ঢাকা ০৩:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

আলোকিত সমাজ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে বই হোক নিত্যসঙ্গী

সদ্য বিদায় নিয়েছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। তবে বইপ্রেমীদের হৃদয়ে বইয়ের আবেদন কেবল একটি নির্দিষ্ট মাসে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই রমজানেও অব্যাহত রয়েছে সৃজনশীল বইয়ের চর্চা। একটি প্রগতিশীল ও মেধাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে প্রতিদিন অন্তত একটি সৃজনশীল বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। মনে রাখতে হবে, যে জাতি বই থেকে দূরে সরে যায়, তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে যে জাতি যত বেশি জ্ঞানসমৃদ্ধ, তারাই বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে।

একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোতে নয়, বরং নাগরিকের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ওপর নির্ভর করে। আর এই বিকাশের প্রধান হাতিয়ার হলো বই। সমাজ থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে তরুণ সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় বা মহল্লায় পাঠাগার গড়ে তোলার মাধ্যমে বই পড়ার আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রিয়জনকে উপহার হিসেবে বই দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করা গেলে তা পাঠাভ্যাস বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। স্বশিক্ষিত জাতি গঠনে প্রতিটি গ্রামে ও জনপদে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।

বইয়ের গুরুত্ব নিয়ে যুগে যুগে মনিষীরা মূল্যবান দর্শন রেখে গেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, মানুষ বইয়ের মাধ্যমেই অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। পারস্যের অমর কবি ওমর খৈয়াম বইয়ের চিরযৌবনা রূপের বর্ণনা দিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী পাঠকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, বই কিনে কেউ কখনো দেউলে হয় না। তিনি আরও মনে করতেন, দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারের প্রধান উপায় হলো বই পড়ার প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলা।

দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেলের মতে, জীবনের কঠিন সময়ে মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো নিজের ভেতরে একটি বইয়ের ভুবন তৈরি করা। মহাত্মা আল্লামা শেখ সা’দী জ্ঞান অর্জনকে স্রষ্টাকে চেনার পথ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ড. মুহম্মদ এনামুল হকের দৃষ্টিতে, একমাত্র বই পড়ার মাধ্যমেই মানুষ তার জীবনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা অনুধাবন করতে পারে। আধুনিককালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বইকে তুলনা করেছেন জানালার সঙ্গে, যা দিয়ে অনাগত ভবিষ্যৎকে দেখা যায়।

এমনকি মৃত্যুশয্যায় থেকেও জ্ঞান অর্জনের তৃষ্ণা মেটানোর বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রখ্যাত পণ্ডিত আলবেরুনী। জ্যামিতির একটি সংজ্ঞা জানার আগ্রহ প্রকাশ করলে যখন তাকে বলা হলো যে তিনি মুমূর্ষু, তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন—অজ্ঞ হয়ে মরার চেয়ে জেনে মরা অনেক বেশি সার্থকতা বয়ে আনে।

পরিশেষে, সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় ও বুদ্ধিহীনতা থেকে রক্ষা করতে হলে বইকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ করে নিতে হবে। আসুন, আমরা নিজে বই পড়ি এবং অন্যদেরও উৎসাহিত করি। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও চেতনাসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে বই হোক আমাদের আজীবনের সঙ্গী। শিশুদের হাতে খেলনার পাশাপাশি তুলে দিই চমৎকার সব বই, যাতে আগামীর প্রজন্ম একটি আলোকিত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের নজিরবিহীন হামলা: ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বৃষ্টিতে রণক্ষেত্র আবুধাবি-দুবাই

আলোকিত সমাজ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে বই হোক নিত্যসঙ্গী

আপডেট সময় : ০১:২৫:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

সদ্য বিদায় নিয়েছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। তবে বইপ্রেমীদের হৃদয়ে বইয়ের আবেদন কেবল একটি নির্দিষ্ট মাসে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই রমজানেও অব্যাহত রয়েছে সৃজনশীল বইয়ের চর্চা। একটি প্রগতিশীল ও মেধাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে প্রতিদিন অন্তত একটি সৃজনশীল বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। মনে রাখতে হবে, যে জাতি বই থেকে দূরে সরে যায়, তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে যে জাতি যত বেশি জ্ঞানসমৃদ্ধ, তারাই বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে।

একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোতে নয়, বরং নাগরিকের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ওপর নির্ভর করে। আর এই বিকাশের প্রধান হাতিয়ার হলো বই। সমাজ থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে তরুণ সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় বা মহল্লায় পাঠাগার গড়ে তোলার মাধ্যমে বই পড়ার আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রিয়জনকে উপহার হিসেবে বই দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করা গেলে তা পাঠাভ্যাস বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। স্বশিক্ষিত জাতি গঠনে প্রতিটি গ্রামে ও জনপদে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।

বইয়ের গুরুত্ব নিয়ে যুগে যুগে মনিষীরা মূল্যবান দর্শন রেখে গেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, মানুষ বইয়ের মাধ্যমেই অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। পারস্যের অমর কবি ওমর খৈয়াম বইয়ের চিরযৌবনা রূপের বর্ণনা দিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী পাঠকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, বই কিনে কেউ কখনো দেউলে হয় না। তিনি আরও মনে করতেন, দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারের প্রধান উপায় হলো বই পড়ার প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলা।

দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেলের মতে, জীবনের কঠিন সময়ে মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো নিজের ভেতরে একটি বইয়ের ভুবন তৈরি করা। মহাত্মা আল্লামা শেখ সা’দী জ্ঞান অর্জনকে স্রষ্টাকে চেনার পথ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ড. মুহম্মদ এনামুল হকের দৃষ্টিতে, একমাত্র বই পড়ার মাধ্যমেই মানুষ তার জীবনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা অনুধাবন করতে পারে। আধুনিককালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বইকে তুলনা করেছেন জানালার সঙ্গে, যা দিয়ে অনাগত ভবিষ্যৎকে দেখা যায়।

এমনকি মৃত্যুশয্যায় থেকেও জ্ঞান অর্জনের তৃষ্ণা মেটানোর বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রখ্যাত পণ্ডিত আলবেরুনী। জ্যামিতির একটি সংজ্ঞা জানার আগ্রহ প্রকাশ করলে যখন তাকে বলা হলো যে তিনি মুমূর্ষু, তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন—অজ্ঞ হয়ে মরার চেয়ে জেনে মরা অনেক বেশি সার্থকতা বয়ে আনে।

পরিশেষে, সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় ও বুদ্ধিহীনতা থেকে রক্ষা করতে হলে বইকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ করে নিতে হবে। আসুন, আমরা নিজে বই পড়ি এবং অন্যদেরও উৎসাহিত করি। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও চেতনাসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে বই হোক আমাদের আজীবনের সঙ্গী। শিশুদের হাতে খেলনার পাশাপাশি তুলে দিই চমৎকার সব বই, যাতে আগামীর প্রজন্ম একটি আলোকিত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে পারে।