ঢাকা ১১:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ড. ইউনূসের বিদায় ও নতুন সরকারের আগমনে ভারতের স্বস্তি এবং প্রত্যাশার দোলাচল

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের বিদায় এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ ভারতের জন্য এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একদিকে যেমন দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে স্বস্তির নিশ্বাস বইছে, তেমনই অন্যদিকে তারা নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক ধরনের সতর্কতামূলক অবস্থানে রয়েছে।

ভারতের স্বস্তির কারণ:

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ড. ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনামলে ভারত বিভিন্ন সময়ে ঢাকার কাছ থেকে এমন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে যা তাদের জন্য অস্বস্তিকর ছিল। এই সময়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা করেছে, যা দিল্লির একক প্রভাব বলয়ের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ড. ইউনূসের এক বৈঠকে শেখ হাসিনার বিষয়ে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করার বিষয়টিও ভারতের জন্য একটি বড় অস্বস্তির কারণ ছিল। এছাড়া, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের মতো মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে ভারতের গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের ক্রমাগত অপপ্রচারের প্রচেষ্টা ড. ইউনূসের সরকার দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া বা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের মতো পদক্ষেপগুলো ভারতের জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার প্রচেষ্টা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। এসব কারণে, ড. ইউনূসের বিদায় ভারতের জন্য এক ধরনের ভারমুক্তি এনেছে।

নতুন সরকারের আগমনে ভারতের প্রত্যাশা:

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণকে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছে। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা স্বাভাবিকভাবেই নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। ভারত সরকার নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এছাড়া, ভারতের লোকসভার স্পিকারকে শপথ অনুষ্ঠানে পাঠানো এবং ঢাকায় ভিসা সার্ভিস চালু করার ঘোষণা ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

তবে, ভারতের এই সমর্থন নিঃশর্ত হবে না। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা তারেক রহমানের ভারতনীতি নিয়ে কিছুটা সন্দিহান। তারা মনে করছেন, অতীতে খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা যেন নতুন সরকারে পুনরাবৃত্তি না হয়। ভারতের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের উত্থান, যা তারা নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে। ভারত চাইবে, তারেক রহমানের সরকার ইসলামপন্থীদের রাশ টেনে ধরুক। এছাড়া, শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণের ইস্যুটি যেন বারবার আলোচনায় না আসে এবং যেকোনোভাবে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনাও ভারতের অন্যতম লক্ষ্য। শেখ হাসিনার আমলে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো বহাল রাখা এবং তা কার্যকর করা, তথাকথিত সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়নসহ পানিবণ্টন ইস্যুতে নতুন সরকারকে দিল্লি চাপে রাখবে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ展望:

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন সরকারের আগমনে ভারত স্বস্তি পেলেও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো খুব সহজে সমাধান হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভারত তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে চাইবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট থাকবে। অন্যদিকে, পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহ বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে ভারত কতটা আন্তরিকতা দেখাবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারত তাদের তথাকথিত নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে এনে চীন-পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে তাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ভবিষ্যৎ আচরণ ইস্যুভিত্তিক হবে বলেই সাবেক রাষ্ট্রদূতরা মনে করছেন। ভারত তাদের নিরাপত্তা ইস্যুতে জোর দেবে এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো কার্যকর রাখতে চাইবে। গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, তিস্তা সহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের কথা ভারত কতটা শুনবে, তা সময়ই বলে দেবে। সব মিলিয়ে, আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শান্তি বজায় রাখতে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বান

ড. ইউনূসের বিদায় ও নতুন সরকারের আগমনে ভারতের স্বস্তি এবং প্রত্যাশার দোলাচল

আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের বিদায় এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ ভারতের জন্য এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একদিকে যেমন দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে স্বস্তির নিশ্বাস বইছে, তেমনই অন্যদিকে তারা নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক ধরনের সতর্কতামূলক অবস্থানে রয়েছে।

ভারতের স্বস্তির কারণ:

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ড. ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনামলে ভারত বিভিন্ন সময়ে ঢাকার কাছ থেকে এমন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে যা তাদের জন্য অস্বস্তিকর ছিল। এই সময়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা করেছে, যা দিল্লির একক প্রভাব বলয়ের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ড. ইউনূসের এক বৈঠকে শেখ হাসিনার বিষয়ে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করার বিষয়টিও ভারতের জন্য একটি বড় অস্বস্তির কারণ ছিল। এছাড়া, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের মতো মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে ভারতের গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের ক্রমাগত অপপ্রচারের প্রচেষ্টা ড. ইউনূসের সরকার দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া বা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের মতো পদক্ষেপগুলো ভারতের জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার প্রচেষ্টা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। এসব কারণে, ড. ইউনূসের বিদায় ভারতের জন্য এক ধরনের ভারমুক্তি এনেছে।

নতুন সরকারের আগমনে ভারতের প্রত্যাশা:

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণকে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছে। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা স্বাভাবিকভাবেই নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। ভারত সরকার নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এছাড়া, ভারতের লোকসভার স্পিকারকে শপথ অনুষ্ঠানে পাঠানো এবং ঢাকায় ভিসা সার্ভিস চালু করার ঘোষণা ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

তবে, ভারতের এই সমর্থন নিঃশর্ত হবে না। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা তারেক রহমানের ভারতনীতি নিয়ে কিছুটা সন্দিহান। তারা মনে করছেন, অতীতে খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা যেন নতুন সরকারে পুনরাবৃত্তি না হয়। ভারতের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের উত্থান, যা তারা নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে। ভারত চাইবে, তারেক রহমানের সরকার ইসলামপন্থীদের রাশ টেনে ধরুক। এছাড়া, শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণের ইস্যুটি যেন বারবার আলোচনায় না আসে এবং যেকোনোভাবে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনাও ভারতের অন্যতম লক্ষ্য। শেখ হাসিনার আমলে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো বহাল রাখা এবং তা কার্যকর করা, তথাকথিত সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়নসহ পানিবণ্টন ইস্যুতে নতুন সরকারকে দিল্লি চাপে রাখবে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ展望:

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন সরকারের আগমনে ভারত স্বস্তি পেলেও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো খুব সহজে সমাধান হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভারত তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে চাইবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট থাকবে। অন্যদিকে, পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহ বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে ভারত কতটা আন্তরিকতা দেখাবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারত তাদের তথাকথিত নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে এনে চীন-পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে তাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ভবিষ্যৎ আচরণ ইস্যুভিত্তিক হবে বলেই সাবেক রাষ্ট্রদূতরা মনে করছেন। ভারত তাদের নিরাপত্তা ইস্যুতে জোর দেবে এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো কার্যকর রাখতে চাইবে। গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, তিস্তা সহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের কথা ভারত কতটা শুনবে, তা সময়ই বলে দেবে। সব মিলিয়ে, আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।