নারায়ণগঞ্জ থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মাণাধীন জেট এ-১ আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক। অভিযোগ রয়েছে, তার মদতপুষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে চলমান প্রকল্পের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করা হয়েছে এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।
বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) সূত্রে জানা গেছে, শাহজালাল বিমানবন্দরে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং সড়কপথে ট্যাংকারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চুরি ও অপচয় রোধে ২০১৭ সালে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জের পিতলগঞ্জ থেকে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপো (কেএডি) পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন ও জেটি নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নৌ কল্যাণ ফাউন্ডেশন ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডকে (এনকেএফটিসিএল)। পরবর্তীতে তারা সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিএমইসিসি) ও বারাকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে নিয়োগ দেয়।
শুরু থেকেই প্রকল্পটি নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। জমি অধিগ্রহণ ও রুটের নকশা তিনবার পরিবর্তনের কারণে কাজ শুরু হতেই ২০১৯ সাল পার হয়ে যায়। এরপর করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে নির্মাণসামগ্রীর দাম এবং ডলারের বিনিময় হার অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় বৃদ্ধির আবেদন করে। বারাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ৬ষ্ঠ সংশোধনীতে ৪৬৮ কোটি টাকার প্রস্তাব দিলেও রহস্যজনকভাবে তা আমলে নেয়নি এনকেএফটিসিএল। বরং কোনো আলোচনা ছাড়াই গোপনে বিল্ডস্টোন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বিসিসিএল) নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ৬৬৩ কোটি টাকায় কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বিল্ডস্টোন কোম্পানিটি মূলত তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ঘনিষ্ঠ আশীর্বাদপুষ্ট।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পের ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরেও শুধুমাত্র বিশেষ মহলের স্বার্থ হাসিলের জন্য ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পূর্ববর্তী ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকল্পটি এনকেএফটিসিএল থেকে সরিয়ে সরাসরি পদ্ধতিতে ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন ২৪-এর (ইসিবি ২৪) হাতে ন্যস্ত করে এবং বরাদ্দ কমিয়ে ৪২০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
তবে বিতর্কের শেষ এখানেই নয়। অভিযোগ উঠেছে, তারিক সিদ্দিকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ‘বেঞ্চমার্ক’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ইসিবি ২৪-এর ছায়া অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠানটি এর আগে চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন (সিডিপিএল) প্রকল্পের কাজে যুক্ত ছিল, যেখানে কারিগরি ত্রুটি ও জ্বালানি চুরির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে তারিক আহমেদ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছে এবং তার সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবশালী মহলের ছায়া যদি এই প্রকল্পেও বজায় থাকে, তবে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিমানবন্দরের মতো সংবেদনশীল স্থাপনায় জ্বালানি সরবরাহের এই প্রকল্পটি আদৌ সফল হবে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 
























