপির ইশতেহারকে সাধারণ মানুষ সমর্থন জানিয়ে তাদের সেই অধিকার প্রদান করেছে। আর এখানেই বিরোধী দলের সঙ্গে তাদের বিভাজন বাড়তে পারে এবং সেই রাজনৈতিক বাহাসের শেষ কোথায় হবে এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। জুলাই সনদ যেমন জনরায় পেয়েছে তেমনি বিএনপির ইশতেহারও জনরায় পেয়েছে।

এর বাইরেও বিএনপিকে গত দেড় বছরে জন্ম হওয়া এবং আগের কিছু জটিল সমস্যা সমাধান করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে দুর্নীতি সূচকে আওয়ামী লীগ সরকার আমলের চেয়ে যে অবনতি ঘটেছে তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। দেড় বছরে প্রায় ৪শ’ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে এই সময়, অন্তর্বর্তী সরকারের বড় কলঙ্ক মব কালচারকে মোকাবিলা করতে হবে তাদের। নির্বাচনের পরপর জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অভিযোগ অনুযায়ী মব মাধ্যমে তাদের কর্মীদের আক্রমণ করা হয়েছে, তাদের বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে। আর ভঙ্গুর অর্থনীতির কথা তো তারেক রহমান নিজেই বলেছেন। বাস্তবচিত্র দেখে এটা সহজেই বলা যায়, ক্রমবর্ধমান সমস্যার পথ রোধ করা তাদের জন্য কষ্টকর হবে।

ঠিক ওই সময় যদি এনসিপির বক্তব্য অনুযায়ী তারা রাস্তায় নেমে আসে সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। তারপর যদি সরকারবিরোধী আন্দোলনে ঝিমিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের সমর্থক কর্মীরা যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি দ্রুতই উত্তপ্ত হয়ে ওঠতে পারে। যা কারও কাম্য না হলেও আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

রাজনীতির মাঠে তখন নতুন মোড় ঘুরতে পারে এই সুবাদে। তা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ইস্যু। এ ক্ষেত্রে এনসিপি আওয়ামী লীগকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি নয়। আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক জামায়াত ঠেকানোর কৌশল হিসেবে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী মামলা উত্তোলনের যে ঘোষণা তাও যদি বাস্তবায়িত হয়, তখন আওয়ামী লীগও মাঠে নেমে যেতে পারে। তখন বিএনপি যদি আওয়ামী লীগ কর্মীদের সবুজ সংকেত দেয় অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সেই অবস্থায় জামায়াতকে মোকাবিলা করার জন্য আওয়ামী লীগ হবে বড় অস্ত্র।

আবার জামায়াতে ইসলামীর জন্মশত্রু আওয়ামী লীগকে তারা কাছে টানলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ আওয়ামী লীগ ছাড়া বিএনপির মতো শক্তিশালী দলকে মোকাবিলা করা জামায়াতের জন্য খুব একটা সহজসাধ্য হবে বলে মনে হয় না।

মোট কথা, নতুন সরকার নতুন রাজনীতি দেওয়ার পথটা বন্ধুর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেমন হবে তাদের পথচলা এটা বোঝার জন্য বেশি দিন অপেক্ষার প্রয়োজন হবে না। সংসদ অধিবেশন কিছু দিন চলার পরই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তারপরও মানুষ চায় সুষ্ঠু রাজনীতি বাংলাদেশে চালু হোক। মানুষ শান্তি চায়।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কতটা মসৃণ হবে নতুন সরকারের পথচলা

আপডেট সময় : ০৯:৩১:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। অসাধারণ সাফল্যের কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরা উল্লসিত স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু নতুন সরকারের পথচলা কতটা মসৃণ হবে এটা প্রশ্নাতীত নয়। বেসরকারিভাবে ভোটের ফল প্রকাশের শুরুর দিকে ১২ তারিখ রাতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ইতিবাচক রাজনীতির আশ্বাস দিলেন সাংবাদিকদের সামনে।

মানুষ ভাবতে শুরু করে, পরদিন পত্রিকায় দেখবে বিজিত প্রার্থী বিজয়ীর বাড়িতে ফুল নিয়ে গেছে অভিনন্দন জানাতে। কিংবা বিজয়ী গেছে পরাজিতের বাড়ি মিষ্টি নিয়ে। সহনশীল রাজনীতির কিছু ছাপ দেখাও গেলো। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বাসায় আজকে গেলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখান থেকে বের হয়ে তিনি গেলেন নাহিদ ইসলামের বাসায়।

যদিও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অন্যতম এনসিপি নেতারা ভোটের ফলে নাখোশ। তারা প্রকাশ্যে কারচুপির অভিযোগ আনতে শুরু করলেন। এর প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো জামায়াতে ইসলামীর আমিরের মধ্যেও।

১৩ তারিখ কিছু সহিংসতার খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম আলো সংবাদ প্রকাশ করে ৮ জেলায় হামলা হয়েছে, নিহতের সংখ্যা ১। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম দল এনসিপি নেতার কাছ থেকে রাজপথে নামার প্রস্তুতির হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়। তাদের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে।

আপাতদৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির এমন হুঁশিয়ারিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরোনো বিষয় বলেই মনে করা যায়। কিন্তু তারা যে রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেছিলেন, এমনকি পরাজিত হলে বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানানোর কথাও বলেছিলেন, নির্বাচন শেষে দুটি দলই সেই কথা ভুলে যায়। এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী কিংবা এনসিপি বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও অভিনন্দন জানায়নি। সুতরাং জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের দুটি পক্ষের দূরত্ব কি বাড়ছে? 

সর্বশেষ জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ৩০ আসনের ভোটের ফল মনঃপূত হয়নি বলে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হয়তো এই লেখা প্রকাশ হওয়ার পরপরই জানা যেতে পারে তারা নির্বাচনি লড়াইকে আইনি লড়াইয়ের দিকে নিয়ে যাবে।

বন্ধুরতম পথ কি তাহলে অপেক্ষা করছে বিএনপির জন্য? জামায়াতে ইসলামী কিংবা এনসিপি নেতাদের মুখের দুটি কথাই শুধু নয়, নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই সনদের সূত্র ধরেও তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক ইতিবাচক থাকার কথা নয়। এবং সেই দৃশ্য সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়া থেকেই স্পষ্ট হতে থাকবে এবং সময়ান্তরে তীব্রতর হতে থাকবে এমন আভাসই পাওয়া যাচ্ছে।

গণভোট মাধ্যমে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হলো। যদিও এই গণভোট নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে কাস্ট হওয়া ভোটের চেয়ে অধিক দেখানো হয়েছে। এই প্রসঙ্গ বাদ দিলেও নতুন শঙ্কার প্রসঙ্গ বাদ দেওয়া যাবে না। এখানে জুলাই সনদ সরকারিভাবে প্রকাশের পরই বিএনপির প্রতিক্রিয়া স্মরণ করা যেতে পারে। বিএনপি সরাসরি অভিযোগ করেছিল, যে সনদে তারা সই করেছে সেই সনদ সরকার পরিবর্তন করে ফেলেছে।

এর রেশ ধরেই বিএনপির নেতারা গণভোট নিয়ে খুব একটা কথা বলেননি। বিএনপির মহাসচিব বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ এটা জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। এর আগে পরে বিএনপি স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য যথাক্রমে মির্জা আব্বাস ও মেজর হাফিজ স্পষ্টত ‘না’র পক্ষে কথা বলেছেন।

শেষ পর্যন্ত বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বেশ কয়েকবার ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচারণা করেছেন। তারপরও দেখা গেলো ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন (৩১.৯৪%) মানুষ গণভোটে ‘না’ ভোট প্রদান করেছে।

গণভোটে বিশাল সংখ্যক ভোটার ‘না’ ব্যালটে সমর্থন জানানোর পরও গণভোটে জুলাই সনদ সমর্থন লাভ করেছে এটাই বাস্তবতা। সেই অনুযায়ী জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম চলার কথা। প্রথম সংস্কারই শুরু হবে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। আর এখানেই বড় বাধাটির মুখে পড়তে হবে নতুন সরকারকে।

জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার পরও সরকারি দল কি জুলাই সনদে উল্লেখিত পথের বাইরে গিয়ে সংবিধান সংশোধন করতে যাবে? ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলার প্রয়োজন নেই, তারা তাদের মতো করেই সংবিধান সংশোধনের দিকে এগিয়ে যাবে। নির্বাচন পরবর্তীকালে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সংবাদ সম্মেলনেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জুলাই সনদের হুবহু বাস্তবায়ন না করে সংবিধান সংস্কারের সুযোগের পক্ষেও তাদের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। কারণ বিএনপির ইশতেহারকে সাধারণ মানুষ সমর্থন জানিয়ে তাদের সেই অধিকার প্রদান করেছে। আর এখানেই বিরোধী দলের সঙ্গে তাদের বিভাজন বাড়তে পারে এবং সেই রাজনৈতিক বাহাসের শেষ কোথায় হবে এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। জুলাই সনদ যেমন জনরায় পেয়েছে তেমনি বিএনপির ইশতেহারও জনরায় পেয়েছে।

এর বাইরেও বিএনপিকে গত দেড় বছরে জন্ম হওয়া এবং আগের কিছু জটিল সমস্যা সমাধান করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে দুর্নীতি সূচকে আওয়ামী লীগ সরকার আমলের চেয়ে যে অবনতি ঘটেছে তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। দেড় বছরে প্রায় ৪শ’ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে এই সময়, অন্তর্বর্তী সরকারের বড় কলঙ্ক মব কালচারকে মোকাবিলা করতে হবে তাদের। নির্বাচনের পরপর জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অভিযোগ অনুযায়ী মব মাধ্যমে তাদের কর্মীদের আক্রমণ করা হয়েছে, তাদের বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে। আর ভঙ্গুর অর্থনীতির কথা তো তারেক রহমান নিজেই বলেছেন। বাস্তবচিত্র দেখে এটা সহজেই বলা যায়, ক্রমবর্ধমান সমস্যার পথ রোধ করা তাদের জন্য কষ্টকর হবে।

ঠিক ওই সময় যদি এনসিপির বক্তব্য অনুযায়ী তারা রাস্তায় নেমে আসে সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। তারপর যদি সরকারবিরোধী আন্দোলনে ঝিমিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের সমর্থক কর্মীরা যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি দ্রুতই উত্তপ্ত হয়ে ওঠতে পারে। যা কারও কাম্য না হলেও আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

রাজনীতির মাঠে তখন নতুন মোড় ঘুরতে পারে এই সুবাদে। তা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ইস্যু। এ ক্ষেত্রে এনসিপি আওয়ামী লীগকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি নয়। আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক জামায়াত ঠেকানোর কৌশল হিসেবে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী মামলা উত্তোলনের যে ঘোষণা তাও যদি বাস্তবায়িত হয়, তখন আওয়ামী লীগও মাঠে নেমে যেতে পারে। তখন বিএনপি যদি আওয়ামী লীগ কর্মীদের সবুজ সংকেত দেয় অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সেই অবস্থায় জামায়াতকে মোকাবিলা করার জন্য আওয়ামী লীগ হবে বড় অস্ত্র।

আবার জামায়াতে ইসলামীর জন্মশত্রু আওয়ামী লীগকে তারা কাছে টানলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ আওয়ামী লীগ ছাড়া বিএনপির মতো শক্তিশালী দলকে মোকাবিলা করা জামায়াতের জন্য খুব একটা সহজসাধ্য হবে বলে মনে হয় না।

মোট কথা, নতুন সরকার নতুন রাজনীতি দেওয়ার পথটা বন্ধুর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেমন হবে তাদের পথচলা এটা বোঝার জন্য বেশি দিন অপেক্ষার প্রয়োজন হবে না। সংসদ অধিবেশন কিছু দিন চলার পরই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তারপরও মানুষ চায় সুষ্ঠু রাজনীতি বাংলাদেশে চালু হোক। মানুষ শান্তি চায়।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।