ভাষা কোনো স্থবির বস্তু নয়, বরং প্রবহমান নদীর মতো যা মানুষের যাপিত জীবন, আবেগ এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের জনক ফার্দিনাঁ দ্য সোস্যুর থেকে শুরু করে সমাজ-ভাষাতাত্ত্বিকদের গবেষণায় এটি প্রতিষ্ঠিত যে, ভাষা মূলত একটি সামাজিক চুক্তি, যা মানুষের মুখে মুখে প্রাণ পায়। তবে ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতাকেন্দ্রিক শক্তিগুলো বারবার এই স্বাভাবিক প্রবাহকে শৃঙ্খলিত করতে চেয়েছে। ভাষাকে নিজেদের ছাঁচে ঢালাই করে তারা মূলত এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ বা হেজেমনি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যার উদ্দেশ্য জনমানসের চিন্তাধারাকে নিজেদের অনুকূলে রাখা।
ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি তার ‘হেজেমনি’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, শাসকগোষ্ঠী কেবল পেশিশক্তি দিয়ে নয়, বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ভাষার মাধ্যমে মানুষের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে। যখন শাসকের ভাষা সাধারণ মানুষের ‘কমন সেন্স’ বা সাধারণ বুদ্ধিতে পরিণত হয়, তখনই আধিপত্য পূর্ণতা পায়। এই প্রক্রিয়ায় শব্দচয়ন বা পরিভাষা নির্ধারণ হয়ে ওঠে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা সামাজিক প্রকৌশলের অংশ। কোনো প্রতিবাদকে ‘অধিকারের দাবি’ না বলে যখন ‘অরাজকতা’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়, তখন জনমতের অভিমুখ বদলে যায়। এভাবেই ভাষা শুধু বাস্তবতাকে প্রকাশ করে না, বরং বাস্তবতাকে নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করে।
বাংলা ভাষায় এই ‘ভাষা প্রকৌশলে’র ইতিহাস বেশ পুরনো। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতরা মিলে এক কৃত্রিম গদ্যরীতি তৈরি করেছিলেন। এটি ছিল জনসাধারণের কথ্য ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন এক অভিজাত রূপ, যা মূলত সামাজিক বিভাজন ও ‘বাবু কালচার’ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে শুদ্ধ-অশুদ্ধের এক নৈতিক দেয়াল তুলে দিয়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছিল।
পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে এই প্রকৌশল আরও নগ্ন রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে। একদিকে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে বাংলাকে নিজস্ব ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ছাঁচে বাঁধার প্রয়াস—উভয়ই ছিল আধিপত্য বিস্তারের কৌশল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে যে, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং তা আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক স্বাধিকারের প্রধানতম শক্তি।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এই পুরনো ভাষা প্রকৌশলেরই একটি আধুনিক সংস্করণ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভগত সিংয়ের হাত ধরে জনপ্রিয় হওয়া এই স্লোগানটি মূলত নিপীড়নবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক। কিন্তু বর্তমানের একটি বিশেষ গোষ্ঠী এই শব্দবন্ধটিকে ‘পাকিস্তানপন্থা’র সাথে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা ভাষাতাত্ত্বিক ভাষায় ‘বয়ান নিয়ন্ত্রণ’ বা ডিসকোর্স কন্ট্রোল। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ওসমান হাদীর হাত ধরে এই স্লোগান যখন নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন এটি কেবল শব্দে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা। আজ যখন এই স্লোগানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন প্রশ্ন জাগে—এটি কি ভাষার শুদ্ধতার লড়াই, নাকি জনআকাঙ্ক্ষাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার রাজনৈতিক অপকৌশল?
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো শিখিয়েছেন, ক্ষমতা নির্ধারণ করে দেয় কোন কথাটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নিষিদ্ধ। শহীদ ওসমান হাদীর মৃত্যুর বিচার বা জুলাই বিপ্লবের মূল দাবিগুলো যখন সামনে আসে, তখন শব্দের শুদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক তোলা মূলত ‘ডাইভারশন পলিটিকস’ বা দৃষ্টি সরানোর রাজনীতি। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় বলতে হয়, ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ অর্থাৎ, বাস্তবতাকে আড়াল করে বা ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করে কোনো শাসকই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না।
পরিশেষে, ভাষা কোনো দাপ্তরিক সম্পত্তি বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উত্তরাধিকার নয়। ভাষা হলো জনগণের সম্মিলিত সৃজন। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যখনই কোনো শক্তি ভাষাকে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ বা কৃত্রিম শুদ্ধতার খাঁচায় বন্দি করতে চেয়েছে, জনগণ তাদের নিজস্ব ভাষায় তার প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভাষা শেষ পর্যন্ত মানুষের চেতনার প্রতিফলন, আর সেই চেতনাকে কোনো প্রকৌশল দিয়েই চিরকাল অবদমিত রাখা সম্ভব নয়। জনগণের মুখের অবাধ প্রয়োগেই ভাষা বেঁচে থাকে এবং গণতন্ত্রায়িত হয়।
রিপোর্টারের নাম 

























