ঢাকা ০৩:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

সবুজ মাঠে খেজুর হাতে: তারুণ্যের ইফতারে সম্প্রীতির উজ্জ্বল আভা

রমজান মাস এলেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো এক ভিন্ন আবহে রঙিন হয়ে ওঠে। সারা দিনের ক্লাস, লাইব্রেরির নীরবতা আর ব্যস্ত একাডেমিক সূচির ফাঁকে বিকেল গড়াতেই শুরু হয় এক অন্যরকম প্রস্তুতি—সম্মিলিত ইফতারের আয়োজন। হলের বারান্দা থেকে শুরু করে বিভাগীয় প্রাঙ্গণ কিংবা খোলা সবুজ মাঠ, সবখানেই গোল হয়ে বসে পড়ে শিক্ষার্থীরা। সামান্য খেজুর, ছোলা আর এক বোতল পানি ভাগাভাগি করে নেওয়ার এই মুহূর্তগুলো শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপায় নয়, বরং হয়ে ওঠে বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা আর ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য মিলনমেলা। দেশের ভিন্ন জেলা, ভিন্ন মত ও পটভূমি থেকে আসা শিক্ষার্থীরা এক টেবিলে বসে গড়ে তোলেন সাম্যের এক অসাধারণ ছবি, যা এখন ক্যাম্পাস সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রমজানের স্নিগ্ধতা:
রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর রমজানে এক নতুন রূপে ধরা দেয়। বিকালের শেষ প্রহরে টিএসসির সবুজ ঘাসে বা দস্তরখানে ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, খেজুর আর শরবতের পসরা সাজিয়ে বসে শিক্ষার্থীরা। ঘড়ির কাঁটার দিকে সবার চোখ, কানে আজানের প্রতীক্ষা। ইফতার সামগ্রী খুব বেশি না হলেও, তরুণদের মুখে উচ্ছ্বাস আর আড্ডায় থাকে প্রাণচাঞ্চল্য। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ার সাথে সাথেই শুরু হয় ইফতার, আর সবুজ মাঠের এই সমবেত মুহূর্ত ধারণ করে রমজানের এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা।

রমজানকে ঘিরে পুরো ক্যাম্পাসের চিত্রই বদলে যায়। আবাসিক হলের মাঠ থেকে কার্জন হল প্রাঙ্গণ—সবখানেই ব্যক্তিগত উদ্যোগ, হলভিত্তিক কর্মসূচি এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর উদ্যোগে ইফতারের আয়োজন ক্যাম্পাসকে প্রাণবন্ত করে তোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কার্জন হল প্রাঙ্গণে এক বিশেষ ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে, যেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ আবাসিক ও অনাবাসিক ছাত্রী অংশ নেন। সুশৃঙ্খল পরিবেশে সম্মিলিত ইফতারের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। শিক্ষার্থীরা এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতা কামনা করেন।

বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও রমজানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ছাত্রদলের উদ্যোগে ‘ইফতার উইথ হামিম’ কর্মসূচি, কোরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও সাহরি আয়োজনের মতো কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ইফতার বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনা করে। বিশেষ করে আবাসিক ও আর্থিকভাবে সীমিত শিক্ষার্থীদের জন্য এসব উদ্যোগ অত্যন্ত সহায়ক হয়। সংগঠনগুলো জানায়, রমজানের শিক্ষাকে ধারণ করে সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতেই তাদের এই প্রচেষ্টা। রমজান উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোও নতুন সাজে সেজে ওঠে। প্রবেশপথে শুভেচ্ছাবার্তা, বর্ণিল আলোকসজ্জা আর চাঁদ-তারার নকশায় সন্ধ্যা নামতেই ঝলমলে হয়ে ওঠে পুরো হলপাড়া। টিএসসি ও হলসংলগ্ন এলাকায় বসে ছোটখাটো ইফতার বাজার, যেখানে শুধু শিক্ষার্থী নয়, আশপাশের এলাকার মানুষও পরিবার নিয়ে এসে মাঠে বসে ইফতার করেন।

পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইফতারের বৈচিত্র্য:
পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রমজান এলেই বিকালের চিত্র বদলে যায়। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য ইফতারের সময়টুকু কখনো কখনো আবেগময় হয়ে ওঠে। মায়ের হাতের রান্না, ঘরের টেবিল—সবই মনে পড়ে। তবুও ক্যাম্পাসজীবন পুরোপুরি নিঃসঙ্গ নয়; বন্ধুরাই হয়ে ওঠে নতুন পরিবার। আসরের নামাজের পর শিক্ষার্থীরা ছোলা, মুড়ি, বেগুনি, আলুর চপ, জিলাপি, ফল—নানা ইফতার সামগ্রী কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরপর কেউ কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে, কেউ শহীদ মিনার এলাকায়, আবার কেউ পাহাড়ের চূড়ায় বসে ইফতার করেন। ছোট ছোট বৃত্তে বসে গল্প, হাসি আর খাবার ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক উষ্ণ পরিবেশ।

বিভিন্ন ছাত্র ও সামাজিক সংগঠনও রমজান মাসে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরসহ নানা প্ল্যাটফর্ম ইফতার ও সাহরির আয়োজন করে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, আবাসিক শিক্ষার্থী ও পথশিশুদের নিয়েও আয়োজন করা হয় বিশেষ ইফতার মাহফিল। ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বড় পরিসরের ইফতার মাহফিলে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। ছাত্রী হলগুলোতেও পৃথক আয়োজন দেখা যায়। এসব আয়োজন শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু খাবারের ব্যবস্থা নয়, বরং মানসিক সান্ত্বনা ও সামাজিক সংযোগের এক বড় ক্ষেত্র তৈরি করে। পরিবার থেকে দূরে থাকলেও বন্ধুত্বের উষ্ণতায় অনেকটাই পূরণ হয় শূন্যতা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খোলা আকাশের নিচে সম্প্রীতির মিলনমেলা:
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রমজান মানেই খোলা মাঠে ইফতারের চিত্র। শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠ, জুবেরী মাঠ, শহীদ মিনার, সাবাস বাংলাদেশ চত্বর—সবখানেই বিকেল থেকে জমতে থাকে শিক্ষার্থীদের ভিড়। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শিক্ষার্থীরা ঘাসের ওপর কাগজ বা দস্তরখান বিছিয়ে সাজান ইফতারি। খেজুর, ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু আর শরবতের পাশাপাশি থাকে ফলের সমাহার।

এই আয়োজনে নেই কোনো ভেদাভেদ। বড় ভাই-ছোট ভাই, বর্তমান-প্রাক্তন—সবাই একই বৃত্তে বসে। অনেক সময় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বন্ধুরাও যোগ দেন, যা ক্যাম্পাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরে। এক শিক্ষার্থী জানান, হলের চার দেয়ালের মাঝে ইফতার করা গেলেও, খোলা আকাশের নিচে সবার সঙ্গে বসে ইফতার করার অনুভূতিই আলাদা। আরেকজনের ভাষায়, “এখানে আমরা শুধু রোজা ভাঙি না; সারা দিনের ক্লান্তি ভুলে একে অপরের সঙ্গে সময় কাটাই।” ভিন্ন ধর্মের এক শিক্ষার্থী বলেন, মুসলিম বন্ধুর ইফতারে অংশ নেওয়া তার কাছে সম্মানের বিষয়। আজানের মুহূর্তে তিনি নিজেকে আলাদা মনে করেন না; বরং বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বন্ধনই বড় হয়ে ওঠে। ইফতারের কয়েক মিনিট আগে মাঠজুড়ে নেমে আসে নীরবতা। আজানের ধ্বনি উঠতেই শুরু হয় রোজা ভাঙা। সেই মুহূর্তে ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অপার্থিব প্রশান্তি।

বেরোবিতে খোলা আকাশের নিচে সম্প্রীতির বন্ধন:
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাসে রমজানের প্রতিটি বিকেল ভিন্ন এক আবহ বয়ে আনে। স্নিগ্ধ বাতাস, সবুজে মোড়া বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ আর পশ্চিম আকাশের লাল আভা মিলিয়ে খোলা আকাশের নিচে প্রতিদিন আয়োজিত হয় সম্প্রীতির বন্ধনে সম্মিলিত ইফতার। ব্যস্ত শিক্ষাজীবনের ফাঁকে এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের মনে আনে প্রশান্তি, আত্মিক তৃপ্তি ও ভ্রাতৃত্ববোধের গভীর অনুভূতি।

ইফতারের নির্ধারিত সময়ের আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানে জড়ো হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। কেউ পাটি বিছান, কেউ খাবার সাজান; খেজুর, ছোলা, মুড়ি, ফল, জিলাপি, পেঁয়াজু আর ঠান্ডা শরবতে পূর্ণ হয়ে ওঠে সারি সারি আসন। অনেকে স্বেচ্ছায় পানির বোতল বিতরণ করেন। ছোট ছোট এসব দায়িত্বই গড়ে তোলে বড় এক সম্প্রীতির সেতুবন্ধ। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজনটি কেবল ইফতারে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সিনিয়র-জুনিয়র, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, আবাসিক-অনাবাসিক—সবাই একসঙ্গে বসে একই খাবার ভাগাভাগি করেন। এতে দূরত্ব কমে, বাড়ে আন্তরিকতা। ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে চোখে পড়ে। অনেকেই নিজ হাতে তৈরি পিঠা, ফলের সালাদ বা বিশেষ শরবত নিয়ে আসেন এবং সবার সঙ্গে ভাগ করে নেন, যা পারস্পরিক বিশ্বাস ও বন্ধুত্বকে আরো দৃঢ় করে।

ইফতারের মুহূর্তে পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়লে চারপাশে নেমে আসে আবেগঘন নীরবতা। মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসতেই সবাই একসঙ্গে দোয়া করেন। খেজুর ও পানি দিয়ে রোজা ভাঙার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইফতার। সেই সময়ে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গিয়ে ফুটে ওঠে সামাজিক সম্প্রীতির অনন্য চিত্র। শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীরাই নন, অন্যান্য ধর্মের শিক্ষার্থীরাও অংশ নিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার বার্তা দেন। এতে স্পষ্ট হয়—বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার স্থান নয়, মানবিকতারও উন্মুক্ত মঞ্চ।

সম্পর্কের উষ্ণতাই আসল:
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র আলাদা হলেও, ইফতারের পেছনের অনুভূতি এক—ইফতার মানে মিলন। পরিবার থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি মানসিক আশ্রয়। সামান্য আয়োজন, কিন্তু গভীর আবেগ। কোথাও বড় পরিসরের গণ-ইফতার, কোথাও বন্ধুদের ছোট বৃত্ত—সবকিছুর মধ্যেই আছে ভাগাভাগি আর একসঙ্গে থাকার আনন্দ। রমজান তাই ক্যাম্পাসে কেবল ধর্মীয় অনুশীলন নয়; এটি সামাজিক সম্প্রীতির এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। খোলা আকাশের নিচে বসে খেজুর হাতে অপেক্ষার সেই মুহূর্তগুলো শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে থাকে দীর্ঘদিন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও এই আয়োজন মনে করিয়ে দেয়—সংযমের পাশাপাশি রমজান শেখায় ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর মানুষের পাশে থাকার শিক্ষা। সবুজ মাঠে বসে ভাগাভাগি করা সেই সাধারণ ইফতারই হয়ে ওঠে অসাধারণ স্মৃতি, যা হয়তো একদিন ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার পরও হৃদয়ের গভীরে উষ্ণ হয়ে থাকবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রবাসীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা: রেমিট্যান্স পাঠালেই দেড় ভরি স্বর্ণের হার জেতার সুযোগ

সবুজ মাঠে খেজুর হাতে: তারুণ্যের ইফতারে সম্প্রীতির উজ্জ্বল আভা

আপডেট সময় : ০২:২০:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

রমজান মাস এলেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো এক ভিন্ন আবহে রঙিন হয়ে ওঠে। সারা দিনের ক্লাস, লাইব্রেরির নীরবতা আর ব্যস্ত একাডেমিক সূচির ফাঁকে বিকেল গড়াতেই শুরু হয় এক অন্যরকম প্রস্তুতি—সম্মিলিত ইফতারের আয়োজন। হলের বারান্দা থেকে শুরু করে বিভাগীয় প্রাঙ্গণ কিংবা খোলা সবুজ মাঠ, সবখানেই গোল হয়ে বসে পড়ে শিক্ষার্থীরা। সামান্য খেজুর, ছোলা আর এক বোতল পানি ভাগাভাগি করে নেওয়ার এই মুহূর্তগুলো শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপায় নয়, বরং হয়ে ওঠে বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা আর ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য মিলনমেলা। দেশের ভিন্ন জেলা, ভিন্ন মত ও পটভূমি থেকে আসা শিক্ষার্থীরা এক টেবিলে বসে গড়ে তোলেন সাম্যের এক অসাধারণ ছবি, যা এখন ক্যাম্পাস সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রমজানের স্নিগ্ধতা:
রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর রমজানে এক নতুন রূপে ধরা দেয়। বিকালের শেষ প্রহরে টিএসসির সবুজ ঘাসে বা দস্তরখানে ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, খেজুর আর শরবতের পসরা সাজিয়ে বসে শিক্ষার্থীরা। ঘড়ির কাঁটার দিকে সবার চোখ, কানে আজানের প্রতীক্ষা। ইফতার সামগ্রী খুব বেশি না হলেও, তরুণদের মুখে উচ্ছ্বাস আর আড্ডায় থাকে প্রাণচাঞ্চল্য। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ার সাথে সাথেই শুরু হয় ইফতার, আর সবুজ মাঠের এই সমবেত মুহূর্ত ধারণ করে রমজানের এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা।

রমজানকে ঘিরে পুরো ক্যাম্পাসের চিত্রই বদলে যায়। আবাসিক হলের মাঠ থেকে কার্জন হল প্রাঙ্গণ—সবখানেই ব্যক্তিগত উদ্যোগ, হলভিত্তিক কর্মসূচি এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর উদ্যোগে ইফতারের আয়োজন ক্যাম্পাসকে প্রাণবন্ত করে তোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কার্জন হল প্রাঙ্গণে এক বিশেষ ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে, যেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ আবাসিক ও অনাবাসিক ছাত্রী অংশ নেন। সুশৃঙ্খল পরিবেশে সম্মিলিত ইফতারের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। শিক্ষার্থীরা এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতা কামনা করেন।

বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও রমজানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ছাত্রদলের উদ্যোগে ‘ইফতার উইথ হামিম’ কর্মসূচি, কোরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও সাহরি আয়োজনের মতো কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ইফতার বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনা করে। বিশেষ করে আবাসিক ও আর্থিকভাবে সীমিত শিক্ষার্থীদের জন্য এসব উদ্যোগ অত্যন্ত সহায়ক হয়। সংগঠনগুলো জানায়, রমজানের শিক্ষাকে ধারণ করে সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতেই তাদের এই প্রচেষ্টা। রমজান উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোও নতুন সাজে সেজে ওঠে। প্রবেশপথে শুভেচ্ছাবার্তা, বর্ণিল আলোকসজ্জা আর চাঁদ-তারার নকশায় সন্ধ্যা নামতেই ঝলমলে হয়ে ওঠে পুরো হলপাড়া। টিএসসি ও হলসংলগ্ন এলাকায় বসে ছোটখাটো ইফতার বাজার, যেখানে শুধু শিক্ষার্থী নয়, আশপাশের এলাকার মানুষও পরিবার নিয়ে এসে মাঠে বসে ইফতার করেন।

পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইফতারের বৈচিত্র্য:
পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রমজান এলেই বিকালের চিত্র বদলে যায়। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য ইফতারের সময়টুকু কখনো কখনো আবেগময় হয়ে ওঠে। মায়ের হাতের রান্না, ঘরের টেবিল—সবই মনে পড়ে। তবুও ক্যাম্পাসজীবন পুরোপুরি নিঃসঙ্গ নয়; বন্ধুরাই হয়ে ওঠে নতুন পরিবার। আসরের নামাজের পর শিক্ষার্থীরা ছোলা, মুড়ি, বেগুনি, আলুর চপ, জিলাপি, ফল—নানা ইফতার সামগ্রী কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরপর কেউ কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে, কেউ শহীদ মিনার এলাকায়, আবার কেউ পাহাড়ের চূড়ায় বসে ইফতার করেন। ছোট ছোট বৃত্তে বসে গল্প, হাসি আর খাবার ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক উষ্ণ পরিবেশ।

বিভিন্ন ছাত্র ও সামাজিক সংগঠনও রমজান মাসে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরসহ নানা প্ল্যাটফর্ম ইফতার ও সাহরির আয়োজন করে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, আবাসিক শিক্ষার্থী ও পথশিশুদের নিয়েও আয়োজন করা হয় বিশেষ ইফতার মাহফিল। ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বড় পরিসরের ইফতার মাহফিলে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। ছাত্রী হলগুলোতেও পৃথক আয়োজন দেখা যায়। এসব আয়োজন শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু খাবারের ব্যবস্থা নয়, বরং মানসিক সান্ত্বনা ও সামাজিক সংযোগের এক বড় ক্ষেত্র তৈরি করে। পরিবার থেকে দূরে থাকলেও বন্ধুত্বের উষ্ণতায় অনেকটাই পূরণ হয় শূন্যতা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খোলা আকাশের নিচে সম্প্রীতির মিলনমেলা:
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রমজান মানেই খোলা মাঠে ইফতারের চিত্র। শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠ, জুবেরী মাঠ, শহীদ মিনার, সাবাস বাংলাদেশ চত্বর—সবখানেই বিকেল থেকে জমতে থাকে শিক্ষার্থীদের ভিড়। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শিক্ষার্থীরা ঘাসের ওপর কাগজ বা দস্তরখান বিছিয়ে সাজান ইফতারি। খেজুর, ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু আর শরবতের পাশাপাশি থাকে ফলের সমাহার।

এই আয়োজনে নেই কোনো ভেদাভেদ। বড় ভাই-ছোট ভাই, বর্তমান-প্রাক্তন—সবাই একই বৃত্তে বসে। অনেক সময় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বন্ধুরাও যোগ দেন, যা ক্যাম্পাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরে। এক শিক্ষার্থী জানান, হলের চার দেয়ালের মাঝে ইফতার করা গেলেও, খোলা আকাশের নিচে সবার সঙ্গে বসে ইফতার করার অনুভূতিই আলাদা। আরেকজনের ভাষায়, “এখানে আমরা শুধু রোজা ভাঙি না; সারা দিনের ক্লান্তি ভুলে একে অপরের সঙ্গে সময় কাটাই।” ভিন্ন ধর্মের এক শিক্ষার্থী বলেন, মুসলিম বন্ধুর ইফতারে অংশ নেওয়া তার কাছে সম্মানের বিষয়। আজানের মুহূর্তে তিনি নিজেকে আলাদা মনে করেন না; বরং বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বন্ধনই বড় হয়ে ওঠে। ইফতারের কয়েক মিনিট আগে মাঠজুড়ে নেমে আসে নীরবতা। আজানের ধ্বনি উঠতেই শুরু হয় রোজা ভাঙা। সেই মুহূর্তে ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অপার্থিব প্রশান্তি।

বেরোবিতে খোলা আকাশের নিচে সম্প্রীতির বন্ধন:
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাসে রমজানের প্রতিটি বিকেল ভিন্ন এক আবহ বয়ে আনে। স্নিগ্ধ বাতাস, সবুজে মোড়া বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ আর পশ্চিম আকাশের লাল আভা মিলিয়ে খোলা আকাশের নিচে প্রতিদিন আয়োজিত হয় সম্প্রীতির বন্ধনে সম্মিলিত ইফতার। ব্যস্ত শিক্ষাজীবনের ফাঁকে এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের মনে আনে প্রশান্তি, আত্মিক তৃপ্তি ও ভ্রাতৃত্ববোধের গভীর অনুভূতি।

ইফতারের নির্ধারিত সময়ের আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানে জড়ো হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। কেউ পাটি বিছান, কেউ খাবার সাজান; খেজুর, ছোলা, মুড়ি, ফল, জিলাপি, পেঁয়াজু আর ঠান্ডা শরবতে পূর্ণ হয়ে ওঠে সারি সারি আসন। অনেকে স্বেচ্ছায় পানির বোতল বিতরণ করেন। ছোট ছোট এসব দায়িত্বই গড়ে তোলে বড় এক সম্প্রীতির সেতুবন্ধ। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজনটি কেবল ইফতারে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সিনিয়র-জুনিয়র, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, আবাসিক-অনাবাসিক—সবাই একসঙ্গে বসে একই খাবার ভাগাভাগি করেন। এতে দূরত্ব কমে, বাড়ে আন্তরিকতা। ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে চোখে পড়ে। অনেকেই নিজ হাতে তৈরি পিঠা, ফলের সালাদ বা বিশেষ শরবত নিয়ে আসেন এবং সবার সঙ্গে ভাগ করে নেন, যা পারস্পরিক বিশ্বাস ও বন্ধুত্বকে আরো দৃঢ় করে।

ইফতারের মুহূর্তে পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়লে চারপাশে নেমে আসে আবেগঘন নীরবতা। মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসতেই সবাই একসঙ্গে দোয়া করেন। খেজুর ও পানি দিয়ে রোজা ভাঙার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইফতার। সেই সময়ে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গিয়ে ফুটে ওঠে সামাজিক সম্প্রীতির অনন্য চিত্র। শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীরাই নন, অন্যান্য ধর্মের শিক্ষার্থীরাও অংশ নিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার বার্তা দেন। এতে স্পষ্ট হয়—বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার স্থান নয়, মানবিকতারও উন্মুক্ত মঞ্চ।

সম্পর্কের উষ্ণতাই আসল:
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র আলাদা হলেও, ইফতারের পেছনের অনুভূতি এক—ইফতার মানে মিলন। পরিবার থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি মানসিক আশ্রয়। সামান্য আয়োজন, কিন্তু গভীর আবেগ। কোথাও বড় পরিসরের গণ-ইফতার, কোথাও বন্ধুদের ছোট বৃত্ত—সবকিছুর মধ্যেই আছে ভাগাভাগি আর একসঙ্গে থাকার আনন্দ। রমজান তাই ক্যাম্পাসে কেবল ধর্মীয় অনুশীলন নয়; এটি সামাজিক সম্প্রীতির এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। খোলা আকাশের নিচে বসে খেজুর হাতে অপেক্ষার সেই মুহূর্তগুলো শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে থাকে দীর্ঘদিন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও এই আয়োজন মনে করিয়ে দেয়—সংযমের পাশাপাশি রমজান শেখায় ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর মানুষের পাশে থাকার শিক্ষা। সবুজ মাঠে বসে ভাগাভাগি করা সেই সাধারণ ইফতারই হয়ে ওঠে অসাধারণ স্মৃতি, যা হয়তো একদিন ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার পরও হৃদয়ের গভীরে উষ্ণ হয়ে থাকবে।